Image description

এলাহী নেওয়াজ খান

বাংলাদেশের রাজনীতি ও নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে কেবল তিক্ত অভিজ্ঞতাই আমাদের মনোজগৎকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। আমরা বড় হয়েছি আইয়ুব খানের তথাকথিত মৌলিক গণতন্ত্রের ধারণার মধ্য দিয়ে, যা ছিল মূলত স্বৈরশাসন ধরে রাখার এক অভিনব পন্থা। আমি দেখেছি ১৯৬৫ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। তখন আমার বয়স ১৩-১৪ বছর হলেও নির্বাচনি আবহাওয়া বুঝতে খুব অসুবিধা হয়নি। সেই নির্বাচনে কনভেনশন মুসলিম লীগের প্রার্থী ছিলেন প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান এবং সম্মিলিত বিরোধী দলের প্রার্থী ছিলেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর বোন ফাতিমা জিন্নাহ। জনমতের হিসাবে ফাতিমা জিন্নাহ জনপ্রিয় হলেও মৌলিক গণতন্ত্রের সুবাদে বিপুল ভোটে আইয়ুব খান বিজয়ী হয়েছিলেন। জনগণের ভোটে নির্বাচন হলে নিঃসন্দেহে আইয়ুব খান পরাজিত হতেন।

আবার এদিকে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে আইয়ুব শাহির পতনের পর ১৯৭০ সালের নির্বাচন দেখে মনে হয়েছিল—নির্বাচন বুঝি এরকমই হয়। অর্থাৎ একজন ব্যক্তি যত খুশি ভোট দিতে পারে। সে নির্বাচনে সেটাই ঘটেছিল। বলা যায়, সে নির্বাচন অবাধ ছিল, কিন্তু নিরপেক্ষ ছিল না। কারণ গণঅভ্যুত্থানে আইয়ুব খানের পতনের পর মুসলিম লীগের অস্তিত্ব প্রায় ‘নাই’ হয়ে গিয়েছিল। অন্যদিকে মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করায় কার্যত ভোটাভুটিটা আওয়ামী লীগের পক্ষে একতরফা হয়ে গিয়েছিল। আর সেই নির্বাচনের ফলাফল ছিল অভাবিত, যা নির্ধারণ করে দিয়েছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা।

এদিকে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ’৭৩ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম নির্বাচন থেকে শুরু করে একটি বাদে সব নির্বাচন আমি দেখেছি খুব কাছ থেকে। ২০০৮ সালের নির্বাচনের সময় আমি দেশের বাইরে ছিলাম, তাই প্রত্যক্ষ করতে পারিনি। আমার অভিজ্ঞতা বলে, কারচুপির পথে না হেঁটে আওয়ামী লীগ যদি ’৭৩ সালের নির্বাচনটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে পারত, তাহলে কোনো দুঃখজনক পরিণতি যেমন কাউকে ভোগ করতে হতো না; তেমনি নতুন প্রজন্ম দেখতে পেত অন্য এক বাংলাদেশ। কিন্তু আওয়ামী লীগ শুরুতেই নির্বাচন ব্যবস্থার বিপর্যয় ঘটিয়ে নিজেকে যেমন অগণতান্ত্রিক পন্থার মধ্যে আবদ্ধ করেছে, তেমনি মানুষের গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষাও ধ্বংস করে দিয়েছে। যেন আওয়ামী লীগ চিরকালের জন্য অগণতান্ত্রিক পন্থার উত্তরাধিকারী হয়ে গেছে। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ যতবার ক্ষমতায় যাবে, ততবারই গণতান্ত্রিক নিবর্তনমূলক শাসন কায়েম করবে। স্বাধীনতার পর বিগত ৫৪ বছরের মধ্যে আওয়ামী লীগের ২৪ বছরের শাসনসহ প্রায় ৩২ বছর দেশের জনগণ অগণতান্ত্রিক শাসনে নিষ্পেষিত হয়েছে। এ কারণেই বলা যায়, এদেশের মানুষ স্বাধীনতার ৫৪ বছরেও দু-একটি ছাড়া বিশ্বাসযোগ্য কোনো নির্বাচন দেখতে পায়নি। বিশেষ করে গত ১৫ বছর ফ্যাসিবাদী শাসন মানুষের আস্থার জায়গাকে প্রায় ধ্বংস করে দিয়েছে।

ঠিক এরকম এক পটভূমিতে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আর আওয়ামী লীগবিহীন এই নির্বাচন কতটা অর্থবহ হয়ে উঠবে, তা দেখার জন্য দেশবাসী অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। এখানে ব্যতিক্রম হচ্ছে, আওয়ামী লীগ অতীতে দুবার স্বেচ্ছায় জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করলেও এবার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। কারণ মানবতাবিরোধী অপরাধে দলটির রাজনৈতিক তৎপরতা নিষিদ্ধ রয়েছে। আগে যে দুটি নির্বাচনে অংশ নেয়নি, সে দুটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ এবং ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি। এটা আওয়ামী লীগের মতো কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক দলের জন্য খুবই অস্বস্তিকর একটি পরিবেশ, যদিও আওয়ামী লীগ অতীতে ভিন্নমতের বহু দলের জন্য অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি করতে সামান্য দ্বিধাবোধ করেনি। এমনকি দলটির সভানেত্রী শেখ হাসিনাসহ শীর্ষ নেতারা যখন দেশটিকে নিজেদের মালিকাধীন ভাবেন, তখন তাদের পক্ষে বর্তমান পরিস্থিতি মেনে নেওয়া খুবই কঠিন কাজ। সুতরাং এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রাজনীতি ও আগামী নির্বাচন নিয়ে একটা মূল্যায়ন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

আজ এটা মানতে হবে যে, এদেশের রাজনৈতিক উত্থান-পতনের যেমন একটা দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে; তেমনি রয়েছে এদেশের মানুষের দ্রুত মানসিক পরিবর্তনের ইতিহাসও। যাকে দিয়েছে পরান ভরে দিয়েছে, আবার একইভাবে মন ফিরিয়ে নিয়েছে। অর্থাৎ জনগণ শাসকদের ব্যর্থতার দায় কাঁধে নিতে চায়নি কখনো। সে কারণে বিগত সাত দশকের রাজনীতি ও নির্বাচনের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, এদেশের মানুষ এক-একটা টার্নিং পয়েন্টে একদিকে যেমন ১৮০ ডিগ্রিতে মোড় নিয়েছে, আবার একই স্টাইলে উল্টে যেতেও দ্বিধা করেনি।

১৯৪৬ সালের নির্বাচনের কথাই ধরুন। সে সময় বঙ্গীয় প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে এদেশের মানুষ মন ভরে মুসলিম লীগের পক্ষে ভোট প্রদান করেছিল। এর ফলে মুসলিম লীগ শতকরা ৮৭ ভাগ আসনে বিজয়ী হয়, যা পরবর্তী সময়ে গণভোট হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। এই ফলাফলে মুসলিম লীগের নেতৃত্বে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান সৃষ্টির জন্য অনুকূল পথ তৈরি হয়। বলা যায়, এদেশের মানুষের ভোটেই মূলত পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান সৃষ্টির মাত্র সাত বছরের মাথায় ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে এদেশের মানুষ মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে একইভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে ভোট প্রদান করে যুক্তফ্রন্টকে বিজয়ী করে। ওই নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট ২৩৭ আসনের মধ্যে ২২৩টিতে বিজয়ী হয়েছিল। এটা ছিল মুসলিম লীগের বৈষম্যমূলক শাসন এবং ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে হত্যাকাণ্ডের ফলাফল। মুসলিম লীগ সরকার খুব দ্রুতই এদেশের জনগণের আস্থা হারিয়ে ফেলেছিল।

সম্ভবত জনগণের এ রকম গ্রহণ ও প্রত্যাখ্যানের মানসিকতা বিবেচনা করে শাসকরা নির্বাচনে নির্লজ্জভাবে কারচুপি কিংবা ভোট-ডাকাতির পন্থা অবলম্বন করে থাকে; অথবা সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে পুরোনো বন্দোবস্ত টিকিয়ে রাখার জন্য গণতন্ত্রের কবর রচনা করে। আর সে রকমটাই করা হয়েছিল যুক্তফ্রন্টের বিশাল বিজয়ের পর। অর্থাৎ জনগণের ভোটে নির্বাচিত যুক্তফ্রন্ট সরকারকে বেশিদিন ক্ষমতায় থাকতে দেওয়া হয়নি।

তখন ঘনঘন সরকার পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হয় এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। এরই সুযোগ গ্রহণ করে ১৯৫৮ সালের অক্টোবরে সেনাপ্রধান জেনারেল আইয়ুব খান ক্ষমতা দখল করে নেন। অর্থাৎ সে সময় পাকিস্তানের শাসকরা ’৫৪ সালের নির্বাচনের ফলাফলকে মানতে না পারায় গণতন্ত্রের কবর রচনা করে সামরিক শাসন জারি করেছিল। অর্থাৎ একটি সদ্য স্বাধীন দেশে এভাবে গণতন্ত্রের মৃত্যু ঘটানোর পরিণতি শুভকর হয়নি। এরই অনিবার্য পরিণতি ছিল ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার যুদ্ধ, যার মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে।

কিন্তু জনগণের দুঃখের পথ বুঝি শেষ হয় না! তাই এ দেশের মানুষ আবারও দেখতে পেল যে, সদ্য স্বাধীন দেশে কীভাবে পাকিস্তান আমলের পুনরাবৃত্তি ঘটছে। যে আওয়ামী লীগ ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জনগণের আকুণ্ঠ সমর্থন লাভ করে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের ৩০০ আসনের মধ্যে ১৬০টি আসনে বিজয়ী হয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছিল এবং প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৮৮টি আসনে জয় পেয়েছিল, সেই আওয়ামী লীগই জনগণের ওপর নিবর্তনমূলক শাসন চাপিয়ে দিয়েছে। এরপরে জনগণ দ্রুত হতাশায় নিমজ্জিত হয় এবং ধীরে ধীরে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। সাধারণ মানুষ ভাবতেই পারেনি আওয়ামী লীগ অতীত ভুলে গিয়ে জনগণের ওপর এরকম অত্যাচার ও নিপীড়ন শুরু করবে।

আওয়ামী লীগ নেতারা ভুলেই গেলেন যে, জনগণ তাদের জন্যই যুদ্ধে নেমেছিল এবং জীবন উৎসর্গ করেছিল। তাই সাধারণ মানুষ নিবর্তনমূলক এই শাসন কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিল না। শুধু তা-ই নয়, আওয়ামী লীগ নেতাদের বেপরোয়া ত্রাণসামগ্রী লুটপাট ও দুর্নীতির ফলে জনগণের মনে দেখা দেয় চরম হতাশা। এর ফলে অতি দ্রুত আওয়ামী লীগ জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এরই প্রেক্ষাপটে স্বাধীনতার পর মাত্র ১৫ মাসের মাথায় অনুষ্ঠিত ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে ভীত হয়ে পড়া আওয়ামী লীগ ব্যাপক কারচুপির আশ্রয় গ্রহণ করে। আর এই কারচুপির মাধ্যমে দলটি ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৩টি আসনে বিজয় ছিনিয়ে নেয়, যার মধ্যে ১১ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। তখন ‘দৈনিক গণকণ্ঠ’ পত্রিকার ব্যানার হেডিং ছিল এরকম—‘বাংলাদেশে কোনো বিরোধী দল নেই’। কারণ এ নির্বাচনে বিরোধী দলগুলোর প্রার্থীদের বিজয়ী হওয়ার জন্য সামান্যতম সুযোগ দেওয়া হয়নি। এমনকি খন্দকার মোশতাক আহমদের মতো প্রার্থীর পরাজয়ের আশঙ্কা থেকে কুমিল্লার দাউদকান্দি থেকে ব্যালট বাক্স ঢাকায় এনে বিজয় ঘোষণা করা হয়েছিল। ওই আসনে মূলত জাসদ প্রার্থী রশিদ ইঞ্জিনিয়ার জয়লাভ করেছিলেন। অর্থাৎ ’৭৩-এর নির্বাচন ছিল একটা নীলনকশার নির্বাচন। আর আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থেকে সদ্য স্বাধীন দেশের প্রথম নির্বাচনকে এভাবে বিতর্কিত করে কার্যত এদেশের নির্বাচন ব্যবস্থাকেই ধ্বংস করে দিয়েছিল। পাকিস্তানি শাসকদের মতোই হেরে যাওয়ার ভীতি থেকে আওয়ামী লীগের এ ধরনের কারচুপির আশ্রয় দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক চেতনাকেই কেবল সমাধিস্থ করেনি, বরং এর মাধ্যমে আওয়ামী লীগের ভীতির ব্যাপারটি আরো বেশি করে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। আর এই ভীতি থেকেই ১৯৭৫ সালে আওয়ামী লীগ একদলীয় ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েম করে। বলা যায় ’৫৪ এবং ’৭০ সালের নির্বাচনে বিজয়ী জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে এভাবে পদদলিত করার পরিপ্রেক্ষিতে যেমন পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে; তেমনি সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচনে জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে অবজ্ঞা করার জন্য আওয়ামী লীগকে করুণ পরিণতি ভোগ করতে হয়েছিল। মূলত ’৭৩ সালের নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি, একদলীয় শাসন কায়েম ও নিষ্ঠুর নিপীড়নমূলক শাসনের ফলেই আওয়ামী লীগ অতি দ্রুত জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল।

 

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর মাত্র সাড়ে তিন বছরের শাসনে আওয়ামী লীগ কতটা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল, তা প্রমাণিত হয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ব্যাপক উত্থানের মাধ্যমে। ভাবাই যায় না, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর একজন সামরিক শাসকের নেতৃত্বে গঠিত বিএনপি খুব অল্প সময়ের মধ্যে কীভাবে তৃণমূল পর্যন্ত জনপ্রিয়তা লাভ করে ফেলেছিল। তাই ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ২০৭টি আসনে বিজয়ী হয়েছিল। মালেক উকিলের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পেয়েছিল মাত্র ৩৯টি আসন। খুব কৌতুকউদ্দীপক ব্যাপার হচ্ছে, আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ নির্বাচনে দলের বিপর্যয় কিংবা গণআন্দোলনে উৎখাত হওয়ার কারণগুলো কখনোই পর্যালোচনা করেননি, কিংবা করতে পছন্দ করে না। বরং সবসময় ষড়যন্ত্রের অজুহাত তুলে নিজেদের দুর্বলতাকে ঢাকার চেষ্টা করে থাকে। কিংবা ভারত তাদের পেছনে অবিচলভাবে আছে, এই বদ্ধমূল ধারণা থেকে হয়তো আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ কখনোই ভাবতে চান না, তারা ভুল করেছেন। অবশ্য তাদের এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ভীতি থেকে। কারণ ভীতি থেকেই শক্তি প্রয়োগের ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়। যেমন নির্বাচনে হারতে পারে এই ভীতি থেকে শাসকেরা শক্তি প্রয়োগের পথ বেছে নেন।

১৯৭৯ সালের নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয়ের পর আওয়ামী লীগ যে পথটি বেছে নিয়েছিল, তা প্রকাশ পায় ১৯৮২ সালে ২৪ মার্চ তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল এরশাদের ক্ষমতা দখলের পর। ওইদিন জেনারেল এরশাদ জনপ্রিয় ভোটে নির্বাচিত বিএনপি সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করেন। ওই সময়ের আওয়ামী লীগের মুখপত্র হিসেবে পরিচিত ‘দৈনিক বাংলার বাণী’র শিরোনাম এবং শেখ হাসিনার বিবৃতি প্রমাণ করেছিল, এরশাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের একটা আঁতাত হয়েছে। বাংলার বাণীর শিরোনাম ছিল এরকম—‘এক ফোঁটা রক্ত ঝরেনি’; আর আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেছিলেন, ‘আই অ্যাম নট আনহ্যাপি।’

অথচ আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর থেকে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা করে আসছিলেন। আর সেই আঁতাতের পথ ধরে ১৯৮৬ সালের তৃতীয় জাতীয় নির্বাচনে শেখ হাসিনা অংশগ্রহণ করেছিলেন, আর পক্ষান্তরে বিএনপি বয়কট করেছিল। কিন্তু এরশাদবিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে উঠলে ’৮৮ সালে আওয়ামী লীগ সংসদ থেকে পদত্যাগ করে আন্দোলনে শরিক হয়। এই পরিস্থিতিতে এরশাদ সংসদ ভেঙে দিয়ে ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেন।

কিন্তু বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও জামায়াতসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দল ওই নির্বাচন বয়কট করে। এ অবস্থায় বিরোধী দলের তুমুল আন্দোলনের মুখে এরশাদ রাষ্ট্রশক্তির জোরে ওই নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে সক্ষম হলেও বেশিদিন আর ক্ষমতায় থাকতে পারেননি। প্রচণ্ড আন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি এরশাদ পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। সেইসঙ্গে পরিসমাপ্তি ঘটে এরশাদের ৯ বছরের স্বৈরশাসন। আর বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে পঞ্চম জাতীয় সংসদীয় নির্বাচনের তারিখ ঘোষিত হয়। সেটা ছিল ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি। ওই নির্বাচনে বিএনপি ১৪০ আসনে বিজয়ী হলেও সরকার গঠনের ম্যাজিক নম্বর ১৫১-তে পৌঁছাতে না পারায় সংকটে পড়েছিল। ঠিক সে সময় ১৮ আসনে বিজয়ী জামায়াতে ইসলামী বিএনপিকে সমর্থন জানিয়ে সরকার গঠনে সহায়তা করে। আর ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পেয়েছিল মাত্র ৮৮টি আসন। তবে নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ নিশ্চিত ছিলেন, তারা নির্বাচনে বিজয়ী হতে চলেছেন। সেজন্য নির্বাচনকালে তারা বেশি হইচই করেননি। এ কারণে ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের শোচনীয় পরাজয়কে দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনা সহজে মেনে নিতে পারেননি। তাই তিনি সংসদের ভেতরে ও বাইরে আন্দোলন করার সিদ্ধান্ত নেন। একপর্যায়ে জামায়াতে ইসলামীর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিকে সম্বল করে আওয়ামী লীগ আন্দোলনের মাঠে নেমে পড়ে।

এদিকে তুমুল আন্দোলনের মধ্যেই বিএনপি সরকার সংবিধানের ধারাবাহিকতা রক্ষার কথা বলে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করে। কিন্তু আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় পার্টি বয়কট করায় ওই নির্বাচনটি একতরফা নির্বাচনে পরিণত হয়। এতে বিএনপি ২৭৮টি আসনে বিজয়ী হয়। এর মধ্যে বিএনপি প্রার্থীরা ৪৯টি আসনে বিজয়ী হয়েছিলেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। তবে এই সংসদের স্থায়িত্ব ছিল মাত্র ১৩ দিন। কারণ বিএনপি শক্তি প্রয়োগের পথে না হেঁটে সংসদে আইন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান সংবিধানে সংযুক্ত করে গণতন্ত্রের জন্য ঐতিহাসিক এক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল। এরপর বিএনপি সরকার পদত্যাগ করলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১৯৯৬ সালের ১২ জুন সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৪৬ আসন লাভ করলেও সরকার গঠনের ১৫১ আসন না থাকায় হতাশায় ভুগছিল। কিন্তু চিরসাথি হিসেবে ৩২ আসন পাওয়া জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জেনারেল এরশাদ সমর্থন দিয়ে আওয়ামী লীগকে সরকার গঠনে সহায়তা করেন। যদিও ওই নির্বাচনে ১১৬ আসনে জয়লাভ করলেও বিএনপিরও সরকার গঠনের সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু সেটা কেন হয়নি, তা অন্য একটি বিষয়। যাহোক আওয়ামী লীগ ২১ বছর পর আবার সরকার গঠন করলেও তার চিরাচরিত বৈশিষ্ট্য থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। বিরোধী দলকে শত্রু ভাবা এবং সমূলে উচ্ছেদ করার আওয়ামী লীগের প্রবণতা সবসময়ই একই রকম। আর আওয়ামী লীগ তার প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে না পারায় ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। এই নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতৃত্বে চারদলীয় জোট ১৯৩টি আসনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পেয়েছিল মাত্র ৬২টি আসন।

 

অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের এই শোচনীয় পরাজয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন এক ষড়যন্ত্রের আভাস ফুটে ওঠে। সংবিধান অনুযায়ী মেয়াদ শেষে বিএনপি সরকারের পদত্যাগ এবং যথাসময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হলেও পর্দার অন্তরালে চলছিল ভয়ানক এক ষড়যন্ত্র। আর এই ষড়যন্ত্রের পথ ধরেই ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয় এবং গঠন করা হয় সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ থেকে স্পষ্ট হয়ে যায়, ওই ষড়যন্ত্রের মূল লক্ষ্য ছিল আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাসীন করা। পরবর্তী সময়ে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২৩০টি আসনে জয়লাভ করে। আর বিএনপি পায় মাত্র ৩০টি আসন। যদিও ক্ষমতায় থাকাকালে ‘ক্লিন হার্ট’ অপারেশনের মাধ্যমে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বিএনপির ভাবমূর্তি দারুণভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েম, একতরফাভাবে দশম, একাদশ ও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ভারতের সমর্থন এবং দেশের বিভিন্ন বাহিনীর দলীয় কর্মীর মতো সহায়তা করার ঘটনা প্রমাণ করে, আওয়ামী লীগ একটি নীলনকশার অধীনে টানা ১৫ বছর ইতিহাসের ভয়ানকতম শাসন চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল।

কিন্তু এবার ঘটলো অন্য ঘটনা। আওয়ামী লীগ সরকার বিভিন্ন বাহিনী দ্বারা গুম-খুনের মাধ্যমে রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীদের টুঁটি চেপে ধরতে পারলেও শেষ পর্যন্ত গণবিদ্রোহে বা গণবিপ্লবের মুখে পদত্যাগ করে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। এই পটভূমিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ, তা ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু যারা একসময় আওয়ামী লীগ-বিরোধী ছিল, তারাই এখন আসন্ন নির্বাচনে পরস্পরের বিরুদ্ধে শুধু লড়াই করছে না, বরং একে অপরকে শত্রুরূপে দেখছে। এটা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে আওয়ামী লীগ-বিরোধী সেই সমন্বিত শক্তি ভবিষ্যতে প্রচণ্ডভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে এবং তার সুযোগ নিয়ে আওয়ামী লীগ আবার রাজনৈতিক মঞ্চে আবির্ভূত হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। তাই সাধু সাবধান!

 

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক