নির্বাচনের উত্তাপ ক্রমেই বাড়ছে সিলেট-৫ (কানাইঘাট-জকিগঞ্জ) আসনে। প্রভাবশালী প্রার্থীদের ত্রিমুখী লড়াই, জোট রাজনীতির হিসাব-নিকাশ ও বিদ্রোহী প্রার্থীর চাপÑসব মিলিয়ে এ আসন এখন সিলেটের রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
এবারের নির্বাচনে এ আসনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন তিন হেভিওয়েট প্রার্থী। বিএনপি ও জামায়াত উভয়েই কওমি ঘরানার আলেম প্রার্থীদের মনোনয়ন দিয়েছে। শুরুতে জামায়াত নিজস্ব প্রার্থী দিলেও জোটগত সমঝোতার কারণে শেষ পর্যন্ত আসনটি ছেড়ে দেয়।
স্থানীয়রা জামায়াতের আসন ছাড়ার সিদ্ধান্ত কৌশলগতভাবে সঠিক বললেও জামায়াতের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে কিছুটা ক্ষোভ রয়েছে। জানা গেছে, জেলার ছয়টি আসনের মধ্যে দুটি আসন মাওলানা মামুনুল হকের চাপের মুখে ছাড় দিতে হয়েছে, যা নিয়ে দলীয় সমর্থকদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। বিশেষ করে সিলেট-৩ আসন নিয়ে।
এ দুই জোট প্রার্থীর পাশাপাশি বিএনপির প্রভাবশালী নেতা ও বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে বহিষ্কৃত মামুনুর রশীদকে ঘিরেও সাধারণ মানুষের মধ্যে চলছে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা। ফলে সিলেটের আসনগুলোর মধ্যে সিলেট-৫ এখন সবচেয়ে আলোচিত।
স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সিলেট-৫ আসনে ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা প্রবল। দেশের বিরল উদাহরণ হিসেবে এখানে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে দুই প্রথিতযশা আলেমের মধ্যে। একদিকে বিএনপি সমর্থিত জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক (খেজুর গাছ), অন্যদিকে ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্য তথা জামায়াত-খেলাফত জোটের প্রার্থী মুফতি আবুল হাসান (দেওয়াল ঘড়ি)। এছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত ছাত্রদলের সাবেক নেতা মামুনুর রশীদ (ফুটবল) এবং মুসলিম লীগের বিল্লাল উদ্দিন (হারিকেন)। তবে সাধারণ মানুষের ধারণা, মূল লড়াই সীমাবদ্ধ থাকবে ‘খেজুর গাছ’ ও ‘দেওয়াল ঘড়ি’র মধ্যেই।
এলাকাবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক যেমন প্রবীণ ও অভিজ্ঞ আলেম, তেমনি মুফতি আবুল হাসান একজন জনপ্রিয় বক্তা ও ওয়ায়েজ হিসেবে সুপরিচিত। এখানে রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে আলেম পরিচয় ভোটারদের কাছে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। দুজনই ডোর টু ডোর নির্বাচনি প্রচারে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, দুই প্রধান প্রার্থীর কেউই ধনাঢ্য নন। তাদের নির্বাচনি ব্যয়ের বড় অংশ আসছে স্বজন ও প্রবাসীদের সহায়তা থেকে। সীমান্তবর্তী এ আসনে আঞ্চলিক ও সম্প্রদায়ভিত্তিক ভোটের হিসাবও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বিএনপি জোট মনোনীত প্রার্থী হিসেবে মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুকের রয়েছে শক্তিশালী ভোটব্যাংক। দলীয় ভোট ও ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা তাকে শক্ত অবস্থানে রেখেছে। কানাইঘাট উপজেলার বাসিন্দা হিসেবে এলাকায়ও তার প্রভাব দৃশ্যমান। অন্যদিকে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী মুফতি আবুল হাসান মাঠে অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছেন। কর্মী-সমর্থকদের নিবিড় প্রচার এবং ধর্মপ্রাণ ভোটারদের বড় একটি অংশ তার প্রধান শক্তি হয়ে উঠেছে।
এদিকে, বিএনপি থেকে সদ্য বহিষ্কৃত মামুনুর রশীদ (চাকসু মামুন) স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে একটি শক্ত বলয় গড়ে তুলেছেন। ৫ আগস্টের পর থেকেই তিনি মাঠে সক্রিয়। তার বক্তব্য, দীর্ঘ ১৫-১৬ বছর ধরে গড়ে তোলা সংগঠন ও মাঠ ছেড়ে দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করায় তিনি ইতোমধ্যে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন।
স্থানীয় অনেক ভোটার জানান, জমিয়ত শক্তিশালী হলেও এবার সমীকরণ ভিন্ন হতে পারে। দলীয় শাস্তির মুখে পড়ায় মামুনুর রশীদের প্রতি সহমর্মিতা তৈরি হয়েছে। প্রকাশ্যে না হলেও গোপনে তার পক্ষে অনেকেই কাজ করছেন। সচেতন মহলের মতে, উবায়দুল্লাহ ফারুকের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি এখন এই বিদ্রোহী প্রার্থী। আর এ দ্বন্দ্বে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন মুফতি আবুল হাসান।
এদিকে, জকিগঞ্জে আল্লামা ফুলতলীর বিপুলসংখ্যক ভক্ত, অনুরাগী ও মুরিদ রয়েছেন। এই শক্তিশালী ভোটব্যাংক যেদিকে যাবে, ওই প্রার্থীর পাল্লা ভারী হবে বলে মনে করছেন সাধারণ ভোটাররা। তবে এ ঘরানার ভোটাররা জামায়াত জোটের পক্ষে নন বলেও আলোচনা রয়েছে।
সিলেট-৫ আসনে মোট ভোটার চার লাখ ৯ হাজার ৯৫৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ দুই লাখ ১১ হাজার ৬৬৭ জন এবং নারী এক লাখ ৯৮ হাজার ২৮৯ জন।