ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর যে দলই জিতুক দেশ পরিচালনার ক্ষেত্র কারও জন্যই সহজ হবে না। বিশেষ করে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নির্বাচিত সরকারকে অনেক বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। কেননা অন্তর্বর্তী সরকার চলমান আর্থিক খাতের সংস্কার কার্যক্রম শেষ না করেই বিদায় নিতে যাচ্ছে। অসমাপ্ত কাজগুলো শেষ করতে হবে নির্বাচিত সরকারকে। আবার এসব আর্থিক খাতের চলমান সংস্কার মাঝপথে থেমে গেলে আরও বেশি সংকট তৈরি করবে সামষ্টিক অর্থনীতিতে।
একই সঙ্গে ভোটের পরই শুরু হবে রমজান মাস। আসবে ঈদুল ফিতর। সেটাও একটা অতিরিক্ত চাপ। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও নির্বাচন ঘিরে ব্যবসাবাণিজ্যে চরম মন্দা বিরাজ করছে। ফলে সরকারের রাজস্ব আদায়ের পরিস্থিতি খুবই নাজুক অবস্থায় রয়েছে। একইভাবে আয়-রোজগার না বাড়লে আরও চাপে পড়বে সাধারণ মানুষ। নতুন করে আসেনি কোনো বিনিয়োগ। বাড়েনি কর্মসংস্থান।
গত ১৪ মাসে বন্ধ হয়েছে অনেক কারখানা। বেকার হয়েছেন লাখো মানুষ। বিদেশগামীর সংখ্যাও কমেছে। আবার বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপও বেড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের চ্যালেঞ্জ। সবমিলিয়ে নতুন সরকারের ঘাড়ে যে আর্থিক চাপ এখনকার চেয়ে আরও বাড়বে এতে কোনো সন্দেহ নেই।
এদিকে সরকারি চাকুরেদের জন্য নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন করতে অতিরিক্ত প্রয়োজন হবে ৮০ হাজার কোটি টাকা। শুধু তাই নয় এই পে স্কেল পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে প্রয়োজন হবে ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। এতে করে সরকারের ওপর আর্থিক চাপ বাড়লেও সরকারি চাকরিজীবীদের বাড়বে ক্রয় ক্ষমতা। যার প্রভাব পড়বে নিত্যপণ্যসহ সব ধরনের বাজারে। এর চূড়ান্ত ফলাফল হিসেবে দেখা দিতে পারে আরও উচ্চ মূল্যস্ফীতি। এমনিতেই দেশে টাকা কয়েক বছর ধরে মূল্যস্ফীতির চাপ দুই অঙ্কের কাছাকাছি। এদিকে অর্থবছরের অর্ধেক সময়ে বড় ঘাটতির মুখে পড়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব আদায় কমেছে প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা। এ ঘাটতি বছর শেষে লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে ডুবন্ত ব্যাংক খাতে গ্রাহকদের আস্থা ফেরানো সম্ভব হয়নি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও। বরং খেলাপি ঋণ বেড়েছে রেকর্ড পরিমাণ। কৃষি খাতে উৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থায় মোটামুটি ভারসাম্য থাকলেও শিল্প খাতের অবস্থা খুবই নাজুক। নতুন কোনো বিনিয়োগও নেই। বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ প্রতিনিয়তই বাড়ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে এখন থেকে মাত্র ২০ বা ২২ দিন পরই দায়িত্ব নেবে নতুন সরকার। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় ও তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে রমজানের বাজার নিয়ন্ত্রণ। তবে এই রমজান বাজার কেবল একটি মৌসুমি চাপ নয়- এটি মূলত উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল সরবরাহ ব্যবস্থা, কম বিনিয়োগ, রাজস্ব ঘাটতি, ব্যাংক খাতের ঝুঁকি এবং বাড়তে থাকা সরকারি ব্যয়ের একটি অতিরিক্ত চাপ। বহুমাত্রিক এসব সংকট একসঙ্গে মোকাবিলা করতে গিয়ে নতুন সরকারকে একদিকে কঠিন আর্থিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে, অপরদিকে রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপও সামলাতে হবে। ভোটে জয়ী হয়ে যে দলই সরকার গঠন করুক না কেন সেই সরকারের কাছে জনপ্রত্যাশা থাকবে আকাশচুম্বী। ফলে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সরকারকে দেশ পুনর্গঠনের কাজ করতে হবে। এ ছাড়া নির্বাচনের পর কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নিশ্চয়ই ঘরে বসে থাকবে না। দলটি তাদের হারানো ঐতিহ্য ফিরে পেতে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু করলে আবার অশান্ত হয়ে উঠতে পারে রাজনৈতিক পরিবেশ। এতে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর আগেই আবারও প্রচণ্ড চাপের মুখে পড়তে পারে বলে মনে করে বিশ্বব্যাংক ঢাকার সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন।
জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সরকারি পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জনপ্রশাসনে সাধারণ ও ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি, বিভিন্ন ভাতা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং একাধিক কমিটি ও উদ্যোগের ফলে ব্যয়ের চাপ বাড়ছে। একই সঙ্গে ইতোমধ্যেই নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের চাপ শুরু হয়ে গেছে যা ভবিষ্যতে ব্যয় আরও বাড়াতে পারে। উন্নয়ন ব্যয়েও দেখা দিয়েছে চরম স্থবিরতা।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন হয়েছে বরাদ্দের মাত্র ৬৭ দশমিক ৮৫ শতাংশ যা দেড় দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ১১ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এর প্রভাব পড়েছে কর্মসংস্থান, অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে। জুলাই আন্দোলনের পর বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলোও চালু করা সম্ভব হয়নি। এতে নতুন করে বেকার হয়েছেন অসংখ্য মানুষ। অন্যদিকে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) বলছে, পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বিনিয়োগ পুনরুদ্ধার ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ।
সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বিনিয়োগ না বাড়লে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না, মানুষের প্রকৃত আয় বাড়বে না এবং বৈষম্য আরও গভীর হবে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, অবকাঠামোগত দুর্বলতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, কর ব্যবস্থার চাপ, উচ্চ সুদহার, চুক্তি বাস্তবায়নের দুর্বলতা এবং জ্বালানি সংকট বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে। এসব সমস্যাকে সঙ্গী করেই যাত্রা শুরু করতে হবে নতুন সরকারকে। ফলে এই যাত্রা মোটেও সহজ হবে না বলে তিনি মনে করেন।