আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাকি আর মাত্র ২৮ দিন। নির্বাচনকে ব্যাপক গুরুত্ব দিয়ে এরই মধ্যে দলগুলো নানা প্রস্তুতি নিচ্ছে। বসে নেই দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপিও। নির্বাচন সামনে রেখে কূটনৈতিক তৎপরতায় বিশেষ জোর দিয়েছে দলটি। আগামীতে ক্ষমতায় গেলে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনার ভাবনা ও নির্বাচনকালীন কৌশল বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে তুলে ধরতে এরই মধ্যে বড় ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে বিএনপির হাইকমান্ড।
জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করলে দলটি কী কী কার্যক্রম পরিচালনা করবে, সেগুলোই বিদেশিদের তারা অবহিত করতে চান। এরই অংশ হিসেবে আগামী ২০ জানুয়ারি মঙ্গলবার রাজধানীর হোটেল শেরাটনে ঢাকায় নিযুক্ত বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে এক বিশেষ বৈঠকে বসছে বিএনপি। সেখানে অতি গুরুত্বপূর্ণ ৮টি সামাজিক বিষয়ে বিদেশি কূটনীতিকদের সামনে বিস্তারিত তুলে ধরবে বিএনপি। এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট কূটনীতিকদের আমন্ত্রণ জানানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, গত ১০ জানুয়ারি হোটেল শেরাটনে গণমাধ্যমের সম্পাদক, মালিক ও সিনিয়র সাংবাদিকদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এরপর আগামী মঙ্গলবার কূটনীতিকদের সঙ্গে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের অনুষ্ঠেয় বৈঠককে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের লক্ষ্যে তারেক রহমানের ‘৩১ দফা’ এবং জনকল্যাণমূলক পরিকল্পনার বিষয়ে বিদেশি প্রতিনিধিরা গভীর আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
বিএনপির নীতিনির্ধারকদের মতে, এই সংলাপের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মহলে দলের গ্রহণযোগ্যতা আরও স্পষ্ট হবে এবং নির্বাচনের আগে একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হবে।
দলীয় সূত্র জানায়, ২০ জানুয়ারির মূল বৈঠকের আগে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পক্ষে কূটনীতিকদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ বজায় রাখা হচ্ছে। গত কয়েক দিনে তার সঙ্গে পাকিস্তান, ভারত, চীন, জার্মানি, তুরস্ক, মিশর ও অস্ট্রেলিয়ার রাষ্ট্রদূত এবং ইইউ প্রতিনিধিদলের সদস্যরা পৃথক পৃথক রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছেন। তারই ধারাবাহিকতায় আগামী ২০ জানুয়ারি বিকেল ৩টা থেকে বৈঠকটি শুরু হবে। বৈঠকে ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ প্রভাবশালী দেশগুলোর রাষ্ট্রদূত ও প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকবেন। এরই মধ্যে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিকদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কূটনীতিকদের নিয়ে অনুষ্ঠেয় মতবিনিময় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব (আন্তর্জাতিক) হুমায়ুন কবিরের সভাপতিত্বে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের অন্যতম সদস্য ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার।
জানা গেছে, উল্লিখিত বৈঠকে বিদেশি কূটনীতিকদের মোটাদাগে মূলত দুটি বিষয়ে ধারণা দেবে বিএনপি। সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিতে বিএনপির প্রস্তুতি ও পর্যবেক্ষণ এবং জনগণের ভোটে ক্ষমতায় গেলে দল প্রণীত ৮টি সামাজিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। সংশ্লিষ্ট দুজন নেতা কালবেলাকে জানান, ক্ষমতায় গেলে বিএনপি কীভাবে রাষ্ট্র সংস্কার করবে এবং অর্থনীতির চাকা সচল রাখবে, তার একটি বিস্তারিত রূপরেখা কূটনীতিকদের সামনে উপস্থাপন করা হবে। বিশেষ করে ফ্যামিলি কার্ড, হেলথ কার্ড, কৃষক কার্ড, ইমাম-মুয়াজ্জিনের সম্মান, ক্রীড়া, যুবকদের কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও পরিবেশ বিষয়ে বিএনপির পরিকল্পনা তুলে ধরবে দলটি।
বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের অন্যতম সদস্য ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার কালবেলাকে জানান, বিএনপি এরই মধ্যে রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের ৩১ দফা রূপরেখা ঘোষণা করেছে। তার মধ্য থেকে মানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ত ৮টি অতি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছে। সেই ৮টি বিষয়ে আগামী মঙ্গলবার কূটনীতিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হবে।
আরও জানা যায়, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দেশ ও সংস্থার প্রতিনিধিরা দফায় দফায় বৈঠক করছেন। এই বৈঠকগুলোয় বিএনপির পক্ষ থেকে তুলে ধরা হচ্ছে আগামীর ‘রাষ্ট্র পরিচালনার রূপরেখা’ ও অঙ্গীকার। গত কয়েকদিনে অন্তত ৮টি দেশের রাষ্ট্রদূত ও শীর্ষ কূটনীতিকরা তারেক রহমানের সঙ্গে পৃথকভাবে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছেন। এর মধ্যে গত ৭ জানুয়ারি বিকেলে গুলশানের চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। যা বিএনপির চেয়ারম্যানের সঙ্গে চীনা রাষ্ট্রদূতের প্রথম সাক্ষাৎ। এরপর গত ৯ জানুয়ারি বিকেল সাড়ে ৪টায় প্রথমে বিএনপির চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠক করেন ঢাকায় নিযুক্ত পাকিস্তানের হাইকমিশনার ইমরান হায়দার। সন্ধ্যা ৬টায় ঢাকায় জার্মানির রাষ্ট্রদূত ড. রুডিগার লটজ এবং অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনার সুসান রাইল তারেক রহমানের সঙ্গে পৃথক সাক্ষাৎ করেন। এরপর ১০ জানুয়ারি বিকেল ৩টায় ইইউর নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান পর্যবেক্ষক ও ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য ইভারস আইজাব; বিকেল ৫টায় ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় কুমার ভার্মা; সন্ধ্যা ৬টায় ঢাকায় তুরস্কের রাষ্ট্রদূত রামিস সেন এবং সন্ধ্যা ৭টায় ঢাকায় মিশরের রাষ্ট্রদূত ওমর ফাহমি পৃথকভাবে তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন।
বিএনপির গুলশান কার্যালয় সূত্র জানায়, কূটনৈতিকদের সঙ্গে বৈঠকের এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে আগামীকাল শুক্রবার থেকে সোমবার পর্যন্ত টানা চারদিন তারেক রহমান বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে আরও কিছু বৈঠকে অংশ নেবেন। এসব বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
জানতে চাইলে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হুমায়ুন কবির কালবেলাকে বলেন, আগামী ২০ জানুয়ারি বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে বিএনপির একটি মতবিনিময় সভা হবে। সেখানে মূলত বিএনপির ৮টি সামাজিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তুলে ধরা হবে।
এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত এবং কূটনীতিকরা কুশল বিনিময় ও সৌজন্যমূলক সাক্ষাৎ করছেন। তা অব্যাহত রয়েছে। মূলত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারসহ দেশের বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে।
জানতে চাইলে রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সাহাবুল হক কালবেলাকে বলেন, বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির সঙ্গে কূটনীতিকদের সম্পর্ক একটি স্বাভাবিক বিষয়। এ ছাড়া বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রায় ১৭ বছর পর দেশে ফিরেছেন; বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক মহলে তার ব্যাপারে স্বাভাবিক আগ্রহ রয়েছে। এ কারণে অনেক কূটনীতিক তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করছেন। তিনি আরও বলেন, সামনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপি কূটনৈতিক মহলে তার সম্পৃক্ততা ও তথ্য বিনিময় বাড়াতে চায়। ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় গেলে দলটি কোন নীতিমালা গ্রহণ করবে, সে বিষয়গুলো তারা কূটনীতিকদের কাছে তুলে ধরতে আগ্রহী। এর মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হবে। এ প্রচেষ্টা দলের ভাবমূর্তি (ইমেজ) উন্নয়নেও সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।