Image description
ইশতেহার চূড়ান্ত জামায়াতের । ♦ শিক্ষাব্যবস্থাকে কর্মমুখী, সংখ্যালঘুদের অধিকার নিশ্চিত ও বেকারত্ব সমাধানে সুস্পষ্ট রূপরেখা ♦ থাকছে ১০০ দিনের অ্যাকশন প্ল্যান বছর ও ৫ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা ঘোষণা ৩ বা ৪ ফেব্রুয়ারি ♦ রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ।

কর্মসংস্থান, নারীদের নিরাপত্তা ও ক্ষমতায়ন, দুর্নীতি দমনসহ ৪১ বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে নির্বাচনি ইশতেহার তৈরি করছে জামায়াতে ইসলামী। এর মধ্যে যুবশক্তি, শ্রমিক ও প্রবাসীদের বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষাব্যবস্থাকে কর্মমুখী করে বেকারত্ব দূরীকরণের সুস্পষ্ট রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। তা ছাড়া সংখ্যালঘুদের অধিকার ও বেকারত্ব সমাধানে থাকবে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা। এ ছাড়াও ১০০ দিনের অ্যাকশন প্ল্যান এবং বছর ও ৫ বছরে কী কী করবে তারও পরিকল্পনা থাকছে এবারের ইশতেহারে।

জামায়াতে ইসলামীর নেতারা জানিয়েছেন, তাঁরা একটি দেশের সামগ্রিক বিষয় মাথায় রেখেই তাঁদের নির্বাচনি ইশতেহার তৈরি করছেন। একই সঙ্গে এসব কীভাবে বাস্তবায়ন হবে তারও রূপরেখা তৈরি করা হচ্ছে। সুন্দরভাবে রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। সরকার গঠনের পর প্রথম ১০০ দিনে কী করা হবে তা-ও উল্লেখ থাকবে ইশতেহারে। এ ছাড়া বছরওয়ারি এবং পাঁচ বছরে কী কী করা হবে তারও উল্লেখ থাকবে ইশতেহারে। মোট ৪১টি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়ে এবং এর উপবিষয়ও থাকবে এর সঙ্গে। মন্ত্রণালয়ভিত্তিক এবং বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে ইশতেহারে পরিকল্পনাগুলো সাজানো হয়েছে। এজন্য কাজ করছেন দেশে এবং বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি শিক্ষিত বিষয়ভিত্তিক ৩০ জন বিশেষজ্ঞ। যারা ইতোমধ্যেই ইশতেহারের খসড়া তৈরি করে দলটির কাছে জমা দিয়েছেন। দলটির নীতিনির্ধারণী সভায় এটি পাস হলে চূড়ান্ত রূপ পাবে এবং জনগণের সামনে উপস্থাপন করা হবে। জানতে চাইলে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি এবং মিডিয়া ও প্রচার বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব যুবায়ের বলেন, ‘আমাদের নির্বাচনি ইশতেহারের কাজ শেষ। আজ (শনিবার) রাতের বৈঠকে চূড়ান্ত করা হবে। আগামী মঙ্গলবার বা বুধবার জনসমক্ষে উপস্থাপন করা হবে। এবারের স্লোগান হচ্ছে “চলে একসাথে গড়ি বাংলাদেশ”।’

কর্মসংস্থান নারী নিরাপত্তা ও দুর্নীতিরোধে গুরুত্বতিনি বলেন, ‘মন্ত্রণালয় ও বাস্তবভিত্তিক খাতগুলো ধরে নির্বাচনি ইশতেহার তৈরি করা হয়েছে। এজন্য দেশে ও বিদেশে থাকা ৩০ জন বিশেষজ্ঞকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তারা ইতোমধ্যে খসড়া তৈরি করে আমাদের দিয়েছেন। এতে ৪১ বিষয়কে প্রাধান্য এবং এর উপবিষয়গুলোও তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে নারীর নিরাপত্তা ও ক্ষমতায়ন, বেকারত্ব দূরীকরণ, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা, অর্থনীতির উন্নয়ন, দুর্নীতিকে লাল কার্ড দেখানোসহ ৪১টি বিষয়কে গুরত্ব দেওয়া হয়েছে।

ইশতেহারে যা থাকছে : নারীর নিরাপত্তা ও ক্ষমতায়ণ : নারীকে ছাড়া টেকসই সমৃদ্ধি সম্ভব নয় বলে মনে করে জামায়াত। দলটি ক্ষমতায় এলে নারীরা দেশে সম্মান ও নিরাপত্তা নিয়ে বসবাস করবে বলে মনে করেন দলটির নেতারা। তারা বলছেন, বর্তমানে জামায়াতের যারা রাজনীতি করছেন তার অর্ধেকই নারী এবং শিক্ষিত। জামায়াতের মহিলা শাখা রয়েছে। ছাত্রীদেরও একটি সংগঠন রয়েছে যেখানে মেয়েরা নেতৃত্ব দিচ্ছে। তা ছাড়া জামায়াতের নারী নেত্রীরা বিভিন্ন স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। রয়েছেন চিকিৎসক, ইঞ্জিনিয়ার। ফলে জামায়াত কখনো নারীদের উন্নয়নে বাধা নয়, বরং সহায়ক হবে বলে মনে করেন দলটির নেতারা। এজন্য নারীদের নিরাপত্তা ও সম্মান, কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন বিষয়ে ইশতেহারে উল্লেখ থাকবে। এ ছাড়া কর্মজীবী মায়েদের জন্য কর্মঘণ্টা কমিয়ে আনার বিষয়ে ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান।

টেকসই অর্থনীতি : দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেলে একটি সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায় জামায়াত। বিশেষ করে ব্যাংকের সুষ্ঠু পরিচালনা, অর্থ পাচার এবং ঘুষ-দুর্নীতি রোধ, রেমিট্যান্সের প্রবাহ বৃদ্ধি, জাকাতভিত্তিক অর্থনীতিকে গুরুত্ব দিতে চায় দলটি। এ ছাড়া স্মার্ট সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ড চালু; যাতে এনআইডি, টিআইএন, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা একই সঙ্গে থাকবে। তিন বছরে শিল্পে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির চার্জ বাড়ানো হবে না। বন্ধ কলকারখানা সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে চালু করা, সেখানে শ্রমিকদের ১০ শতাংশ মালিকানা থাকবে। লাইসেন্স ব্যবস্থা সহজ করা হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকদের জন্য সুদবিহীন ঋণসুবিধা থাকবে।

দুর্নীতি দমন : জামায়াতের ইশতেহারের অন্যতম দিক থাকবে দুর্নীতি দমন। দলটি মনে করে দুর্নীতির কারণে দেশ পিছিয়ে পড়ছে। দেশের সম্পদের কোনো অভাব নেই, কিন্তু তার সঠিক ব্যবহার হচ্ছে না। দুর্নীতির কারণে অর্থ পাচার হয়ে যাচ্ছে। দেশ থেকে যে পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে তা দেশে থাকলে নতুন নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে, কমে যাবে মূল্যস্ফীতি। এ ছাড়া দুর্নীতি না থাকলে দেশের সর্বত্র সুশাসন কায়েম হবে। এতে দেশের মানুষ শান্তিতে থাকতে পারবে।

শিক্ষাসংক্রান্ত : দেশের শিক্ষাব্যবস্থা যুগোপযোগী ও আধুনিক করতে চায় জামায়াত। উন্নত জ্ঞানবিজ্ঞানের সমন্বয়ের সঙ্গে কর্মমুখী শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে চায় দলটি। দেশে যাতে কোনো শিক্ষিত বেকার তৈরি না হয়, সেজন্য নেওয়া হবে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা। পাড়ায় পাড়ায় লাইব্রেরি গড়ে তোলা, দেশে উন্নত গবেষণাগার তৈরি, জনগণকে ইসলামি ও বিজ্ঞানমনস্ক করার নানা পরিকল্পনা থাকবে। এ ছাড়া স্নাতক শেষে ৫ লাখ ডিগ্রিধারীকে মাসে দুই বছর সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদমুক্ত ঋণ দেওয়া হবে। মেধার ভিত্তিতে ১ লাখ শিক্ষার্থীকে মাসে ১০ হাজার টাকা করে শিক্ষাঋণ দেওয়া হবে। বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনার জন্য প্রতি বছর ১০০ শিক্ষার্থী সুদমুক্ত শিক্ষাঋণ পাবেন।

স্বাস্থ্য : স্বাস্থ্যসেবায় পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশু এবং ৬০ বছরের বেশি বয়সি জ্যেষ্ঠ নাগরিকরা বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা পাবেন। ৬৪ জেলায় বিশেষায়িত হাসপাতাল করা হবে। গর্ভধারণ থেকে শুরু করে শিশুর বয়স দুই বছর বয়স পর্যন্ত মা ও সন্তানের প্রাথমিক স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।

কর্মসংস্থান : কর্মসংস্থান ও তারুণ্যের পরিকল্পনায় গুরুত্ব পেয়েছে পাঁচ বছরে ১ কোটি তরুণকে বাজারভিত্তিক দক্ষতার প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। প্রতিটি উপজেলায় ‘ইয়ুথ টেক ল্যাব’ এবং প্রতিটি জেলায় ‘জব ইয়ুথ ব্যাংক’ গঠন করে পাঁচ বছরে ৫০ লাখ চাকরি নিশ্চিত করা হবে। নারী, তরুণ ও অবহেলিত জনগোষ্ঠীকে প্রাধান্য দিয়ে ৫ লাখ উদ্যোক্তা, ১৫ লাখ ফ্রিল্যান্সার তৈরি করা হবে।

তথ্যপ্রযুক্তি খাত : তথ্যপ্রযুক্তি খাতের রূপরেখায় ভিশন-২০৪০ ঘোষণার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জামায়াত। ২০৩০ সালের মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তিতে ২০ লাখ চাকরি তৈরি, ন্যাশনাল পেমেন্ট গেটওয়ে স্থাপন, আইসিটিতে রপ্তানি ৫ বিলিয়নে উন্নীতকরণের প্রতিশ্রুতি রয়েছে ইশতেহারে।