আসছে ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এরই মধ্যে নির্বাচন নিয়ে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি ও জাতীয়পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে তোড়জোড় শুরু হয়েছে। যদিও গতবছরের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নির্বাচনে আসতে পারছে না আওয়ামী লীগ (সাময়িক কার্যক্রম নিষিদ্ধ)। সেক্ষেত্রে বেশিরভাগ জায়গায় বিএনপির শক্ত প্রতিপক্ষ হওয়ার চেষ্টা করছে জামায়াত, এনসিপি ও জাতীয় পার্টি। এই দল তিনটি তাদের কার্যক্রমের মাধ্যমে শক্ত অবস্থান জানান দেওয়ার চেষ্টা করছে।
বর্তমানে সারাদেশে বিভিন্ন দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা প্রচার-প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। এ ক্ষেত্রে থেমে নেই উত্তরের জেলা রংপুরও। তিস্তা তীরের এই অঞ্চলে সাধারণ মানুষের জীবনের লয় চলে স্বপ্ন আর সংগ্রামে। ভোটের হাওয়া এবার সেই লয়ে এক নতুন ছন্দ এনে দিয়েছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আধিপত্যের ছায়া থেকে বেরিয়ে নতুন বন্দোবস্ত ও গণতন্ত্র রক্ষার দাবি এখন জোরালো হয়ে উঠছে এখানে।
জেলার হাট-বাজার, ধানখেত, দোকানগুলোতে গল্প-আড্ডায় এখন শুধুই প্রসঙ্গ আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। মিছিল-মিটিং, উঠান বৈঠকসহ বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে নিজেকে যোগ্য প্রমাণে উঠে-পড়ে লেগেছেন তারা। তবে একসময়ের প্রচলিত বাণী ‘রংপুরের মাটি, জাতীয় পার্টির ঘাঁটি’ এবং ‘রংপুরের রাজনীতিতে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদই যে শেষ কথা’- বাস্তবে এখন আর এমন নেই। আগে রংপুর জেলার সবক’টি আসনই জাতীয় পার্টির দখলে থাকতো। কিন্তু এখন পালটে গেছে সেই চিত্র।
এর আগে ভোটারবিহীন ও ভোট কারচুপি করে টানা মেয়াদে থাকা আওয়ামী লীগ দখলে নেয় জেলার চারটি আসন। আর আওয়ামী লীগের জোটসঙ্গী হওয়ায় দু’টি আসন ধরে রাখতে পারে জাপা। তবে জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের মৃত্যুর পর এখন রংপুরের রাজনীতির হিসাব-নিকাশ পালটে গেছে বলে মনে করছেন অনেকে। এবার পরিবর্তিত পরিস্থিতে রংপুর থেকে আসন বের করা জাপার জন্য কঠিন হয়ে যাবে। কারণ, এখানকার আসনগুলোতে এবার বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির শক্ত প্রার্থী রয়েছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আসনভিত্তিক পরিক্রমায় এবার সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে সারাবাংলার আয়োজনে থাকছে রংপুর-২ (বদরগঞ্জ ও তারাগঞ্জ)। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে রংপুর-২ আসনটি একটি অনন্য অধ্যায়। এই আসনে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের গল্প যেমন সমৃদ্ধ, তেমনি বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এটি হয়ে উঠেছে উত্তপ্ত প্রতিযোগিতার আঙিনা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে রংপুর-২ আসনটি এখন ভোটের ডামাডোলে মুখর।
রংপুরের বদরগঞ্জ-তারাগঞ্জের চায়ের দোকানগুলোতে এখন আর শুধু ফসলের গল্প নয়; স্থান পেয়েছে ভোটের হিসাব-নিকাশ। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অন্ধকার থেকে বেরিয়ে, এই অঞ্চলের মানুষের চোখে এখন একটাই আশার আলো- উন্নয়ন। গতবছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর, রংপুর-২ আসনের ভোটাররা যেন এক নতুন যাত্রার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। যেখানে অতীতের আধিপত্য ভেঙে পড়ছে, আর উঠে আসছে পরিবর্তনের অটুট প্রত্যয়। ভোটারদের হৃদয়ে মনোনয়ন প্রার্থীরা জাগিয়ে তুলছেন অদম্য আকাঙ্ক্ষা। সত্যিকারের প্রতিনিধিত্ব, উন্নয়ন আর যোগ্য নেতৃত্ব খুঁজতে চুলচেরা বিশ্লেষণে সচেতন নাগরিক। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এই আগাম হাওয়ায় এই আসনের গল্প হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
স্বাধীনতার পর থেকে এই আসনের রাজনৈতিক যাত্রা যেন এক দীর্ঘ সংগ্রামের কাহিনি। ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের আনিসুল হক চৌধুরীর জয় দিয়ে শুরু হয়েছে এই গল্প, যা ১৯৭৯-এ বিএনপির মোহাম্মদ ইলিয়াসের হাতে চলে যায়— এটিই ছিল বিএনপির একমাত্র জয় এই আসনে। তার পর থেকে আওয়ামী লীগ এবং জাতীয় পার্টির মধ্যে চলেছে এক অটুট আধিপত্যের খেলা। ১৯৮৬ সালে আবার আওয়ামী লীগের আনিসুল হক চৌধুরী, ১৯৮৮-এ জাতীয় পার্টির কামাল উদ্দিন হায়দার, ১৯৯১-এ হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ (উপনির্বাচনে পরিতোষ চক্রবর্তী), ১৯৯৬ সালে এরশাদ (উপনির্বাচনে আনিসুল হক চৌধুরী), ২০০১-এ মোহাম্মদ আলী সরকার, ২০০৮-এ আনিছুল ইসলাম মন্ডল, এবং ২০১৪ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের আবুল কালাম মো. আহসানুল হক চৌধুরী ডিউকের একচেটিয়া শাসন— এই ইতিহাস বলছে, এই আসন কখনোই সহজে হাতছাড়া হয়নি জাপার। কিন্তু, এরশাদের মৃত্যুর পর জাতীয় পার্টির জনপ্রিয়তা ধীরে ধীরে কমেছে। উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনগুলোতে তারা সুবিধা করতে পারেনি। আর আওয়ামী লীগের পতনের পর, এই শূন্যতায় উজ্জীবিত হয়ে উঠেছে বিএনপি ও জামায়াত, যারা দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থেকেও এখন আশার আলো দেখছে।
নির্বাচনের বাকি মাত্র ১২ দিন। এরই মধ্যে এই আসন হয়ে উঠেছে তীব্র লড়াইয়ের ময়দান। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দীর্ঘদিন কারাবন্দী থাকার পর কারামুক্ত জামায়াতের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল এ টি এম আজহারুল ইসলামকে রংপুর-২ আসনে প্রার্থী করেছে দলটি। সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ‘জনগণের সঙ্গে মিলিত হতে পারব, এটা কোনোদিন চিন্তায়ও আসেনি। ফাঁসির মঞ্চ থেকে আজ লাখো জনতার মঞ্চে হাজির হয়েছি। এসব হয়েছে একমাত্র আল্লাহর ইচ্ছায়। আমি অনাথ, আমার কেউ নেই। জনগণই সব আমার। দেশের সেবা করার সুযোগ পেলে সেবক হব, মালিক নয়।’ তিনি এর আগেও এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন।
এ টি এম আজহারুল ইসলামের সঙ্গে এই আসনে বিএনপির শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) মোহাম্মদ আলী সরকার। তবে এই আসনে বিএনপির কিছুটা ‘ছন্দপতন’ ঘটেছে। দলীয় সূত্র জানায়, একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিরোধকে কেন্দ্র করে গত ৪ এপ্রিল মোহাম্মদ আলী সরকারের লোকজনের ওপর অতর্কিত হামলার ঘটনা ঘটে। ওই সময় মোহাম্মদ আলী সরকারকে দল থেকে বহিষ্কার করে বিএনপি। পরে বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে তাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। তবে মনোনয়ন প্রত্যাশীর তালিকায় ছিলেন বকুল সরকার, কমল লোহানী, আজিজুল হক ও শহিদুল মানিক। মনোনয়ন ঘোষণার পর বঞ্চিত প্রার্থীর সমর্থকরা বিভিন্ন সময়ে উপজেলাজুড়ে সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ সমাবেশসহ নানা কর্মসূচি করেছেন। অন্যদিকে বিএনপি প্রার্থী মোহাম্মদ আলী সরকার বিশাল কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে ধানের শীষের পক্ষে প্রচার ও সভা-সমাবেশ অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাচ্ছেন।
রংপুর-২ আসনের মনোনয়ন বঞ্চিত প্রার্থী বদরগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আজিজুল হক সারাবাংলাকে বলেন, ‘তৃণমূল থেকে বিএনপি করি, তাই মনোনয়ন পাওয়ার হকদার ছিলাম। যেহেতু আমাকে বিএনপি মনোনয়ন দেয়নি, সেহেতু মিছিল-মিটিং-সমাবেশ করেছে আমার সমথর্করা। তাদের জায়গা থেকে তারা করেছে।’
মনোনয়নবঞ্চিত পৌর বিএনপির আহ্বায়ক কমল লোহানী সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমি দলের কাছে মনোনয়ন চেয়েছিলাম, দল আমাকে দেয়নি। যাকে যোগ্য মনে করেছেন তাকে দিয়েছে। তবে তাতে আমার কোনো সমস্যা নেই। দল যাকে নমিনেশন দিয়েছে, প্রার্থী ঘোষণা করেছে, সেও তো বিএনপি কর্মী। তিনিও ধানের শীষের কাজ করবেন, সেহেতু আমিও পক্ষে কাজ করছি। আমি পৌর বিএনপির সব নেতাকর্মীদের নিয়ে মতবিনিময় করেছি মোহাম্মদ আলী সরকারের সঙ্গে কাজ করার জন্য। আমাদের কোনো দ্বিমত নেই।’
মোহাম্মদ আলী সরকার সারাবাংলাকে বলেন, ‘দলের চেয়ারম্যানের বিচক্ষণতায় সত্যের জয় হয়েছে। তারেক রহমান আমাকে যোগ্য মনে করেছেন; তাই আমাকে সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী করেছেন। যারা এখনো মনোনয়ন পাওয়ার আসায় কাজ করছেন তারাও তো বিএনপি করে। দিন শেষে সবাই ধানের শীষের জন্য ভোট প্রার্থনা করছেন।’
বিপক্ষের সভা-সমাবেশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এক বাড়িতে চার ভাই থাকলে এক ভাইয়ের কোনো কারণে মন খারাপ হতে পারে- এটা কোনো বিষয় না। কয়েকদিনের মধ্যে সব ঠিক হয়েছে যাবে। তারা আমার সাথি, আমার ভাই। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ চলছে।’
অন্যদিকে এই আসনে জাতীয় পার্টি থেকে নির্বাচনের মাঠে আছেন সাবেক সংসদ সদস্য আনিসুল ইসলাম মণ্ডল। এই আসনে তিনি গত দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ডিউক চৌধুরীর কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। তবে স্থানীয় সূত্র বলছে, এই আসনে বিএনপি, জামায়াত ও জাতীয় পার্টির ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। ২০০৮-এ আনিছুল ইসলাম মন্ডল এই আসনে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন। এখানে তার ভোটব্যাংক আছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে মো. আশরাফ আলীও মাঠে আছেন।
এদিকে ভোটারদের মধ্যে মিশ্র অনুভূতি বিরাজ করছে। বদরগঞ্জের কালুপাড়া ইউনিয়নের তরুণ ভোটার ফয়সাল আহমেদ সারাবাংলাকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে এই আসনে বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতার বাইরে। এবার তাদের সামনে একটা সুযোগ এসেছে। বিএনপি ও জামায়াতের বাইরে জাতীয় পার্টিও ভালো প্রার্থী দিয়েছে। এতে ফলাফল পালটে যেতে পারে।’
তারাগঞ্জের ইকরচালী ইউনিয়নের কলেজ শিক্ষক মিজানুর রহমান সারাবাংলাকে বলেন, ‘এই এলাকা একসময় লাঙ্গলের ছিল। আওয়ামী লীগ থেকেও এমপি হয়েছে। তবে এবার নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে।’
নির্বাচন বিশ্লেষক অধ্যাপক হারুন অর রশীদ চৌধুরীর মতে, ‘জাতীয় পার্টির প্রভাব কমে যাওয়ায় এবং বিএনপি-জামায়াতের সক্রিয়তা বাড়ায় এই আসনে এবার উষ্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। তারা ভোটারদের সচেতনতা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর জোর দিচ্ছেন। ভোটারদের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে, এই ঐতিহ্যবাহী আসনের ভবিষ্যৎ গন্তব্য। এখানে কখনো একক দলের আধিপত্য স্থায়ী হয়নি। প্রতিটি নির্বাচনেই নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে, ভোটাররা তাদের পছন্দের প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। এবারের নির্বাচনেও সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা হবে কি না, সেটিই এখন দেখার অপেক্ষা।’
স্থানীয় নির্বাচন অফিস জানায়, এ আসনে মোট ভোটার ছিলেন ৩ লাখ ৫৭ হাজার ৪৬ জন। এখানে তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ছিলেন আট জন। কেন্দ্র ছিল ১৩৬টি। এবার রংপুর-২ আসনে ভোটার হয়েছেন ৩ লাখ ৮০ হাজার ৯২১ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬২৫ জন, পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৯২ হাজার ২৮৭ জন। এছাড়া তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন নয় জন। এই আসনে ভোটার বেড়েছে ২৩ হাজার ৮৭৫টি। আর কেন্দ্র বেড়েছে একটি।