Image description
চট্টগ্রামে তারেক রহমান

বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, বিগত ১৫ বছর যেভাবে আপনাদের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক অধিকার ছিনিয়ে নেয়া হয়েছিল- সেরকম একটি ষড়যন্ত্র আবারো শুরু হয়েছে। আপনাদের প্রতি আমার আহ্বান এই ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সকলে সজাগ থাকবেন। যাতে আবার আপনাদের অধিকার কেউ ছিনিয়ে নিতে না পারে।

আপনাদের ভোটের অধিকার, আপনাদের কথা বলার অধিকার, আপনাদের বেঁচে থাকার অধিকার যাতে আবার কেউ ছিনিয়ে নিতে না পারে। ১২ তারিখের নির্বাচনের দিন আপনাদের কাছে আমার প্রত্যাশা। কখন যাবেন ভোট দিতে? এবার ফজরে গেলে হবে না।

এবার তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ার জন্য উঠতে হবে। তাহাজ্জুদ নামাজ পড়বেন এবং ভোটকেন্দ্রের সামনে গিয়ে ফজরের নামাজ জামাত করে আদায় করবেন। তারপরে লাইন দিয়ে ভোটের জন্য দাঁড়িয়ে যাবেন। কোনোভাবে কেউ যেন আপনাদের ভোটের অধিকার কেড়ে নিতে না পারে সেই ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি রাখবেন। 

রোববার দুপুরে চট্টগ্রাম নগরীর পলোগ্রাউন্ড ময়দানে বিএনপি’র নির্বাচনী সমাবেশ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান। পলোগ্রাউন্ডসহ আশপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে উপস্থিত বিপুলসংখ্যক মানুষকে তিনি চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় ‘অনরা ক্যান আছেন?’ (আপনি কেমন আছেন) বলে বক্তব্য শুরু করেন।

বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলে দুর্নীতিবাজ ও অপরাধীদের কঠোর হস্তে দমনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারেক রহমান বলেন, দেশকে নিয়ে আমরা যতই পরিকল্পনা করি না কেন, সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হলে আমাদের দুটো বিষয়ে নজর দিতে হবে। অতীতে বিএনপি যতবার সরকার পরিচালনা করেছে, বিএনপি প্রমাণ করে দেখিয়েছে, একমাত্র বিএনপিই এই দুটো কাজ সফলভাবে করতে পারে। কি সেই বিষয় দুটো? মানুষের নিরাপত্তা, যাতে করে মানুষ নিরাপদে চলাফেরা করতে পারে, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি-বাকরি সব করতে পারে। বিগত সময় যখন বিএনপি ক্ষমতায় ছিল, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া যখন দেশ পরিচালনা করেছিলেন, তখন আপনারা দেখেছিলেন, যে-ই হোক না কেন, এমনকি আমাদের দলের অনেক লোক, যারা কোনো অনৈতিক কাজে জড়িত হলে তাদেরও কোনো ছাড় দেয়া হয়নি।

তারেক রহমান বলেন, বিএনপি যেই প্রতিশ্রুতিগুলো দিয়েছে সেগুলো সরকারে গেলে ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করবো। কিন্তু তার আগে আপনাদের একটি দায়িত্ব আছে। যেই উদ্যোগগুলো আমরা গ্রহণ করেছি বা যেই পরিকল্পনাগুলো আপনাদের সামনে আমরা তুলে ধরেছি এই পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করতে হলে অবশ্যই বিএনপিকে সরকার গঠন করতে হবে।

আপনারা যদি বিএনপি’র পাশে থাকেন, বিএনপিকে সমর্থন দেন আর ১২ তারিখের নির্বাচনে ধানের শীষকে জয়যুক্ত করেন তাহলেই আমরা এই পরিবর্তনগুলো করতে পারবো। এই পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করতে হলে অবশ্যই আমাদের দুটো বিষয় খুব কড়াকড়িভাবে নজর দিতে হবে। কি সেই বিষয় দুটো? সেই বিষয় দুটো হচ্ছে এক মানুষের নিরাপত্তা। যাতে করে মানুষ নিরাপদে চলাফেরা করতে পারে। ব্যবসা বাণিজ্য চাকরি-বাকরি সব করতে পারে।

বিগত সময় যখন বিএনপি ক্ষমতায় ছিল দেশনেত্রী খালেদা জিয়া যখন দেশ পরিচালনা করেছেন আপনারা দেখেছেন যেই হোক না কেন এমনকি আমাদের দলের অনেক লোক যারা কোনো অনৈতিক কাজে নিজেকে জড়িত করেছে- আমরা তাদেরকেও ছাড় দেইনি। আজ এই দেশের জনগণ যদি বিএনপি’র পাশে থাকে ইনশাআল্লাহ আগামী দিন আমরা একইভাবে কঠোর হস্তে দেশের আইনশৃঙ্খলাকে নিয়ন্ত্রণ করবো। 

অপরাধীর কোনো দল নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলাই হোক আইন সবার জন্য সমান। অপরাধীর পরিচয় কোনো দল দিয়ে নয়। অপরাধীর পরিচয় সে আইনের দৃষ্টিতে অপরাধী এবং অপরাধী যেই হোক তার বিরুদ্ধে দেশের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা হবে। কাজেই দুর্নীতি যেই করুক, যারাই করুক তাদের বিরুদ্ধে দেশের আইন একইভাবে প্রযোজ্য হবে। কাজেই পরিষ্কারভাবে আজকে আমি আপনাদেরসহ এখানে হাজার-লাখ মানুষের সামনে পরিষ্কারভাবে বলে দিতে চাই আমরা যেসব পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি সেইসব পরিকল্পনার মধ্যে কেউ যদি আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গ করে বা দুর্নীতির মাধ্যমে সেগুলোকে বাধাগ্রস্ত করেন তাদের কোনো ছাড় আমরা দেবো না। 

বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, আজ সময় এসেছে পরিবর্তনের। এই পরিবর্তনকে যদি সত্যিকারভাবে মিনিংফুল পরিবর্তন করতে হয়, দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করতে হয়- তাহলে আমাদের সকলকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। আপনাদের সকলকে সতর্ক করে সজাগ দৃষ্টি রাখার জন্য অনুরোধ করবো। বিগত ১৫ ও ১৬ বছর আপনারা বহু নতুন ভোটার আছেন যারা জীবনে কোনোদিন ভোট দিতে পারেনি। পেরেছিলেন আপনারা? আপনাদের ভোটের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রাখা হয়েছিল। 

চট্টগ্রামের বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, এই সেই চট্টগ্রাম, যেই চট্টগ্রামে মুক্তিযুদ্ধের সময়, গণতন্ত্রের অধিকার আন্দোলনের সময় বা ২০২৪-এর আন্দোলনের সময়ে ওয়াসিন আকরামসহ আরও মানুষ এখানে শহীদ হয়েছেন। চট্টগ্রামে সমতল এবং পাহাড়ের মানুষ একসঙ্গে বসবাস করেন। আন্দোলনের সময় আমরা দেখিনি কে সমতলের মানুষ আর কে পাহাড়ের। আমরা চাই সকলকে নিয়ে আমাদের সেই প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে।

ক্ষমতায় গেলে চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারেক রহমান বলেন, এই অঞ্চলের মানুষের একটি বড় দাবি আছে। বিএনপি এর উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু তা সম্পূর্ণ করা যায়নি। এই উদ্যোগে সমগ্র চট্টগ্রামসহ বহু মানুষের কর্মসংস্থান হবে, ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙ্গা হবে। কী সেটি, বাণিজ্যিক রাজধানী। ইনশাআল্লাহ, বিএনপি সরকার গঠনে সক্ষম হলে খালেদা জিয়ার সেই উদ্যোগ আগামী বিএনপি সরকার বাস্তবায়ন করবে। প্রতিদ্বন্দ্বীদের নিয়ে সমালোচনায় অনাগ্রহ জানিয়ে তিনি বলেন, আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী দল যারাই হোক না কেন, তাদের সম্পর্কে অনেক কথাই বলতে পারি, দোষত্রুটি তুলে ধরতে পারি; তাতে কি জনগণের কোনো উপকার হবে? সমালোচনায় দেশের মানুষের পেট ভরবে না। বিএনপিই একমাত্র দল যারা ক্ষমতায় থেকে দেশের মানুষের ভাগ্যের উন্নয়নে কাজ করেছে।

তিনি বলেন, আমি দেশে ফিরেই বলেছিলাম, উই হ্যাভ আ প্ল্যান। অর্থাৎ, আমাদের একটি পরিকল্পনা আছে দেশকে নিয়ে, দেশের মানুষেকে নিয়ে। কোটি কোটি যুবসমাজ কর্মসংস্থান চায়। আপনাদের রায়ে ১২ তারিখের ভোটে সরকার গঠনে সক্ষম হলে প্রাইমারিসহ শিক্ষার সব স্তরে পরিবর্তন আনতে চাই। ভোরের আলো ফোটার পরপরই পলোগ্রাউন্ড ময়দানে বিএনপি নেতাকর্মীদের আনাগোনা শুরু হয়ে যায়। শীতের সকালের ঠান্ডা উপেক্ষা করে কিশোর থেকে বৃদ্ধ, নানা বয়সী মানুষ আসতে থাকেন সেই ময়দানে। সকাল ৯টার মধ্যেই মাঠের বিশাল অংশ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। সকাল গড়াতেই সমাবেশস্থল ছাপিয়ে আশপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকায় লাখো মানুষের সমাগম ঘটে। সকাল ১০টার দিকে মঞ্চে আনুষ্ঠানিকভাবে সমাবেশ শুরু হয়। স্থানীয় নেতাদের বক্তব্য চলে পালাক্রমে। চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপি’র আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহর সভাপতিত্বে সমাবেশে বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও সালাহউদ্দিন আহমেদসহ কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা এবং ধানের শীষের মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থীরা বক্তব্য দেন।

এর আগে, দুপুর ১২টা ২৫ মিনিটের দিকে তারেক রহমান সমাবেশ মঞ্চে পৌঁছান। এ সময় উপস্থিত লাখো নেতাকর্মী তুমুল করতালি ও স্লোগান দিয়ে তাকে বরণ করে নেন। সমাবেশে যোগ দেয়ার আগে হোটেল রেডিসনে তরুণদের সঙ্গে একটি মতবিনিময় সভায় অংশ নেন। এসব কর্মসূচিতে যোগ দিতে শনিবার রাতে চট্টগ্রামে পৌঁছান তারেক রহমান। পলোগ্রাউন্ডের সমাবেশ শেষ করে তিনি ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছেন। পথে ফেনী, কুমিল্লা ও নারায়ণগঞ্জে আরও মোট ৫টি সমাবেশে যোগ দেবেন। তারেক রহমান সর্বশেষ চট্টগ্রামে এসেছিলেন ২০০৫ সালে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচনী প্রচারণায় এসে তিনি নগরীর লালদীঘি ময়দানে জনসভা করেছিলেন। এরপর এক-এগারো পরবর্তী জরুরি অবস্থায় তিনি গ্রেপ্তার হয়ে কারাবরণ করেন এবং একপর্যায়ে দেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য হন। দেড় দশক পর দেশে ফিরে তিনি পিতা জিয়াউর রহমানের শাহাদতবরণের স্মৃতিবিজড়িত চট্টগ্রাম শহরে আসেন।