Image description

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় আছে ১৬ দিন। আর প্রচারণার ময়দানে প্রার্থীদের দাপিয়ে বেড়ানোর সুযোগ আছে আর মাত্র দুই সপ্তাহ। তবে এরই মধ্যে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে পরিবেশ। নির্বাচনি প্রচারণা ঘিরে প্রতিদিনই ঘটছে নানা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা।

প্রার্থীদের একে অপরকে দোষারোপ, অতীতের আমলনামা এবং জননিরাপত্তাকে ঘিরে প্রার্থীরা ভোটারদের করছেন সতর্ক। প্রার্থীরা দিচ্ছেন একে অপরকে হুমকি। এছাড়া মোবাইল নম্বর ও বিকাশ নম্বর ‘আদান-প্রদান’ নিয়েও অভিযোগ করছেন কেউ কেউ। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মাঝে হয়েছে সংঘর্ষ। এমনকি ঢাকায় একটি নির্বাচনি আসনের প্রার্থীকে দুই দফায় ডিম মারার মতো ঘটনাও ঘটেছে।

আসন্ন নির্বাচনে প্রচারণার অংশ হিসেবে মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ময়মনসিংহ সফর করেছেন। সেখানে সমাবেশে তিনি কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ময়মনসিংহ সার্কিট হাউজ ময়দানে আয়োজিত বিএনপির নির্বাচনি জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘‘দেশের বিদ্যমান সমস্যার সমাধান চাইলে ধানের শীষে ভোট দেওয়ার কোনও বিকল্প নেই।’’

বিএনপি’র বিরুদ্ধে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়া নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের প্রশ্নের পাল্টা জবাবে তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘‘চারদলীয় জোট সরকার যদি দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে থাকে, তাহলে জামায়াতের দুই শীর্ষ নেতা (মন্ত্রীর পদ থেকে) তখন কেন পদত্যাগ করেননি!’’

তারেক রহমান বলেন, ‘‘এই মুহূর্তে একটি রাজনৈতিক দল যেই স্বৈরাচার পালিয়ে গিয়েছে, সেই স্বৈরাচারের মুখের ভাষা ব্যবহার করছে বিএনপিরই বিরুদ্ধে। ঠিক সেই স্বৈরাচার যেভাবে বলতো, তাদেরই ভাষা ব্যবহার করছে, তাদের বক্তব্য যে– বিএনপি দুর্নীতিতে বলে চ্যাম্পিয়ন ছিল। তো আমার প্রশ্ন, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তাদেরও তো দুই জন সদস্য বিএনপির সরকারে ছিল, ছিল না? ছিল তো!  বিএনপি যদি অতই খারাপ হয়, তাহলে ওই দুই ব্যক্তি কেন পদত্যাগ করে চলে আসেননি?’’ 

অপরদিকে নির্বাচনি প্রচারণায় অংশ নিতে যশোর গিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) সকালে যশোর ঈদগাহ ময়দানে নির্বাচনি জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বিএনপিকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘‘যারা নিজেদের দলকে সামলে রাখতে পারে না, কর্মীদের জীবনের নিরাপত্তা দিতে পারে না—সেই দল যত বড় দলই হোক, তাদের কাছে বাংলাদেশ নিরাপদ নয়।’’

তিনি বলেন, ‘‘একদিকে ফ্যামিলি কার্ড, অপরদিকে মহিলাদের গায়ে হাত, দুটো একসঙ্গে চলতে পারে না। এটিই বার্তা, তারা জিতলে কেউ নিরাপদ থাকবে না।’’

এদিকে রাজধানীতে ১১ দলীয় জোট সমর্থিত ঢাকা-৮ আসনের প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর ডিম নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। এর আগেও সিদ্ধেশ্বরীতে গণসংযোগকালে তার ওপর ডিম ছুড়ে মারা হয় এবং ময়লা পানি নিক্ষেপ করা হয়।

মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) দুপুর ১২টার দিকে শান্তিনগর এলাকায় হাবিবুল্লাহ বাহার ইউনিভার্সিটি কলেজে এমন ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজে আয়োজিত একটি পিঠা উৎসবে যোগ দিতে দুপুরে সেখানে যান ‘শাপলা কলি’ প্রতীকের প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তার উপস্থিতিতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের একাংশের মধ্যে উত্তেজনা শুরু হয়। একপর্যায়ে একদল শিক্ষার্থী তাকে উদ্দেশ করে স্লোগান দিতে থাকেন এবং একের পর এক ডিম নিক্ষেপ করেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তিনি কলেজ থেকে বের হয়ে সামনের রাস্তায় বসে পড়েন।

তিনি তার প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী মির্জা আব্বাসের দিকে অভিযোগ ছুড়ে বলেন, ‘‘আমি মির্জা আব্বাসকে বলবো—এই সন্ত্রাসী কার্যকলাপ বন্ধ করেন। এভাবে হামলা করে আমাদের ভয় দেখানো যাবে না। আগামী ১২ তারিখ জনগণ ব্যালটের মাধ্যমে এসবের জবাব দেবে।”

এরপর সংবাদ সম্মেলন করে তিনি মির্জা আব্বাসকে বিএনপি থেকে বহিষ্কারের দাবি জানান। 

নাসীরুদ্দিন পাটওয়ারীর অভিযোগ প্রসঙ্গে মির্জা আব্বাস জানান, আমি কী বলবো। এই ধরনের স্কোপ তো খুঁজছে। বহু দিন ধরে লাগার চেষ্টা করছে। কে লাগবে ওর সঙ্গে খামোখা। আমার ঝগড়া করার কোনও প্রয়োজন নেই। আমার ঝগড়া করার কোনও রেকর্ড নেই। আমি বহু আগে থেকে নির্বাচন করি, আমার রেকর্ড নেই কোনও প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে ঝগড়া বা সংঘর্ষের। 

১১ দলীয় জোট সমর্থিত ঢাকা-১১ আসনের প্রার্থী নাহিদ ইসলাম এদিন রাজধানীর রামপুরা বাজার এলাকায় গণসংযোগ করেছেন। নাহিদ ইসলাম বাজারের ব্যবসায়ীদেরকে শাপলা কলি মার্কা ও গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। এসময় তিনি বলেন, ‘‘আপনারা (বিএনপি) কি আওয়ামী লীগের পথে হাঁটবেন, নাকি গণতন্ত্রের পথে হাঁটবেন। আওয়ামী লীগ অন্য দলকে রাস্তায় নামতে দিতো না। তাদের পরিণতি ৫ আগস্ট কী ঘটেছে সবাই দেখেছে। এখন বিএনপি এ রকম করছে, তাদের পরিণতিও আওয়ামী লীগের মতোই হবে।’’

তিনি বলেন, ‘‘আজ পাটয়ারীর ওপর হামলা হয়েছে। গতকাল উত্তরায় হামলা হয়েছে। ৬/৭টি জেলায় জামায়াতের মহিলা কর্মীদের হেনস্তা করা হয়েছে। হুমকি ও ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। আমরা কিন্তু আর বসে থাকবো না।’’  

নির্বাচনি প্রচারণায় মাঠের উত্তপ্ততার প্রধান কারণ হিসেবে ‘বিএনপির হামলা ও উগ্রতাকে’ দায়ী করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আরিফুর রহমান তুহিন। 

বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘‘রাজধানীর মতো জায়গায় পরপর আমাদের দুই এমপি প্রার্থীর ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। গতকাল ঢাকা-১৮ আসনের প্রার্থী আরিফুল ইসলাম আদিবের এবং আজ ঢাকা-৮ আসনের প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলা করা হয়েছে। দুটো ঘটনার সঙ্গেই সরাসরি বিএনপির জড়িত। তাদের হামলার কারণে নির্বাচনি মাঠে এই উত্তপ্ততা। একসময় তারা ছিল মজলুম, এখন তারা হয়ে উঠেছে জুলুমকারী।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর এমপি প্রার্থী ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। অথচ সেই ঘটনাকে নির্বাচন কমিশন বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে আখ্যায়িত করেছে‌। সেই ঘটনার পর থেকে নির্বাচনি মাঠ আরও বেশি নিরাপত্তাহীন হয়ে গেছে। এর মধ্য দিয়েই সবাই যাচ্ছে। তার সঙ্গে দেশব্যাপী বিএনপির নেতাকর্মীদের হিংস্রতা নতুন মাত্রা যোগ করেছে।’’

‘‘নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ না’’ উল্লেখ করে এনসিপি'র এই নেতা বলেন, ‘‘নির্বাচন কমিশন বিএনপির আজ্ঞাবহ। তারা নিরপেক্ষ না। তবে তাদের এটুকু মনে রাখা উচিত, নিরপেক্ষ না থাকায় হুদা কমিশন এবং আউয়াল কমিশনের সঙ্গে কী হয়েছে।’’

এদিকে দেশের কয়েকটি স্থানে বিএনপি এবং জামায়াত কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। এছাড়া পটুয়াখালীতে দশমিনা উপজেলায় গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হাসান মামুনের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ ও নির্বাচনি অফিস ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এতে দুই পক্ষের বেশ কিছু কর্মী আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এই সংঘর্ষ নিয়ে একে-অপরকে দোষারোপ করছেন দুই প্রার্থী।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পারস্পরিক দোষারোপের বক্তব্য নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে সামনে পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মাহবুবুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘রাজনৈতিক দলগুলো এবং নেতৃত্ব একে-অপরের ব্যাপারে যেভাবে কথা বলছে, সেটাও আগের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে মিলে যায়। এটা না হলে ভালো ছিল। যদিও এরকম ঘটনা সামান্য, কিন্তু এই সামান্যও তো হতে পারে না। আমাদের তো চেঞ্জ হতে হবে।’’

তিনি বলেন, ‘‘রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে যে কাদা ছোড়াছুড়ি হচ্ছে, এটা যদি সহিংসতার রূপ নেয় সামান্য হলেও— এটাকে খুব সিরিয়াসলি দেখতে হবে নির্বাচন কমিশনকে। নির্বাচন কমিশনকে এগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তাহলেই পরিবেশটা আস্তে আস্তে ভালো হয়ে উঠবে।’’

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ বলেন, ‘‘প্রচারণায় প্রত্যেকেই চাইবে তার প্রতিদ্বন্দ্বীকে ঘায়েল করতে। কিন্তু এটা যেন সীমা অতিক্রম না করে যায়। ‘জান্নাতের টিকিট বিক্রি’ করার মতো বক্তব্য দেওয়া আসলে মোটেই সমীচীন না। আমার মনে হয় প্রচারণায় ধর্মীয় বিষয়ের ব্যবহার নিয়ে নির্বাচন কমিশনের খুব কঠিন হওয়া দরকার।’’

তিনি বলেন, ‘‘সোশ্যাল মিডিয়ায় যে অপতথ্য চালানো হচ্ছে এগুলো ভালো না, এগুলো পরিবেশ নষ্ট করে দিতে পারে সামনের দিনে।’’