Image description
নির্বাচনি সমাবেশে শীর্ষ নেতারা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে শুরু হলো আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা। প্রথম দিন বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই নির্বাচনি প্রচারে মাঠে নেমেছে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা, প্রার্থী ও সমর্থকরা। উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটারদের কাছে নানা ভাষায় ভোট চাইছেন তারা। পাশাপাশি দিচ্ছেন উন্নয়ন ও পরিবর্তনের নানা প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি।

কেউ বলছেন, ক্ষমতায় গেলে দেশের মানুষকে স্বাবলম্বী করা হবে। নানা কর্মসূচির মাধ্যমে সমাধান করা হবে বেকার সমস্যা। কেউবা দিচ্ছেন চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, দুঃশাসনমুক্ত ইনসাফের বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি। একই সঙ্গে প্রতিপক্ষ দল ও প্রার্থীদের সমালোচনা এবং ঘায়েল করার সরগরম বক্তব্যও ছিল বেশ। তবে রাজনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, ভোটের আগে শুধু প্রতিশ্রুতি দিলেই হবে না। প্রতিশ্রুতি কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে বা কতদিনে বাস্তবায়ন করা হবে, সেগুলোও বিস্তারিত বলতে হবে। এছাড়া কেউ আকাশকুসুম প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় গিয়ে তা বাস্তবায়ন করতে না পারলে ভবিষ্যতে বিপদে পড়তে হবে বলেও মনে করেন তারা।

জানতে চাইলে বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, অতীতেও এভাবেই নির্বাচনের আগে ইশতেহার এবং এ ধরনের নির্বাচনি সমাবেশে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে রাতারাতি বেরিয়ে আসা তো আসলে সহজ নয়। তবে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির বিষয়ে সবাইকে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু প্রতিশ্রুতি দিলেই হবে না, সেটা কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, কতদিনে বাস্তবায়ন করা হবে, সেগুলোও বিস্তারিত বলতে হবে। এছাড়া যারা ক্ষমতায় যাবে, তাদের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বিরোধী দলসহ অন্যরা মিলে চাপে রাখতে পারে বলেও মন্তব্য করেন অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী।

রাজনীতি বিশ্লেষক ডা. জাহেদ উর রহমান যুগান্তরকে বলেন, এখনই প্রতিটি দলকে বলতে হবে, আপনারা যা যা বলছেন, এগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব কি না? আপনি যে প্রতিশ্রুতিগুলো দিচ্ছেন, সেগুলো কীভাবে বাস্তবায়ন করবেন? এ প্রশ্নগুলো এখনই করতে হবে। তিনি আরও বলেন, দেশে যদি নির্বাচনি ব্যবস্থা টিকে থাকে, তাহলে শুধু প্রতিশ্রুতি দিয়েই কেউ পার পাবে না। এগুলোর জন্য তারা চাপে পড়বেন, বিপদে পড়বেন। সেজন্যই বলছি, তাদের এখনই সতর্ক হওয়া দরকার। সতর্ক না হয়ে কেউ যদি আকাশকুসুম প্রতিশ্রুতি দেয়, এবং সেটা বাস্তবায়ন না করতে পারে, তাহলে সেটাই তার জন্য ডিজাস্টার বয়ে আনবে।

তারেক রহমান : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে হজরত শাহজালাল (রহ.) ও শাহপরান (রহ.)-এর পুণ্যভূমি সিলেট থেকে বিএনপির নির্বাচনি প্রচারণা শুরু করেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এদিন আলিয়া মাদ্রাসা মাঠের জনসভায় তারেক রহমান বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ধানের শীষকে বিজয়ী করলে দেশের মানুষকে স্বাবলম্বী করা হবে। নতুন করে খাল খনন, কৃষকদের কার্ড প্রদান, নারীদের ফ্যামিলি কার্ডের মতো বিশেষ সহায়তা প্রদানসহ নানা কর্মসূচির মাধ্যমে বেকার সমস্যা সমাধান করে দেশের সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি। নির্বাচনি জনসভায় একটি দলের সমালোচনা করে তারেক রহমান বলেন, যারা বেহেশতের টিকিট দেওয়ার কথা বলে ভোট চাইছে, তারা নিজেরা শিরক করছেন, ভোটারদেরও ঠকাচ্ছেন। এসব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে তিনি বলেন, দলটি সম্পর্কে নতুন করে জানার কিছু নেই। কারণ মুক্তিযুদ্ধের সময়ই তাদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে দেশের মানুষ জানে।

ডা. শফিকুর রহমান : বৃহস্পতিবার রাজধানীর মিরপুর আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে নির্বাচনি জনসভার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। এ সময় চাঁদাবাজি, দুর্নীতি ও দুঃশাসনমুক্ত ইনসাফের বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। শফিকুর রহমান বলেন, আমরা তরুণদের নৈতিক শিক্ষা দেব। দক্ষতা বৃদ্ধির শিক্ষা দেব। সার্টিফিকেটসর্বস্ব শিক্ষা নয়, আমরা যুবসমাজকে দেশগড়ার কারিগর হিসাবে গড়ে তুলতে চাই। আমরা এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে নারী তাদের যোগ্য সম্মান ও মর্যাদা পাবেন। কর্মক্ষেত্রে তারা থাকবেন নিরাপদ। মায়েদের অসম্মান আমরা বরদাশত করব না। এ সময় বিগত বছরগুলোর মতো নতুন কোনো ভোট ডাকাত জনগণ দেখতে চায় না বলেও মন্তব্য করেন জামায়াত আমির।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর : সিলেটে আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্বাচনি জনসভায় বক্তৃতা দেওয়ার সময় দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, তারেক রহমান আমাদের যেভাবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, সেই নেতৃত্বের অগ্রযাত্রায় সামনে এগিয়ে গিয়ে তাকে প্রধানমন্ত্রী করে আমরা সত্যিকার অর্থেই বাংলাদেশকে একটি গণতান্ত্রিক, সুখী ও সমৃদ্ধ দেশ হিসাবে গড়ে তুলব।

মিয়া গোলাম পরওয়ার : খুলনা-৫ আসনের (ডুমুরিয়া-ফুলতলা) প্রার্থী এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক সংসদ-সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার বৃহস্পতিবার ডুমুরিয়ার ১নং ধামালিয়া ইউনিয়নে নির্বাচনি প্রচারণা শুরু করেন। প্রচারণা শেষে পথসভায় তিনি বলেন, দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের পক্ষে অভূতপূর্ব জনসমর্থন ও গণজাগরণ সৃষ্টি হয়েছে। এ সময় দুর্নীতিমুক্ত সমাজ, সামাজিক ন্যায়বিচার, বৈষম্যহীন রাষ্ট্রব্যবস্থা, স্থিতিশীল রাজনীতি এবং ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পকারখানার জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।

নাহিদ ইসলাম : শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও খাজা নাজিমুদ্দিন এবং জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদির কবর জিয়ারতের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক নির্বাচনি প্রচারণা শুরু করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। পরে ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ শীর্ষক পদযাত্রার শুরুতে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ১০ দলীয় নির্বাচনি ঐক্যকে বিজয়ী করতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানান। এ সময় তিনি বলেন, সংসদে এনসিপি এবং ১০ দলীয় ঐক্য সাধারণ মানুষের কথা বলবে। গণ-অভ্যুত্থান, সংস্কার ও সার্বভৌমত্বের কথা বলবে। এদিন বিকালে মিরপুরে জামায়াতের জনসভায় অংশ নিয়ে নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, দাঁড়িপাল্লা, শাপলা কলিসহ ১০ দলীয় জোটের প্রার্থীদের বিজয়ী করে জুলাই বিপ্লবের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করতে হবে। বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য এই জোটের প্রার্থীদের ক্ষমতায় পাঠাতে হবে। ফ্যামেলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের তীব্র সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, এটা সুস্পষ্ট প্রতারণা।

মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম : ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমির শায়েখে চরমোনাই মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম বৃহস্পতিবার বরিশাল সদর রোডে নেতাকর্মীদের নিয়ে নির্বাচনি প্রচারণা শুরু করেন। তিনি বরিশাল-৫ (সদর) এবং বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ) আসনে হাতপাখা প্রতীকে নির্বাচনে লড়ছেন। গণসংযোগকালে সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম ভোটারদের উদ্দেশে বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করতে পারলে কুরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে দেশ পরিচালনা করবে চরমোনাই পীরের রাজনৈতিক দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। তিনি আরও বলেন, আমরা কুরআন সুন্নাহর ভিত্তিতে একটা শান্তিময় বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে কাজ করব। যেখানে সব ধর্মবর্ণভেদে ধনী-গরিব সবার সমান অধিকার থাকবে।

মজিবুর রহমান মঞ্জু : বৃহস্পতিবার ফেনী কেন্দ্রীয় বড় জামে মসজিদ থেকে আনুষ্ঠানিক নির্বাচনি প্রচারণা শুরু করেন ফেনী-২ (সদর) আসনে ‘১০-দলীয় নির্বাচনি ঐক্যের’ প্রার্থী ও আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মজিবুর রহমান মঞ্জু। তিনি বলেন, নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড এখনো নিশ্চিত হয়নি। আমরা এ কথা বারবার বলছি। তিনি আরও বলেন, আমাদের নেতাকর্মীদের নিয়মিত হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে শুনছি। প্রশাসন আমাদের আশ্বস্ত করেছে, বড় দল, ছোট দল, মাঝারি দল এ ধরনের কোনো বিভেদ তারা করবে না। প্রতিটি দলের প্রার্থী, কর্মী ও ভোটারদের তারা সমান নিশ্চয়তা দেবে। সুতরাং আমরা চাই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে হবে। না হলে নির্বাচনের ব্যাপারে আমরা ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হব।

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে নির্বাচনি প্রচার শুরু করে বামপন্থি ৯টি দলের জোট গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট। এ সময় বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, আমরা শুধু ভোট চাইতে আসিনি, বরং দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের লক্ষ্যে বামপন্থি, প্রগতিশীল ও উদার গণতান্ত্রিক শক্তির সমন্বয়ে সরকার প্রতিষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ কর্মসূচি নিয়ে জনগণের সামনে হাজির হয়েছি।