Image description
ঢাকা-৯

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাকি মাত্র দুই সপ্তাহ। প্রচারণায় ব্যস্ত প্রার্থীরা। ঢাকা-৯ আসনেও চলছে জমজমাট প্রচারণা। সবুজবাগ, খিলগাঁও, বাসাবো ও মুগদা এলাকা নিয়ে গঠিত আসনটিতে ত্রিমুখী  লড়াইয়ের আভাস পাওয়া গেছে। এ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ও বিএনপি’র কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হাবিবুর রশিদ হাবিব। জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী এনসিপির যুগ্ম-আহ্বায়ক জাবেদ রাসিন। এনসিপি থেকে পদত্যাগ করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে আলোচনায় রয়েছেন ডা. তাসনিম জারা। এই তিন প্রার্থীর মধ্যেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। 

দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত এ আসনটি। হয়নি উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন, বাসিন্দাদের মুক্তি মেলেনি দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ থেকে। হাত বাড়ালেই মেলে মাদক, পাশাপাশি শীতকালে থাকে তীব্র গ্যাস সংকট। সড়কগুলোর অবস্থা বেহালদশা, জায়গায় জায়গায় খানাখন্দে ভরা। বর্ষা এলেই অনেক সড়ক পানিতে তলিয়ে যায়, এ ছাড়া ফুটপাথ দখল যেন নিত্যদিনের ঘটনা। নাগরিক সুযোগ-সুবিধার দুর্ভোগের শেষ নেই। নাগরিক সুযোগ-সুবিধার অভাব, মাদক, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসে অতিষ্ঠ ভোটাররা এবার পরিবর্তন চান। তাদের প্রত্যাশা, এবারের নির্বাচনেই মিলবে দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ থেকে মুক্তি। নির্বাচিত সংসদ সদস্য এলাকার দুর্ভোগ ও সমস্যা নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখবেন এমন আশাই তাদের। ভোটাররা জানান, এবার শুধু দলীয় প্রতীক নয়, প্রার্থীর সততা, বর্তমান ও অতীতের কর্মকাণ্ড বিচার করেই ভোট দেবেন তারা।

মধ্য বাসাবো এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী  বলেন, বিগত ১৭ বছর ধরে এ এলাকায় কোনো উন্নয়নমূলক কাজ হয়নি। সবচাইতে অবহেলিত এ আসনটি। এলাকার প্রতিটি সড়কের বেহালদশা, মাদকের সমস্যা প্রধান সমস্যা। এ আসনে বিএনপি’র  পক্ষ থেকে হাবিবুর রশিদকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। তিনি খুব ভালো মানুষ। এখানে শুরু থেকে আফরোজা আব্বাস প্রচারণা চালিয়ে আসছিলেন। আমরা চাই নেতৃত্বে যেই আসুক তিনি যেন দীর্ঘদিনের অবহেলার পরিত্রাণ করে। 

নন্দিপাড়া এলাকার বাসিন্দা মোরশেদ আলম বলেন, ভোটের সময় প্রতিশ্রুতি দেয়া হয় কিন্তু বাস্তবে কাজ হয় না। এটি একটি অবহেলিত আসন। রাস্তাঘাট খানাখন্দে ভরা। এ ছাড়া রয়েছে মাদকের সমস্যা। তারপরেও দীর্ঘ ১৭ বছর পর ভোট দিতে পারবো এটাই বড় কথা। এখানে মনে হচ্ছে ত্রিমুখী লড়াই হবে। তাসনিম জারা স্বতন্ত্র হয়ে লড়াই করছেন। যুব শ্রেণির মধ্যে তার কিছুটা জনপ্রিয়তা রয়েছে। অন্যদিকে জাবেদ রাসিনের পক্ষে জামায়াত রয়েছে। আর হাবিব ভাই তো শুরু থেকেই জনপ্রিয় ব্যক্তি, উনি একজন ক্লিন ইমেজের লোক। সবমিলিয়ে আমরা চাই নির্বাচন যেন সুষ্ঠু হয়। যেই নির্বাচনে জয়ী হোক না কেন আমরা চাই এলাকার উন্নয়মূলক কাজ যেন সঠিকভাবে পরিচালনা করেন।

খিলগাঁও তালতলায় কথা হয় ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী তারেক হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, এখানে বিএনপি’র হাবিবুরের একক আধিপত্য রয়েছে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের মধ্যে অন্য প্রার্থী নিয়ে আলোচনা চলছে। এ আসন আগে থেকেই তাসনিম জারার জন্য ফেসবুকে অনেক বেশি আলোচিত হয়েছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি অংশ তাকে পছন্দ করেন। আমাদের দেশে যে প্রেক্ষাপট কখনো বিএনপি, আবার কখনো আওয়ামী লীগ পাস করে। অন্য কোনো লোকের যোগ্যতা থাকলেও তারা পাস করতে পারে না, দলীয় একটা প্রভাব থাকে। অনেক মানুষই ওইরকম জোয়ারে চলে।

তিলপাপাড়া এলাকার বাসিন্দা শামসুল হক বলেন, আসলে কার মনে কি আছে সেটা বোঝা মুশকিল। তবে সুষ্ঠু ভোট হলে এখানে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। প্রকাশ্যে বিএনপি প্রার্থীর কর্মকাণ্ড চোখে পড়ছে। জামায়াত নীরবে ভোটারদের বাসায় বাসায় যাচ্ছেন। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে তাসনিম জারা ও জাবেদ রাসিনের জনপ্রিয়তা রয়েছে। প্রার্থীরা সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রচারণা বেশি করছেন। অনেকে প্রার্থী ও দলের কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করছেন। গত ১৬ বছর ভোট দিতে পারিনি, আমরা চাই নির্বাচন যেন সুষ্ঠু হয়। প্রার্থীর সততা, বর্তমান ও অতীতের কর্মকাণ্ড বিচার করেই ভোট দিবো।

বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হাবিবুর রশিদ হাবিব বলেন, আমি এলাকার সন্তান, ৩৮ বছর ধরে রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। এ এলাকার মানুষের যে সমস্যা, সেগুলো আমারও সমস্যা। এটি নাগরিক সুবিধা বঞ্চিত এলাকা। এখানে ভালো রাস্তা নেই, খাল ভরাট করা হয়েছে সেগুলো উদ্ধার করা প্রয়োজন। এখানে বিশ্ববিদ্যালয়, ভালো স্কুল, কলেজ নেই, একটিমাত্র হাসপাতাল রয়েছে (মুগদা হাসপাতাল) যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। 
আগামীদিনে যে কাজগুলো করলে এলাকার মানুষের দুঃখ-দুর্দশা লাঘব হবে, আমি সে কাজগুলো করতে চাই। এলাকাকে সন্ত্রাস, মাদক, চাঁদাবাজ মুক্ত করতে চাই। এ এলাকার নাগরিক অধিকারগুলো বাস্তবায়ন করতে চাই। 

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী জাবেদ রাসিন মানবজমিনকে বলেন, এই আসন রাজধানীর অন্য আসন থেকে আলাদা। এ আসনে অনেক এলাকা দীর্ঘদিন নগরের অনেক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে আছে। এ আসনের যোগাযোগ ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার কোনো উন্নতি হয়নি। এ ছাড়া গ্যাস সংকট রয়েছে। তিনি বলেন, কুটির শিল্প ও স্থানীয়  ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের নিয়ে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলবো। পাশাপাশি আইটি ট্রেইনিংয়ের মাধ্যমে যুবক ও নারীদের ঘরে বসে আয়ের ব্যবস্থা করবো। এগুলো করতে পারলে কর্মসংস্থানের উন্নয়ন ঘটবে ফলে বেকারত্ব দূর হবে। আমি একইসঙ্গে অবকাঠামোগত ও মানবসম্পদ নিয়ে কাজ করতে চাই।

স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. তাসনিম জারা বলেন, এটি রাজধানীর একটি ঘনবসতিপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। এখানকার মানুষ নিয়মিত কর ও বিভিন্ন বিল পরিশোধ করলেও কাঙ্ক্ষিত নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। গ্যাসের সমস্যা এখানে সবচেয়ে বড়। বিল দেয়ার পরও দিনের বেশির ভাগ সময় গ্যাস থাকে না। রাস্তাঘাটের অবস্থা বেহাল, জলাবদ্ধতা এবং ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার মতো রোগের উপদ্রব নিত্যদিনের সমস্যা। তিনি আরও বলেন, ‘ঢাকা-৯ এলাকার বিপুল জনসংখ্যার জন্য একমাত্র সরকারি হাসপাতাল মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। কিন্তু সেখানে অব্যবস্থাপনা ও সেবার ঘাটতি রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নির্বাচনী ইশতেহারে রাখা হয়েছে। মানুষ আমাদের এসব প্রস্তাবকে ইতিবাচকভাবে দেখছে এবং সাধুবাদ জানাচ্ছে।’ 
ঢাকা-৯ আসনটি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ৭১, ৭২, ৭৩, ৭৪ ও ৭৫ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত। এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৪৯ হাজার ৯৫২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ২৮ হাজার ৩৬৪ জন এবং নারী ভোটার ২ লাখ ২১ হাজার ৫৮৭ জন।