রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অদৃশ্য হাত যখন কাউকে হঠাৎ তুলে নিয়ে যায়, তখন শুধু একজন মানুষই হারিয়ে যান না- ভেঙে পড়ে একটি পরিবার, স্তব্ধ হয়ে যায় একটি সমাজ, আর ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যেতে থাকে রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত। জোরপূর্বক গুমের অভিজ্ঞতা ভুক্তভোগীর শরীর থেকে শুরু করে মন, পরিবার ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান- সবকিছুর ওপর দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করে। এই ক্ষত সময়ের সাথে শুকায় না; বরং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে।
ফিরে এলেও মুক্তি নেই : যারা গুম থেকে ফিরে এসেছেন, তাদের জন্য দুঃস্বপ্ন শেষ হয়নি। ফিরে এসেও তারা থাকেন নজরদারি, হুমকি ও নীরবতার এক অদৃশ্য কারাগারে। অনেককে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেয়া হয়েছে- কে তুলে নিয়েছিল, কোথায় রাখা হয়েছিল, সে কথা বললে পরিণতি হবে ভয়াবহ। কেউ কেউ জানিয়েছেন, বন্দুক লোড করার শব্দ শুনিয়ে, ট্রিগার টানার অভিনয় করে তাদের আবারো মৃত্যুভয়ে কাঁপানো হয়েছে।
আইনগত সুরক্ষা না থাকা, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং রাষ্ট্রীয় অস্বীকার- সবমিলিয়ে ভুক্তভোগীরা সামাজিকভাবে ‘অপরাধী’ তকমা পান। মিথ্যা মামলায় জড়ানো, সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত হওয়া তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথ আরো কঠিন করে তোলে। অনেকেই হারিয়েছেন পেশা, ব্যবসা, সামাজিক মর্যাদা। এক ভুক্তভোগী বলেন, গুমের পর মামলার পেছনে দৌড়ঝাঁপ করতে গিয়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা খরচ হয়েছে, যা তার পরিবারকে কার্যত নিঃস্ব করে দিয়েছে।
শারীরিক নির্যাতনের ক্ষত অনেকসময় চোখে দেখা যায়; কিন্তু মানসিক ক্ষত অদৃশ্য, অথচ গভীর। যুক্তরাজ্যের ফরেনসিক মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ড. আনিস আহমেদের মতে, গুম থেকে ফেরা মানুষের বড় একটি অংশ পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার (চঞঝউ), তীব্র বিষণœতা, উদ্বেগ, স্মৃতিভ্রংশ ও আবেগগত বিচ্ছিন্নতায় ভোগেন। তিনি বলেন, ‘ট্রমা মানুষের মস্তিষ্কের গল্প বলার ক্ষমতাকেই ভেঙে দেয়। তাই তাদের বক্তব্য অস্পষ্ট বা খণ্ডিত শোনালে সেটিকে মিথ্যা ভাবা মারাত্মক ভুল।’ এসব কিছু গুম কমিশনের দীর্ঘ প্রতিবেদনের খণ্ডিত অংশ।
ভয় ঢুকে পড়ে ঘরের ভেতর : গুমের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাবগুলোর একটি হলো- ভয়ের সংস্কৃতি। এই ভয় শুধু রাজপথ বা জনপরিসরে সীমাবদ্ধ থাকে না; ঢুকে পড়ে ঘরের ভেতর, পারিবারিক কথোপকথনে। একজন ভুক্তভোগী জানান, জেল থেকে ফিরে বাড়িতে আসার পর তাকে জোরে কথা বলতে দেয়া হতো না- ভয় ছিল, বাইরের কেউ শুনে ফেললে আবার বিপদ আসবে। এমনকি কান্নাও নিষিদ্ধ ছিল। বাবা বলতেন, ‘এখনো বেঁচে আছিস, এটুকুই যথেষ্ট।’
এই ভয় নাগরিক ও রাজনৈতিক জীবনকে স্তব্ধ করে দেয়। মানুষ কথা বলা, প্রতিবাদ করা, এমনকি নিজের অধিকার দাবি করতেও ভয় পায়। দীঘ মেয়াদে এটি সমাজকে আত্মসঙ্কুুচিত ও নিস্তব্ধ করে তোলে।
নারী ও শিশু : নীরব ভুক্তভোগী : গুমের শিকারদের বড় অংশ পুরুষ হলেও নারী ও শিশুদের ওপর এর প্রভাব অনেকসময় আরো নির্মম। সামাজিক লজ্জা ও ভয়ের কারণে অনেক নারী সামনে আসতে চান না। তবু যারা এসেছেন, তাদের বর্ণনা হৃদয়বিদারক। একাধিক ঘটনায় দেখা গেছে- মায়েদের সাথে শিশুদেরও গুম করা হয়েছে। কোথাও গর্ভবতী নারীকে সন্তানসহ আটক রাখা হয়েছে, কোথাও ছোট শিশুদের রাষ্ট্রীয় হেফাজতে না দিয়ে আটক কক্ষেই রাখা হয়েছে।
এক ঘটনায়, এক মা ও তার ছোট মেয়েকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। পরদিন মেয়েটিকে রাস্তায় ফেলে দেয়া হয়; একজন ইমাম শিশুটিকে কুড়িয়ে পরিবারের কাছে পৌঁছে দেন। মেয়েটি বড় হয়ে আজও সেই ঘর শনাক্ত করতে পারে, যেখানে এক রাত বন্দী ছিল; কিন্তু তার মা আর ফেরেননি।
এই ঘটনাগুলো দেখায়- গুম শুধু একজনকে গোপনে আটক রাখার কৌশল নয়; এটি পরিবারকে তথ্যহীন রেখে পরিকল্পিতভাবে ঝুঁকির মুখে ফেলে।
পরিবারগুলোর অন্তহীন অপেক্ষা : গুমের শিকারদের পরিবারগুলো একধরনের ‘স্থায়ী অনিশ্চয়তায়’ বসবাস করে। তারা জানেন না- প্রিয়জন বেঁচে আছেন, নাকি নেই। আইন অনুযায়ী, সাত বছর না গেলে নিখোঁজ ব্যক্তিকে মৃত ঘোষণা করা যায় না। এই সময়ের মধ্যে সম্পত্তি, উত্তরাধিকার, এমনকি দৈনন্দিন আর্থিক সিদ্ধান্তও আটকে থাকে। অনেক স্ত্রী আদালতে গিয়ে স্বামীকে মৃত ঘোষণা করতে মানসিকভাবে প্রস্তুত নন, কারণ ফিরে আসার ক্ষীণ আশাটুকু তারা আঁকড়ে থাকেন।
অর্থনৈতিক সঙ্কট এই পরিবারগুলোর নিত্যসঙ্গী। অনেক নিখোঁজ ব্যক্তি ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষ। ফলে শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান- সবকিছুই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। সামাজিক কলঙ্কও তাদের পিছু ছাড়ে না। প্রতিবেশীরা চোখ এড়িয়ে চলেন, বাড়িওয়ালারা বাসা দিতে চান না, সন্তানরা স্কুলে ভর্তি হতে গিয়ে বাধার মুখে পড়ে।
এক মা কাঁদতে কাঁদতে বলেছেন, তার ছেলেকে ‘সন্ত্রাসী’ তকমা দেয়ার পর প্রতিবেশীরা আর তার দিকে তাকাত না। ছেলেকে জেলে দেখতে যাওয়ার দিনগুলোতে তিনি পানি পর্যন্ত পান করতেন না- কারণ ফেরার আগে কোথাও শৌচাগার ব্যবহারের সুযোগ পেতেন না।
প্রতিষ্ঠানও ক্ষতিগ্রস্ত : গুম শুধু ব্যক্তিগত বা পারিবারিক ট্র্যাজেডি নয়; এটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকেও দুর্বল করে। যখন নিরাপত্তাবাহিনী বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ডে জড়ায়, তখন কমান্ড চেইন নষ্ট হয়, ভেতরে ভেতরে ব্ল্যাকমেইলের ঝুঁকি তৈরি হয়, আর আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষয়ে যায়। দীর্ঘ মেয়াদে এটি বৈধ নিরাপত্তা সক্ষমতাকেও দুর্বল করে তোলে।
ন্যায়বিচারই আরোগ্য : বিশেষজ্ঞদের মতে, গুমের ক্ষত সারাতে হলে শুধু সময় নয়- প্রয়োজন সত্য, জবাবদিহি ও পুনর্বাসন। আইনি বিচারপ্রক্রিয়া ভুক্তভোগীদের জন্য কেবল ন্যায়বিচার নয়, মানসিক আরোগ্যেরও একটি অপরিহার্য অংশ। ট্রমা-সচেতন বিচারব্যবস্থা, সাক্ষ্য দেয়ার সময় সুরক্ষা এবং সামাজিক পুনর্বাসন ছাড়া জাতীয় পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়।
গুমের এই অদৃশ্য ক্ষতগুলোকে অস্বীকার করলে রাষ্ট্রই একদিন তার দায় বহন করতে বাধ্য হবে। সত্য উদঘাটন, জবাবদিহি ও মানবিক পুনর্বাসন- এই তিন স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়েই কেবল একটি সমাজ তার ভাঙা আয়নায় আবার নিজেকে চিনতে পারে।