দলের টালমাটাল পরিস্থিতিতেই ভোটযুদ্ধে নামছে জাতীয় পার্টি (জাপা)। তবে আওয়ামী দোসর তকমা, সিনিয়র নেতাদের দলত্যাগ, তৃণমূলের আস্থা হারানোয় দলটির শীর্ষ নেতাদের আত্মবিশ্বাস তলানিতে। মাঠে প্রচারণায় লোকবল সংকট, এজেন্ট দিতে না পারার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এসব কারণে শুরু থেকেই নির্বাচন বর্জনের আওয়াজ দিয়ে আসছিল দলটি। সর্বশেষ দলটির চেয়ারম্যান গণভোটে ‘না’ দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু নানা নেতিবাচক ইস্যুতে জর্জরিত দলটির নেতারা চেয়ারম্যানের ‘না’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নেয়াকে ভালোভাবে নিচ্ছেন না। তবে সাধ্যমতো মাঠে থাকা প্রার্থীরা বিএনপি-জামায়াতের বাইরের ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছেন।
পতিত আওয়ামী রেজিমের পুরোটা সময় দলটির ছায়ায় রাজনীতি করেছে জাপা। এই অবস্থায় এক পাক্ষিক মাঠেও ভোট টানতে পারেনি দলটি। ২০০৮ সালের জাপা ভোট পায় (কাস্ট ভোটের) ৭.০৪ শতাংশ, ৪৯ লাখ ২৬ হাজার ৩৬০টি। ২০১৪ সালে ৭ শতাংশ, ১১ লাখ ৯২ হাজার ৭২৭; ২০১৮ সালে ৫.৩৮ শতাংশ, ৪৪ লাখ ৪৩ হাজার ৩৫১ এবং ২০২৪ সালে মাত্র ৪.৩৩ শতাংশ, ২১ লাখ ৬৮ হাজার ২২১ ভোট। ভাঙন ও অবিশ্বাসপ্রবণ দলটির ভোট ধারাবাহিকভাবে কমছেই। ’২৪-এর নির্বাচনের পর থেকে শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক আলগা হয়েছে। আওয়ামী লীগ থেকে পাওয়া টাকার হিস্যা প্রকাশ্যে চেয়েছিলেন নেতাকর্মীরা। যদিও রংপুর অঞ্চলের চিত্র কিছুটা ভিন্ন।
পঞ্চগড়-২ আসন থেকে নির্বাচন করছেন লুৎফর রহমান লিটন। তিনি বলেন, আমাদের সাধ্যমতো প্রচারণা শুরু করেছি। মাইক দিয়েও প্রচারণা চলছে। শুক্রবার বড় সমাবেশ করেছি। এখন পর্যন্ত কোনো নেতিবাচক কিছু পাইনি। প্রশাসন আমাকে সহযোগিতা করছে। শান্তিপূর্ণভাবেই প্রচারণা এখন পর্যন্ত চালাতে পারছি। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, অনেক ভোটার আছে যারা বিএনপি-জামায়াতের বাইরে ভোট দিতে চায়- তারা আমার সম্বল। তাদের টার্গেট করে এগিয়ে যাচ্ছি। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে জয়ের বিষয়ে শতভাগ আশাবাদী।
মেহেরপুর-২’র লাঙ্গলের প্রার্থী মো. আব্দুল বাকী বলেন, গণসংযোগ করছি। সামনে এটা জোরদার করার চেষ্টা করবো। এখন পর্যন্ত নেতিবাচক কিছু ঘটেনি- কিন্তু সর্বোচ্চ জোরদারমূলক প্রচারণার সাহস পাচ্ছি না। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে ভালোসংখ্যক ভোট পাবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
আব্দুল লতিফ ফরাজি লড়ছেন বরগুনা-২ আসন থেকে। তিনি বলেন, প্রচারণার মধ্যেই আছি। চাপ নাই। ভোটারদের মধ্যে জাতীয় পার্টির জন্য আলাদা একটা ভালোলাগা দেখছি। যেটা আগে ছিল না। কিছু ভোটার আছেন যারা বিকল্প খুঁজছেন তারা বেশি সাড়া দিচ্ছেন। আমরা বিকল্প হিসেবে আশাবাদী ভালো কিছু হবে। ১৯৫টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে দলটি। ফেনী-১ আসন থেকে নির্বাচন করছেন মোতাহের হোসেন চৌধুরী। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত নির্বাচনের পরিস্থিতি স্বাভাবিক। তবে গুঞ্জন শুনছি প্রতিহতের। সার্বিক পরিস্থিতি ঘোলাটে মনে হচ্ছে। তবে আমরা তো কখনো চাঁদাবাজি বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলাম না। তাই আমাদের মানুষ বিবেচনা করতে পারে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের ভোটটাকে হাইলাইটস করা হচ্ছে বেশি। কিন্তু এবার প্রচুর মানুষ ভোট দেবেন। যার অধিকাংশ নির্দিষ্ট দলের না। এই ভোটগুলো গুরুত্বপূর্ণ।
পাবনা-২ আসন থেকে নির্বাচন করছেন মেহেদি হাসান রুবেল। তিনি বলেন, আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করছি, করবো। বড় দলের মতো আমাদের শক্তিমত্তা নয়। আমাদের ঘনিষ্ঠ যারা আছেন তারা কাজ করছেন। অনেক মানুষ ভোটের অপশন চান সেক্ষেত্রে আমরা বিকল্প অপশন হতে পারি।
রংপুর বিভাগ থেকে নির্বাচন করা এক প্রার্থী বলেন, এটা আমাদের জন্য কঠিন এক চ্যালেঞ্জ। জাপা মূলত নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য। আমাদের ওপর মহল থেকে ইশারা দেয়া হয়েছে, যেকোনো সময়ে ভোট বর্জনের ঘোষণা দিতে হতে পারে। তিনি উল্টো প্রশ্ন করেন, জিএম কাদের কেন এতদিন পর মিডিয়ার সামনে এসে গণভোটে ‘না’ ভোট দিতে বললেন? কার ইশারায় বললেন?
কেন নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা মূলত আমার পোর্টফোলিও ভারী হচ্ছে। রাজনীতি যেহেতু করি নির্বাচনে অংশ নিলে পরিচিতি বাড়ে। আর উত্তরাঞ্চলে লাঙ্গলের একটা ব্যাপার তো আছেই। অনেকেই আছেন যারা ধানের শীষ-দাঁড়িপাল্লার বাইরে যেতে চান। দেখা যাক কী হয়।
গত মঙ্গলবার জাপা’র বৈধ প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশের দিনে দীর্ঘদিন পর প্রকাশ্যে আসেন পার্টি চেয়ারম্যান জিএম কাদের। তিনি ‘না’ ভোট দেয়ার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নাই বলে অভিযোগ করেন। জিএম কাদের তার নির্বাচনী প্রচারণায় বলেন, দেশে একটি ভোট হচ্ছে। যেখানে জনগণ হ্যাঁ-তে ভোট দিতে পারবে কিংবা ‘না’-তে। এখন সরকারের কথামতো ভোট না দিলে তাদের লাথি মারা হবে। এটি কোনো নিরপেক্ষ ভোট হলো। গণভোটে যারা হ্যাঁতে ভোট দিবেন না, তাদের বলা হচ্ছে স্বৈরাচারের দোসর, আমি বলবো গণভোটে যারা হ্যাঁ ভোট দিতে বলেছে তারা নাৎসিবাদের দোসর।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ দল হিসেবে এখনো নিষিদ্ধ নয়। আওয়ামী লীগকে রাজনীতি করতে দেয়া হচ্ছে না ঠিক আছে, কিন্তু তাদের মানুষকে ভোট দিতে দিবেন না, নাগরিকত্বের অধিকার দিবেন না, এটি কখনো কোনো দেশে হয়নি।
সাধারণ নেতাকর্মীরা কি ভাবছেন? রংপুরের বাসিন্দা শাকিল আহমেদ বলেন, আওয়ামী লীগের যারা রাজনীতি করতো তারা অনেকে পলাতক। অনেকে নীরব কিংবা আঁতাত করে চলছেন। কিন্তু এই আওয়ামী লীগের সঙ্গে থেকে আমরা হাসির পাত্র হয়েছি। তিনি বলেন, জীবনের বড় ভুল ছিল জাপা’র কমিটিতে নাম লেখানো। এমনি কমিটি যে প্রায় ১০ বছর হতে চললো নতুন কমিটিও দেয় না। আমার পরিবার অতীত থেকে লাঙ্গলের ভোটার। এখন তারা লাঙ্গল বাদে কোন মার্কায় যাবে সেটা ভাবছে। আমিও।
মহাবিপদের মুখে পড়েছেন বিএনপি থেকে জাপায় নাম লেখানো গাইবান্ধার এক নেতা। তিনি বলেন, ২০২২ সালে আমি বিএনপি থেকে জাপাতে যোগ দেই। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ক্ষোভ তখন বাড়ছিল। বিএনপি’র রাজনীতি করার কারণে ভয়ে ছিলাম। তবে সাধারণ মানুষ সমীহ করতো। কিন্তু জাপায় আসায় মানুষ তখন থেকে হাসাহাসি করে।
তিনি বলেন, আমি মূলত আওয়ামী রোষানল থেকে বাঁচতে এই পন্থা নিয়েছিলাম। এটা আমার জীবনের সবথেকে বড় ভুল। তিনি দলটি সম্পর্কে নানা নেতিবাচক কথা শেষে বলেন, আমি প্রচারণায় তো যাবোই না। নিজেও লাঙ্গলে ভোট দেবো কিনা সন্দেহ আছে।