Image description

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারছে না ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। প্রকাশ্যে প্রায় সব রাজনৈতিক দল গণহত্যায় সম্পৃক্ততার অভিযোগে দলটিকে নির্বাচনের বাইরে রাখার কথা বললেও, বাস্তবে আওয়ামী লীগ সমর্থক ভোটারদের ঘিরে ভেতরে ভেতরে চলছে এক ধরনের নীরব প্রতিযোগিতা। ভোটের মাঠে এগিয়ে থাকতে আসনভিত্তিকভাবে এই ভোটব্যাংক দখলে মরিয়া প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন দলের সমীকরণ—আওয়ামী লীগঘেঁষা ভোট টানতে পারলে তা বদলে দিতে পারে ফল। এমন প্রেক্ষাপটে নির্বাচন সামনে রেখে আওয়ামী লীগের নেতা, কর্মী ও সমর্থকদের দলে টানাসহ নানান কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে দলগুলো।

নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি মূলত ভোটব্যাংক সম্প্রসারণের কৌশল, যেখানে আদর্শের চেয়ে সংখ্যাই মুখ্য হয়ে উঠছে। তবে এমন প্রবণতার সমালোচনা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ। তাদের মতে, গণহত্যায় অভিযুক্ত পতিত ফ্যাসিস্ট শক্তিকে এভাবে রাজনৈতিক মূল ধারায় আত্তীকরণ গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ও আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক কাজী মাহবুবুর রহমান কালবেলাকে বলেন, “ফ্যাসিবাদকে পুনর্বাসন কোনোভাবেই গণঅভ্যুত্থানের কমিটমেন্টের (অঙ্গীকার) সঙ্গে যায় না, এটা স্পষ্টত দ্বিচারিতা। ‘৫ আগস্টকে’ যদি আপনি রেসপেক্ট (সম্মান) করেন, তাহলে কোনোভাবেই ফ্যাসিবাদের সঙ্গে কোনো স্বার্থেই আঁতাত করতে পারেন না। ফ্যাসিবাদী চিন্তা-চেতনাকে স্পেস (জায়গা) দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এ রকম করাটা হলো ‘৫ আগস্ট’-এর সঙ্গে কমিটমেন্ট লঙ্ঘন। রাজনৈতিক দলগুলোর চিন্তা-চেতনা এখন এমন যে, যেভাবেই হোক তারা ক্ষমতায় যেতে চায়। ফলে তারা ভোটার টানার জন্য নানান কৌশল অবলম্বন ও সবাইকে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাচ্ছে। আর এর মধ্য দিয়ে পতিত ফ্যাসিস্ট শক্তিকে আত্তীকরণ করা হচ্ছে। নতুন-পুরোনো সব দলই এটা করছে।”

বিশ্লেষকদের মতে, বড় একটি ভোটব্যাংক রয়েছে আওয়ামী লীগের। আর সেই ভোটে নজর পড়েছে অনেক দলের। তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিগত তিন বিতর্কিত নির্বাচনের আগের নির্বাচনগুলোতে আওয়ামী লীগের ভোট ছিল গড়ে ৪০ শতাংশ। ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে ৪৮ শতাংশ ভোট পেয়েছিল আওয়ামী লীগ। প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা ছিল ৩ কোটি ৪২ লাখ ৭২ হাজার ৯১০টি। তবে নৌকা প্রতীক নিয়ে আওয়ামী লীগের মিত্র কয়েকটি দলও সেবারের নির্বাচনে অংশ নেয়। তার আগে ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৪০.১৩ শতাংশ, ১৯৯৬ সালে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩৭.৪৪ শতাংশ এবং ১৯৯১ সালের পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে ৩০ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট পেয়েছিল আওয়ামী লীগ ও তাদের জোটে থাকা দলগুলো। এরপর ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালে আরও তিনটি সাধারণ নির্বাচন হয়েছে বটে; কিন্তু সেসব নির্বাচন ছিল বিতর্কিত, কারচুপিপূর্ণ ও প্রশ্নবিদ্ধ।

যদিও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর প্রেক্ষাপট ভিন্ন। গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনাসহ অধিকাংশ শীর্ষ নেতা পলাতক অথবা কারাগারে। দলটির রাজনীতিও দেশে নিষিদ্ধ। গণঅভ্যুত্থানের রেশ এখনো কাটেনি। পরিবর্তিত এমন প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ সমর্থক ভোটার বর্তমানে কত শতাংশ, সেই হিসাব বের করা কঠিন। তবে দলটির আদর্শিক একটি ‘ফিক্সড ভোটব্যাংক’ রয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। সেই ভোটের দিকেই এখন নিবিড় নজর অনেক দল ও প্রার্থীর। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী-সমর্থক অধ্যুষিত জনপদগুলো তাদের প্রধান টার্গেট। কয়েকটি দল এই ভোটারদের টানতে চাইলেও আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সঙ্গী জাতীয় পার্টি নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় তাদের প্রার্থীরাই সেই সমর্থন বেশি পেতে পারেন বলে মনে করছেন অনেকেই।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফরিদ আহমেদ বলেন, ‘এই ভোটব্যাংক (আওয়ামী লীগের) মূলত আদর্শনির্ভর ও সংগঠিত। দল ক্ষমতায় থাকুক বা না থাকুক, এই সমর্থন একেবারে হারিয়ে যায় না। বর্তমান বাস্তবতায় আওয়ামী লীগ নির্বাচনের বাইরে থাকলেও এই ভোট কার দিকে যাবে, তা নিয়েই মূলত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নীরব প্রতিযোগিতা চলছে।’

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের ভোটের অঙ্ক কষে সভা-সমাবেশ ও বক্তব্যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের প্রতি নরম অবস্থান নিতে দেখা গেছে। প্রার্থীদের অনেকে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভোট পেতে দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের কাছে টানার চেষ্টা করছেন। বিভিন্ন জেলায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মূল ধারার বিভিন্ন দলে যোগ দিতেও দেখা গেছে।

সর্বশেষ সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল ও বিএনপির সংসদ সদস্য (এমপি) প্রার্থী মো. আসাদুজ্জামানের একটি বক্তব্য ঘিরে আলোচনা-সমালোচনা চলে। তিনি গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের রিট নিয়ে নিজের অবস্থান জানাতে গিয়ে বলেন, গণঅভ্যুত্থানের পর যখন জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগকে আজীবনের জন্য নিষিদ্ধ করার লক্ষ্যে হাইকোর্টে রিট করা হয়েছিল, তখন তিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আমি আদালতে দাঁড়িয়ে বলেছিলাম, যারা এই পিটিশন নিয়ে এসেছেন, তাদের অধিকার নেই একটি আদর্শকে হত্যা করার। আওয়ামী লীগে যেমন খুনি আছে, তেমনি সেখানে আদর্শিক সৈনিকও আছে। আদর্শের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই সেদিন আমি আওয়ামী লীগের রেজিস্ট্রেশন বাতিলের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বাধা দিয়েছিলাম।’

অন্যদিকে, এক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের সমর্থকদের কাছ থেকে শতভাগ ভোট পাবেন—এমন আশাবাদ প্রকাশ করেন পটুয়াখালী-৩ (দশমিনা ও গলাচিপা) আসনে গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী নুরুল হক নুর। তিনি বলেন, ‘আমি যদি ভোট পাওয়ার মতো কাজ করে থাকি, তাহলে আওয়ামী লীগ সমর্থকরাও আমাকে ভোট দেবেন। এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত।’

এমন বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে নুর কালবেলাকে বলেন, ‘আমি আমার এলাকায় দল-মত নির্বিশেষে সবার কাছে পছন্দের। বিগত সরকারের আমলেও তারা আমার পাশে দাঁড়িয়েছে। ৫ আগস্টের পরে আওয়ামী লীগ যেহেতু রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ হয়েছে এবং আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারছে না। সে ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই তাদের বিপুলসংখ্যক ভোটার, তারা তো কাউকে না কাউকে ভোট দেবেই। সে বিবেচনায় তো তাদের কাছে আস্থা, ভরসা, বিশ্বাসের জায়গায় অন্যদের চেয়ে এগিয়ে আমি।’

আওয়ামী লীগের ভোট টানার লড়াইয়ে পিছিয়ে নেই জামায়াতে ইসলামী। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ (সদর) আসনের সাবেক এমপি ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য লতিফুর রহমান ঘোষণা দেন, কেউ আওয়ামী লীগ থেকে জামায়াতে যোগ দিলে তারা তার সব দায়দায়িত্ব নেবেন। এক উঠান বৈঠকে অংশ নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের দলে আপনারা আওয়ামী লীগ থেকে আসবেন। আপনাদের সব দায়দায়িত্ব আমরা নেব। জেলখানা, নবাবগঞ্জ থানা, যে কোনো দায়দায়িত্ব আমরা নেব, ইনশাআল্লাহ।’

আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবিতে টানা কর্মসূচি পালন করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন। এমন পরিস্থিতিতে গত বছরের ১০ মে রাতে জরুরি বৈঠকে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত নেয়।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয় থাকা শিক্ষার্থীরা বলছেন, নির্বাচন সামনে রেখে ফের আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে ফেরানোর চেষ্টা চলছে। এটা গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহত ছাত্র-জনতার রক্তের সঙ্গে প্রতারণা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. আব্দুর রহিম বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থানের দেড় বছরও পেরোয়নি, এরই মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ভোটের স্বার্থে সেই একই আওয়ামী সন্ত্রাসীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিতে শুরু করেছে। গ্রেপ্তারের পর তাদের থানায় মব করে ছাড়িয়ে আনা হচ্ছে, দলে জায়গা দেওয়া হচ্ছে, এমনকি দলীয় প্রভাবে তাদের জামিনও নিশ্চিত করা হচ্ছে। এমন দৃশ্য শুধু বিবেকবর্জিতই নয়, আমরা যারা এই অভ্যুত্থানের অংশ ছিলাম, তাদের কাছে এটি চরম বিশ্বাসঘাতকতা। প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে মনে রাখতে হবে, এই দেশ ছাত্র-জনতার ত্যাগে রঞ্জিত। তাদের রক্তের সঙ্গে এমন বিশ্বাসঘাতকতা ইতিহাস কখনো ক্ষমা করবে না।’

তবে রাজনৈতিক দলের নেতারা মনে করছেন, যারা গণহত্যায় জড়িত নয়, আওয়ামী লীগের অপকর্মে সম্পৃক্ত নয়, তাদের মধ্যে কেউ যদি অনুশোচনা করে রাজনীতির মূল ধারায় ফিরতে চায়, তবে তাদের সুযোগ দেওয়া উচিত। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব কালবেলাকে বলেন, ‘গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আত্তীকরণের জন্য যারা সরাসরি গণহত্যার সঙ্গে জড়িত ছিল না, আওয়ামী লীগ যে দল আকারে গণহত্যা করেছে, সেটার প্রতি তাদের অনুশোচনা আছে। এ জায়গা থেকে পরিবর্তন হয়ে যদি কেউ কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কাজ করতে চায়, সেটা খুব বেশি সমস্যা না।’

এই এনসিপি নেতা বলেন, ‘সমস্যা হচ্ছে আওয়ামী লীগের যারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল, তাদের দল কিংবা নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় যুক্ত করাটা গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। শুধু ভোটের জন্য আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের কাছে টানা দেশের জন্য, রাজনীতির জন্য খারাপ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। আর যারা ভুল স্বীকার করেছে, তাদের ক্ষেত্রে হয়তো বা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আত্তীকরণ হতে পারে।’

আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলেও দলটির সমর্থকদের ভোটাধিকার থাকা উচিত বলে মনে করেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ এখন নির্বাচনে অযোগ্য দল। নির্বাচনে তারা অংশ নিতে পারবে না। তবে তাদের সমর্থকদের ভোটাধিকার থাকা উচিত। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনীতিতে পরিবর্তন ঘটেছে। সেই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে আওয়ামী লীগের সমর্থকরা সুবিবেচনাপ্রসূত হয়েই তাদের পছন্দের মানুষকে ভোট দেবেন বলে আশা করা যায়।’

এ প্রসঙ্গে বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল কালবেলাকে বলেন, ‘যারা শুধু নৌকায় ভোট দিতেন, কিন্তু তারা আওয়ামী লীগের কুকর্মের সঙ্গে জড়িত নয়। তাদের মধ্যে ভালো গুণাবলি সম্পন্ন কিছু মানুষ আসতে চায়, তাদের তো নিতে আপত্তি নেই। বিএনপি উদার গণতান্ত্রিক একটি রাজনৈতিক দল। সুতরাং এখানে উদার গণতান্ত্রিক মনোভাবের যে কেউ আসতে পারে। যদি তার পেছনে কোনো সুনির্দিষ্ট অপরাধ কিংবা অপরাজনীতির সিল না থাকে।’

তবে ভিন্ন কথা বলেছেন আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু। তিনি কালবেলাকে বলেন, ‘ভোট টানার জন্য আওয়ামী লীগের প্রতি সফটনেস (নরম মনোভব) দেখানো ও তাদের দলে ভেড়ানোর বিষয়টি স্রেফ একটি নির্বাচনী অপকৌশল। অথচ ফ্যাসিবাদী হত্যা-নির্যাতনে কে জড়িত, কে জড়িত নয়—এমন বাছবিচার না করে গণহারে মামলায় বিভিন্নজনের নাম ঢোকানোর ব্যাপারে যারা জড়িত, তারা এখন তাদের সেফটির কথা বলছেন—বোঝাই যাচ্ছে তা স্পষ্টতই প্রতারণা। এটা গণঅভ্যুত্থানের কমিটমেন্টের সঙ্গে তো যায়ই না, বরং বলা যায় এটা পুরোটাই অপরাজনীতি।’

যারা কোনো অপরাধ করেনি তাদের রাজনীতিতে ফেরার বিষয়ে মতামত জানতে চাইলে রাজনৈতিক বিশ্লেষক কাজী মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘যারা অপরাধ করেছে তাদের গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য প্রক্রিয়ায় বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। রাজনৈতিক ব্যবস্থায় যারা অপরাধী নয়, কিন্তু অন্য মত-চিন্তার সমর্থক, তাদেরও সমাজের মধ্যে এসিমেলেশনের সুযোগ দিতে হবে। কিন্তু তাদের এসিমেলেশন করার জন্য রাষ্ট্রের কোনো উদ্যোগ নেই। আসলে যারা অপরাধী নয়, তাদের রাষ্ট্র কীভাবে স্পেস দেবে, সে ক্ষেত্রে যথার্থ কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এই উদ্যোগ রাষ্ট্রকেই নিতে হবে।’

বাছবিচার ছাড়াই সমর্থন আদায়ের চেষ্টা রাজনৈতিক দলগুলোকে কাঠামোগতভাবে দুর্বল করে দিচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলো এখানে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করতে পারত। তারা সেটা না করে বরং উল্টো কাজ করেছে। তারা যেনতেনভাবে তাদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেছে। তাদের ব্যবহার করা, তাদের কাছ থেকে বেনিফিট নেওয়া, নানাভাবে লেনদেন হয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে বিষয়টি ইতিবাচক নয়। এরই ধারাবাহিকতায় নির্বাচন সামনে রেখে তাদের টানা হচ্ছে। ক্ষেত্রবিশেষে এমন হচ্ছে যে, হাইব্রিডদের সঙ্গে এখন পুরোনো ত্যাগী নেতাকর্মী ও সমর্থকদের টিকে থাকার জন্য লড়াই করতে হচ্ছে, যা রাজনৈতিক দলগুলোকে কাঠামোগতভাবে দুর্বল করে দিচ্ছে। এ কাজটাই আওয়ামী লীগ করেছিল এবং দলটি তার ফল পেয়েছে।’

কাজী মাহবুবুর রহমান আরও বলেন, ‘এটা শুরু হয়েছে সরকারের ক্ষমতা কাঠামোর পুনর্গঠন থেকে। সরকার ক্ষমতা কাঠামোর এমনভাবে পুনর্গঠন করেছে যে, যাদের গত ১৫ বছর ফ্যাসিবাদের সঙ্গে সখ্য করে সুবিধা নিতে দেখেছি অথবা যারা ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠা করেছে, তারাও ক্ষমতা কাঠামোর অংশ হয়ে গত ১৫ বছর যারা লড়াই করেছে, তাদের ভাগ্য নির্ধারণ করছে। এটাই ৫ আগস্টের ট্র্যাজেডি। জনমনে ধারণা আছে যে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া অন্য অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে মিশ্র ক্ষমতা কাঠামোর পুনর্গঠন হয়েছে, যেখানে গত ১৫ বছরের ত্যাগ নয় বা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ নয়; বরং জেলা, আত্মীয়তা, একই বিভাগ থেকে অধ্যয়ন, অতীত সম্পর্ক, বিভিন্ন ধরনের লেনদেন ইত্যাদি প্রাধান্য পেয়ে থাকতে পারে ক্ষমতা কাঠামোর পুনর্গঠনে। এটাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রত্যাশা অর্জনে সরকারের সক্ষমতা দুর্বল করেছে এবং এখানেই ৫ আগস্টের এক ধরনের ট্র্যাজেডির উৎপত্তি।’