Image description
ঢাকা ১৪

ভিন্ন কারণে আলোচনায় ঢাকা-১৪ আসনটি। রাজধানীর উত্তরের প্রবেশদ্বার মিরপুর, শাহআলী ও দারুসসালাম এলাকা নিয়ে গঠিত আসনটিতে প্রার্থী হয়েছেন ফ্যাসিবাদী আমলে গুমসংশ্লিষ্ট দু’জন। বিএনপি’র মনোনয়ন পেয়েছেন সানজিদা ইসলাম তুলি। তিনি আওয়ামী রেজিমে গুমের শিকার পরিবারগুলো নিয়ে রাজপথে ছিলেন।

তিনি গুমের শিকার বিএনপি নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমনের বোন। মায়ের ডাক সংগঠনের মাধ্যমে গুমের ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছে দেয়ার বড় ভূমিকা তার। আর জামায়াত জোটের প্রার্থী হয়েছেন ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম আরমান। তিনি নিজেই গুমের শিকার হয়ে দীর্ঘ ৮ বছর বন্দি ছিলেন ‘আয়নাঘরে’।

তিনি মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসি হওয়া জামায়াত নেতা মীর কাশেম আলীর পুত্র। তারা দু’জনই ভদ্র, মার্জিত ও শিক্ষিত। এ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে আলোচনায় এসেছেন দারুসসালাম থানা বিএনপি’র সাবেক ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক এসএ সিদ্দিক সাজু। তিনি সাবেক এমপি এসএ খালেকের পুত্র। তৃণমূল বিএনপি’র বড় একটি অংশ সাজুর পক্ষে মাঠে রয়েছেন। যে কারণে নির্বাচনে ত্রিমুখী লড়াইয়ের আভাস পাওয়া গেছে। 

এই আসনটি নিম্নআয়ের মানুষের আধিক্য, গ্রামাঞ্চল, নদীবেষ্টিত বিস্তৃর্ণ এলাকা। কোটি কোটি টাকার পরিবহন বাণিজ্য, খাদ্যপণ্য ব্যবসার হাব। বিশেষ করে গাবতলী নিয়ন্ত্রণ বড় চ্যালেঞ্জ। গাবতলীতে রয়েছে চাঁদাবাজি, দখল, মাদক, ছিনতাইয়ের বড় প্রভাব। 

সরজমিন দেখা যায়, মিরপুর-১ এলাকায় চায়ের দোকানে বসেছে বিভিন্ন বয়সের মানুষের নির্বাচনী আড্ডা। চা দোকানেই মিললো তিন প্রার্থীরই নাম। দোকানদার বললেন, প্রতিদিনই কেউ না কেউ আসছেন এলাকায়। তুলি, আরমান, সাজু ৩ জনই এসেছিলেন প্রচারণায়। নেতাকর্মীরা নিয়মিত আসছেন। ইসমাইল হোসেনের বাড়ি ঝালকাঠিতে হলেও তিনি ঢাকা-১৪ আসনের ভোটার। বলেন, আমরা বিএনপিতেই ভোট দেবো। আমরা চাই বিএনপি ক্ষমতায় আসুক। দলীয় সিদ্ধান্তেই আমরা খুশি। তার ভাষ্যমতে দেশের স্থিতিশীলতা আনতে বিএনপি তথা ধানের শীষের বিকল্প নাই।

আরমানের পক্ষে কথা বলেন মো. মিলন। তিনি বলেন, লোভহীন ও সৎ মানুষ দরকার এই এলাকায়। আরমান অর্থনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত এবং সৎ। তার দুর্নীতি বা চাঁদাবাজি করার প্রয়োজন নাই। তিনি ক্ষমতায় আসলে সুুসংগঠিত জামায়াতের কারণে অটোমেটিক শৃঙ্খলা আসবে।

এই চায়ের দোকানের ফিরোজ শেখ বলেন, সাজু ভাই- তার বাবার পরিচিত মুখ। তাদের কারণে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হয়। এই এলাকা নিয়ন্ত্রণ করতে ক্ষমতা লাগবে। তা না হলে দ্রুতই খারাপ হবে। এর জন্য সাজু ভাইয়ের মতো শক্তিশালী লোককে প্রয়োজন। তা না হলে মিরপুর কেন্দ্রিক ব্যবসা, কারখানায় বিশৃঙ্খলা শুরু হবে। আর পরিবহন সেক্টর পুরো মাফিয়াদের হাতে চলে যাবে।

এলাকায় বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে কথা বলে ধারণা করা যায়, ত্রিমুখী লড়াইয়ের। বিএনপি’র ভোট ভাগ হয়ে যাচ্ছে। দলটির নেতাকর্মীরা আওয়ামী আমলে দীর্ঘদিন সাজুর মাধ্যমে সুবিধা পেয়েছেন। বিএনপি’র এক নেতা বলেন, আমরা আছি বড় সমস্যায়। দলের কথার বাইরেও যেতে পারছি না। আবার সাজু ভাইয়ের বিপক্ষে গেলেও সমস্যা। তাই কিছুটা নীরব হয়ে আছি।

তবে জামায়াত কর্মীরা সুসংগঠিত। তারা নিয়মিত লিফলেট বিতরণ থেকে শুরু করে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। ৬০ ফিট এলাকায় একদল মহিলা ও দু’জন পুরুষ লিফলেট বিতরণ করছিলেন। বারেক মোল্লা এলাকায় লিফলেট বিতরণের সময় মিজানুর রহমান বলেন, আমরা কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত মেনেই কাজ করছি। তিনি (আরমান) জুলুমের শিকার হলেও শুধু সিমপ্যাথির ভোটের আশায় নেই। দলীয় ভোটের পাশাপাশি সাধারণের ভোট তিনি পাবেন। আমরা জনগণকে অপরাধহীন সমাজের কথা বেশি বলছি। কারণ জামায়াতের সঙ্গে অপরাধের সম্পর্কটা কম।

দলনিরপেক্ষ সাধারণ মানুষরা কথা রয়েছেন নীরবেই। ইলিয়াস আলী বলেন, এখনো সিদ্ধান্ত নেইনি- কাকে ভোট দেবো। তবে এই এলাকায় সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণ একটা বড় চ্যালেঞ্জ। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দেখবো কার প্রতিশ্রুতি বা কর্মকাণ্ড সন্তুষ্টি দেয়। শিক্ষার্থী মোনায়েম ইসলাম বলেন, আসনটি সিমপ্যাথি ভোটের মক টেস্ট। তবে বিএনপি বা জামায়াত প্রার্থীর একই ক্যাটাগরির হওয়ায় নির্বাচন হবে সমানে সমান। এদিকে পূর্বপরিচিত সাজুও নিশ্চিত থাকবেন রেসে।

তিনজনই জয়ের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করে আসছেন। বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সানজিদা ইসলাম তুলি বলেন, নারীদেরসহ সাধারণ মানুষের বেসিক নাগরিক অধিকারের বিষয়টি বেশি করে তুলে ধরার চেষ্টা করছি। যেখানেই যাচ্ছি মানুষের সাড়া পাচ্ছি। জামায়াত সমর্থিত প্রার্থী আরমান বলেন, আমরা সুুসংগঠিত মিরপুরের কথা বলছি। সকল শ্রেণির মানুষের জন্য আমরা কাজ করতে চাই। সৃষ্টি করতে চাই কর্মপরিবেশসহ নতুন কর্মসংস্থান। স্বতন্ত্র প্রার্থী সাজু বলেন, এই এলাকা জুড়ে আমার বেড়ে ওঠা, ব্যবসা, রাজনীতি। এলাকার লোকজন আমাকে সন্তানের মতো দেখে। আশা করি অতীত কাজ ও সক্ষমতা বিবেচনায় ভোট পাবো আমি। 

এখানে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. আবু ইউসুফ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির রিয়াজ উদ্দিন, গণফোরামের মো. জসিম উদ্দিন, লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মো. সোহেল রানা, এবি পার্টির মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি’র নুরুল আমিন, জাতীয় পার্টির মো. হেলাল উদ্দীন, বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির মো. লিটন এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির মো. ওসমান আলী।

ঢাকা-১৪ আসনের ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৫৬ হাজার ৪৪ জন। পুরুষ ২ লাখ ৩২ হাজার ৬৬, নারী ২ লাখ ২৩ হাজার ৭ ও হিজড়া ভোটার ৪ জন। তবে এই এলাকায় ভোটারের থেকে বাসিন্দা কয়েকগুণ বেশি।