দুই ভাই ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সমন্বয়ে ওরিয়েন্টাল ব্যাংকের ৬০০ কোটি টাকার লুট করার দায় স্বীকার করেছেন ওরিয়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান ওবায়দুল করিম। তিনি ব্যাংকটির চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায় একাই ৩০৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা সরিয়েছেন। এরপর প্রাতিষ্ঠানিক মারপ্যাচের মধ্য দিয়ে সরিয়েছেন আরো ৭২ কোটি ১৩ লাখ টাকা। বাকি টাকা সরানোর জন্য তিনি তার ভাই এবাদুল করিম ও তৎকালীন সময়ের ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কায়েস সামিসহ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে ব্যবহার করেছেন।
২০০৭ সালে ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে দুর্নীতিবিরোধী টাস্কফোর্সের অভিযান চলাকালে গ্রেফতার এড়াতে আত্মগোপনে ছিলেন ওবায়দুল করিম। এ সময় একটি বিশেষ সংস্থার কাছে লিখিতভাবে দেওয়া স্বীকারোক্তিতে ওই সব টাকা পরিশোধ করতে যৌক্তিক সময় চান। অন্তত ৩৬ পৃষ্ঠার ওই আবেদনে পরোক্ষভাবে ৬০০ কোটি টাকা লোপাটের দায় নিয়ে তিনি বলেছিলেন, “আপনাদের সহযোগিতা পেলে এবং ওরিয়ন গ্রুপ ভবিষ্যতে এ ব্যাংকের মালিক হলে ‘থার্ড পার্টি গ্যারান্টার’ হিসেবে সব টাকা রিকভারির দায়িত্ব নেবে, যা আমি ব্যক্তিগত গ্যারান্টি হিসেবে মেনে নেব।”
আদালতের সঙ্গে প্রতারণা ও জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে গত জুলাইয়ে বিদেশ পাড়ি জমানোর পর আর দেশে ফিরেননি ওবায়দুল করিম। যদিও তিনি আদালতকে লিখিত প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এক মাসের মধ্যে দেশে ফিরবেন। ওবায়দুল করিম বর্তমানে বিদেশে পলাতক রয়েছেন। সাবেক ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবার ঘনিষ্ঠ ১০ শিল্প গ্রুপের দুর্র্নীতি, অর্থ লুট ও অর্থ পাচারের তদন্তে চলছে টাস্কফোর্সের। যারমধ্যে অন্যতম হলো ওরিয়ন গ্রুপ।
ওবায়দুল করিম বাংলাদেশে প্রথম আলোচিত ব্যাংক লুটের প্রধান হোতা। ২০০৭ সালে এই ব্যাংক লুটের ঘটনা ধরা পড়ার পর ব্যাপক তোলপাড়ের সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে এই আইসিবি ইসলামী ব্যাংক নামে পরিবর্তিত হয়। কিন্তু ওবায়দুল করিম ও তার সহযোগীদের ব্যাংক লুটের কারণে সাধারণ মানুষ যতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তা আর পূরণ করা সম্ভব হয়নি। শত শত কোটি টাকা ব্যাংক লুট’র কথা লিখিতভাবে স্বীকার করে নেওয়ার পরও দীর্ঘ বিশ বছরেও তাকে জেলে যেতে হয়নি। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে আওয়ামী লীগ নেতাদের ব্যবসায় অংশীদার বানিয়ে আরও ব্যাপকহারে লুটপাট চালান তিনি। এমনকি এই অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও থেকে গেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
বিশেষ সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে লিখিত স্বীকৃতির দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় ওবায়দুল করিম বলেছেন, ‘১১ জানুয়ারি ২০০৭ তারিখে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বর্তমান সরকারের নিকট আমি শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যাংকের ওই জটিল সমস্যাটি সমাধানের জন্য আপনার মাধ্যমে আকুল আবেদন জানাই। আমি বিশ্বাস করি, যেকোনো জাতীয় দুঃসময়ে আপনাদের পক্ষেই সম্ভব এই সমস্যার একটি ন্যায়ভিত্তিক ও প্রকৃত সমাধান। যদিও সরকার আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সমস্যা সমাধানে দিনরাত্রি অত্যন্ত পরিশ্রম করছেন। তথাপি দেশের জনগুরুত্বপূর্ণ আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ওরিয়েন্টাল ব্যাংকের সমস্যার সমাধান জরুরি। এ ব্যাপারে আপনাদের সরাসরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলে আমি মনে করি।’
চতুর্থ পৃষ্ঠায় তিনি বলেন, ‘২০০৬ সালের ৬ জুন বাংলাদেশ ব্যাংকের অডিট রিপোর্টে বেনামি অ্যাকাউন্ট থেকে আমার নামে সুদ-আসলসহ ৯২ কোটি টাকার (আসল ৬৪ কোটি টাকা) দায় দেখানো হয়। এ দায় আমার না হলেও আমি এর দায়িত্ব নিলাম। আমি আসলে এ দায়িত্ব নিয়েছি কয়েস সামির কাছে অবৈধভাবে রাখা ২০ কোটি টাকার শেয়ারের বিনিময়ে। আমি ভেবেছিলাম যেহেতু আমরা দেশের বেসরকারি খাতের সর্ববৃহৎ বিদ্যুৎকেন্দ্র ও ফ্লাইওভার নিজ অর্থায়নে বাস্তবায়ন করছি। এতে শেয়ার মার্কেটে প্রভাব পড়বে, ফলে ওরিয়ন গ্রুপের সব শেয়ারের মূল্য বাড়বে, ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি বাড়বে এবং আমি এই ৬৪ কোটি টাকার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারব।’
সপ্তম পৃষ্ঠায় বলেন, ‘ওরিয়েন্টাল ব্যাংকের প্রিন্সিপাল শাখায় ৫১ কোটি ২৭ লাখ টাকার দায় দেখানো হয়েছে, যা আমরা ব্যাংকের মালিকানায় আসার আগে। এ ছাড়া ব্যাংকের পরিচালক এবাদুল করিমের দায় রয়েছে ২৮ কোটি ২১ লাখ টাকা। এ দায় কোনোক্রমেই আমার নয়। এবাদুল করিম এই দায় পরিশোধ করতে প্রস্তুত আছেন। অষ্টম পৃষ্ঠায় একটি ছকে ব্যাংকটির প্রিন্সিপাল শাখায় ১১টি প্রতিষ্ঠানের নামে ৫৬ কোটি টাকার দায় দেখানো হয়েছে। এসবের মধ্যে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক কয়েস সামি ২৮ কোটি টাকা বিতরণ করেন। ওরিয়ন গ্রুপ ব্যাংকের মালিক হলে ভবিষ্যতে থার্ড পার্টি গ্যারান্টার হিসেবে এই টাকা রিকভারির দায়িত্ব নেবে।’
দশম পৃষ্ঠায় ওবায়দুল করিম বলেন, ‘ব্যাংকের প্রিন্সিপাল শাখার নন-ফান্ডেড ৬ কোটি ৭০ লাখ টাকার দায় অবশ্যই আমার। ইতোমধ্যে ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করে গ্যারান্টির বিপরীতে মার্জিন বাবদ টাকা জমা দেওয়া হচ্ছে।’
এভাবে ব্যাংকটির ৬০০ কোটি টাকা লুটপাটের মধ্যে ৩০৪ কোটি টাকার দায় ওবায়দুল করিম সরাসরি স্বীকার করেন এবং বাকি টাকার দায় পরোক্ষভাবে স্বীকার করেন। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকের অন্য কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার কথাও উল্লেখ করেন।
এদিকে ব্যাংকের প্রিন্সিপাল শাখার নন-ফান্ডেড ৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা আত্মসাতের দায়ে ওবায়দুল করিমের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে। এই সাজা থেকে বাঁচতে নানা রকম কূটকৌশলের আশ্রয় নিচ্ছেন বলে জানা গেছে।
উল্লেখ্য, ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন এই অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মালিক ওবায়দুল করিম এবং তার পরিবারের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়। দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তার বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি করে আদালত। কিন্তু আদালতের এই নিষেধাজ্ঞাকে ফাঁকি দিয়েছেন তিনি প্রতারণা ও জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে। সরকারের প্রচলিত আইন বা বিধি-বিধান অনুযায়ী যে আদালত নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার বা শিথিল করার ক্ষমতা একমাত্র ওই আদালতেরই রয়েছে। দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ফেব্রুয়ারিতে ওবায়দুল করিম এবং তার পরিবারের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত। কিন্তু তিনি পরবর্তীতে গত ৩০ জুলাই রাতে বিদেশ পাড়ি দিয়েছেন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি নিয়ে, যদিও এটি সম্পূর্ণ অবৈধ। নিয়ম অনুযায়ী মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এ বিষয়ে তাকে অনুমতি দিতে পারেন না, ওবায়দুল করিমও সেই আদালতে অনুমতি প্রার্থনা করতে পারেন না।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলকে মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে ম্যানেজ করে ওবায়দুল করিম এভাবে অবৈধ প্রক্রিয়ায় বিদেশ পাড়ি জমানোর সুযোগ তৈরি করেছেন। নিয়ম অনুযায়ী তিনি বিমান বন্দরের ইমিগ্রেশন পার হতে পারতেন না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ই তাকে সরাসরি এ বিষয়ে সহযোগিতা করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে।
শীর্ষনিউজ