অবশেষে নির্বাচনী মাঠ থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন বিএনপি’র প্রার্থীরা। বিএনপি’র চেয়ারম্যান তারেক রহমানের অনুরোধে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিচ্ছেন তারা। গত এক সপ্তাহে বিভিন্ন জেলার দলের বিদ্রোহী প্রার্থীর সঙ্গে গুলশান কার্যালয়ে কথা বলছেন তারেক রহমান।
গতকালও ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগের কয়েকজন প্রার্থীর সঙ্গে আলোচনা করেন তিনি। দলের প্রার্থীর স্বার্থে নির্বাচনে সহযোগিতার অনুরোধ করে বিএনপি নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারলে তাদের যথাযথ মূল্যায়নের আশ্বাস দেন দলের চেয়ারম্যান। তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পর বিভিন্ন জেলার বেশক’জন বিদ্রোহী প্রার্থী সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। এতে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন সমমনা জোটের প্রার্থীরা। ছেড়ে দেয়া ১৭টি আসনের মধ্যে চারটি আসনের বিদ্রোহী প্রার্থী এখনো অনড় অবস্থানে রয়েছেন। তারা শেষ পর্যন্ত মাঠে থাকতে পারেন। এছাড়া বেশ কিছু আসনে দলের বিদ্রোহী প্রার্থী মাঠে রয়েছেন।
বিএনপি’র দায়িত্বশীল নেতারা জানিয়েছেন, বিএনপি’র হাইকমান্ডের অনুরোধে ইতিমধ্যে অনেকে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছেন। আর যারা প্রত্যাহার করেননি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন ২০শে জানুয়ারির মধ্যে তারাও প্রত্যাহার করবেন। এরপরও যদি প্রত্যাহার না করেন তাহলে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেবে দল। এরই মধ্যে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে প্রার্থী হওয়ায় ১০ জনকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
শরিকদের সঙ্গে বিএনপি যে ১৭টি আসনে সমঝোতা করে ছেড়ে দিয়েছে সেগুলো হলো: বগুড়া-২ আসনে নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, ভোলা-১ আসনে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপি’র আন্দালিব রহমান পার্থ, সিলেট-৫ আসনে জমিয়তের মাওলানা মোহাম্মদ উবায়দুল্লাহ ফারুক, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব, নীলফামারী-১ আসনে মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে দলটির মনির হোসেন কাসেমী, যশোর-৫ আসনে জমিয়তের (অনিবন্ধিত) রশিদ বিন ওয়াক্কাস, নড়াইল-২ আসনে ‘অনিবন্ধিত’ এনপিপি’র ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, পটুয়াখালী-৩ আসনে গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুর, ঝিনাইদহ-৪ আসনে রাশেদ খান, ঢাকা-১২ আসনে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক, ঢাকা-১৩ আসনে এনডিএম’র ববি হাজ্জাজ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনে গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, লক্ষ্মীপুর-১ আসনে বাংলাদেশ এলডিপি’র শাহাদাত হোসেন সেলিম, কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির সৈয়দ এহসানুল হুদা, কুমিল্লা-৭ আসনে এলডিপি’র রেদোয়ান আহমদ এবং হবিগঞ্জ-১ আসনে ড. রেজা কিবরিয়া।
জোটের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে ড. রেদোয়ান আহমেদ, ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, রাশেদ খান, শাহাদাত হোসেন সেলিম, এহসানুল হুদা, রেজা কিবরিয়া ও ববি হাজ্জাজ নিজেদের দল ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করছেন। তবে ঢাকা-১২, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২, পটুয়াখালী-৩, নারায়ণগঞ্জ-৪সহ শতাধিক আসনে এখনো বিএনপি’র ‘স্বতন্ত্র প্রার্থীরা’ নির্বাচনের মাঠে রয়েছেন। এ সব প্রার্থীর সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে কথা বলছেন বিএনপি’র চেয়ারম্যান। এর মধ্যে গত ৮ই জানুয়ারি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনে গণসংহতির জোনায়েদ সাকির বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে বহিষ্কৃত হওয়া দলের সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুল খালেককে ঢাকায় ডেকে কথা বলেন তারেক রহমান। এ সময় তাকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়ে সাকির পক্ষে কাজ করার নির্দেশনা দেন তিনি। এ বিষয়ে আব্দুল খালেক বলেন, চেয়ারম্যান যখন ডেকেছেন, তাকে সম্মান করতেই হবে।
একইদিন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ (নাসিরনগর) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী সৈয়দ এ কে একরামুজ্জামানের সঙ্গেও কথা বলেছেন তারেক রহমান। পরে এক ভিডিওবার্তায় নির্বাচন থেকে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন তিনি। ভিডিওবার্তায় একরামুজ্জামান বলেন, ২০০৪ সাল থেকে ২০ বছরের বেশি সময় ধরে বিএনপি’র পতাকাতলে ছিলাম। তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সম্মানে ও বিএনপি’র চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনায় আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষের সমর্থনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনে দাখিলকৃত আমার প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমি আপনাদের কাছে দোয়াপ্রার্থী যেকোনো পরিস্থিতিতে যেন আপনাদের পাশে থাকতে পারি।
এদিকে ঝিনাইদহ-৪ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী মুর্শিদা খাতুন (মুর্শিদা জামান পপি) মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেছেন। তিনি জেলা বিএনপি’র উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য এবং সাবেক সংসদ সদস্য শহীদুজ্জামান বেল্টুর স্ত্রী। ওদিকে মাদারীপুর-৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী কেন্দ্রীয় যুবদলের নির্বাহী কমিটির সাবেক সহ-সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান পলাশ নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্রের আপসহীন নেত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকালে সৃষ্ট জাতীয় শোকের প্রতি সম্মান জানিয়ে এবং বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রতি পূর্ণ রাজনৈতিক আনুগত্য রেখে আমি আসন্ন নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ ওদিকে ভোলা-১ আসন থেকে সরে দাঁড়ালেন বিএনপি প্রার্থী গোলাম নবী আলমগীর। এ আসনটি জোট শরিক বিজেপি প্রার্থী আন্দালিব রহমান পার্থকে ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি।
সোমবার জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেন গোলাম নবী আলমগীর। সুনামগঞ্জ-৫ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএনপি’র জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য, সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপি’র আহ্বায়ক কমিটির অন্যতম সদস্য মিজানুর রহমান চৌধুরীও প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ফেসবুকে দেয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, আমি আপনাদের ভালোবাসায় সাড়া দিয়ে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে সুনামগঞ্জ-৫ আসনে সংসদ সদস্য প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোয়নপত্র দাখিল করেছিলাম। কিন্তু আমার শ্রদ্ধেয় অভিভাবক বিএনপি’র চেয়ারম্যান তারেক রহমান সাহেব আমাকে গতকাল তার গুলশান কার্যালয়ে ডেকে দল ও দেশের স্বার্থে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর অনুরোধ করেছেন। আপনাদের ভালোবাসা ও আবেগ আমার কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তবুও দলের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারকের অনুরোধ উপেক্ষা করে আমার জন্য অনেক কঠিন। এমতাবস্থায় আমি আমার মনোনয়ন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। নোয়াখালী-৫ (কোম্পানীগঞ্জ-কবিরহাট ও সদর আংশিক) আসনে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সাবেক সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের স্ত্রী হাসনা জসীমউদ্দীন মওদুদ। একাধিক সূত্রে জানা গেছে, বিএনপি’র চেয়ারম্যান তারেক রহমানের আহ্বানে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন তিনি।
এদিকে হবিগঞ্জ-১ (নবীগঞ্জ-বাহুবল) আসনে রেজা কিবরিয়ার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়া সাবেক এমপি শেখ সুজাতের সঙ্গে ঢাকায় কথা বলেন বিএনপি চেয়ারপারসন। দলীয় সূত্র জানিয়েছে, শেখ সুজাতও প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেবেন। ওদিকে পটুয়াখালী-৩ আসনে নুরুল হক নুরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন বিএনপি’র কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সাবেক সদস্য হাসান মামুন। গুলশান কার্যালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, দলের হাইকমান্ডের অনুরোধে তিনিও ভোটের মাঠ থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন।
মাঠ ছাড়ছেন না যেসব প্রার্থী
এখনো অনড় অবস্থানে আছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে জুনায়েদ আল হাবিবের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়া বিএনপি’র সাবেক সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। বিএনপি’র চেয়ারম্যানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিদ্রোহী প্রার্থীকে সরিয়ে দেয়ার অনুরোধ করেন জুনায়েদ আল হাবিব। তবে ভোটের মাঠ থেকে সরছেন না রুমিন ফারহানা। তিনি মানবজমিনকে বলেন, আমি আল্লাহর ওপর ভরসা করে এলাকাবাসীর দোয়ায় ভোটে আছি। এলাকাবাসী আমার সঙ্গে আছে। আমি আশা করছি, আল্লাহর রহমতে নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হবো। এদিকে রোববার বিএনপি’র চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন সাইফুল আলম নীরব। এ সাক্ষাতের পরও তিনি নির্বাচনী মাঠে আছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাইফুল আলম নীরব মানবজমিনকে বলেন, আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন সংগ্রহ করেছি, জমাও দিয়েছি। আমি নির্বাচন করবো। এলাকার জনগণ আমার পাশে আছে। তিনি বলেন, আমার চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছে, উনার কাছে দোয়া চেয়েছি, উনি দোয়া করে দিয়েছেন। ইনশাআল্লাহ আমি বিজয়ী হবো। নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনটি ছেড়ে দেয়া হয়েছে জমিয়ত নেতা মাওলানা মনির হোসেন কাসেমিকে। ওই আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন বিএনপি’র সাবেক দুই নেতা শাহ আলম ও গিয়াসউদ্দিন। বিএনপি’র সূত্র জানিয়েছে, তারা দু’জনই শেষ পর্যন্ত ভোটের মাঠে থাকবেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, আমরা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন পর্যন্ত দেখবো। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে যারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন, নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে আমরা তাদের বোঝাচ্ছি এমনকি বিএনপি চেয়ারম্যানও তাদের বোঝাচ্ছেন। তারা তো আমাদের ত্যাগী নেতাকর্মী। আন্দোলন-সংগ্রামে তাদের অবদান রয়েছে। তবে আগামী ২০শে জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন থেকে সরে না দাঁড়ালে, দল তখন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।