Image description
প্রার্থীদের নির্বাচনি হলফনামা

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন জমা দেওয়া হেভিওয়েট প্রার্থীদের অনেকে আয়ের উৎস হিসাবে ‘পরামর্শক’ পেশা উল্লেখ করেছেন। এদের কেউ কেউ আয়কর রিটার্ন ও হলফনামায় পরামর্শক খাত থেকে মোটা অঙ্কের আয়ও দেখিয়েছেন। বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর আলোচনা-সমালোচনার পাশাপাশি জনমনে নানা কৌতূহল জন্ম দিয়েছে। পরামর্শক পেশা আসলে কী, বাংলাদেশের আইনে বৈধ কিনা এবং কে, কোন প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিকে পরামর্শ দিয়ে কত টাকা উপার্জন করেছেন-তা নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানান মন্তব্যের ঝড় বইছে। এর আগে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট একাধিক প্রার্থীর মৎস্য খাতের আয় নিয়েও ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।

একাধিক প্রার্থীর হলফনামা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ স্থানীয় অনেক হেভিওয়েট প্রার্থী পেশা হিসাবে ‘পরামর্শক’ উল্লেখ করেছেন। আয়কর আইনে এটি স্বীকৃত পেশা। সাধারণত সরকারি প্রকল্পে দেশি-বিদেশি পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া হয়ে থাকে। বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানও ইস্যু অনুযায়ী পরামর্শক সেবা নিয়ে থাকে। তবে এসব পরামর্শক বিভিন্ন পেশার বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি হয়ে থাকেন। কিন্তু কোনো ‘রাজনীতিবিদ’ কোথাও পরামর্শক হিসাবে কাজ করেন এমন তথ্য অনেকের অজানা ছিল।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে অভিযোগ করছেন-পেশা হিসাবে পরামর্শক উল্লেখ করে রাজনীতিবিদরা তাদের ভিন্ন খাতের অর্থ বৈধ করার চেষ্টা করছেন। যদিও কারো বিরুদ্ধে তদন্ত ছাড়া এমন মন্তব্য জাস্টিফাই হতে পারে বলেও অনেকে মন্তব্য করেন। তবে পেশা পরামর্শক হিসাবে এ ধরনের অর্থ খুব সহজে ট্যাক্স ফাইলে প্রদর্শনের মাধ্যমে বৈধ করা সম্ভব। কারণ, চাকরি থেকে আয় রিটার্নে উল্লেখ করলে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের বেতন সনদের প্রয়োজন হয়। ব্যবসা খাতে আয় প্রদর্শন করলে ব্যাংক হিসাব বিবরণী ও অডিট রিপোর্ট জমা দিতে হয়। কিন্তু পরামর্শক হিসাবে আয় রিটার্নে দেখানো হলেও কর পরিশোধ ছাড়া কোনো দলিলাদি জমা দিতে হয় না।

আয়কর আইন অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠান পরামর্শকের সেবা গ্রহণ করলে সেক্ষেত্রে বিল বা সম্মানী থেকে ১০ শতাংশ কর কর্তন করে বাকিটা পরিশোধ করতে হয়। পরামর্শমূল্য ৫০ হাজার টাকার বেশি হলে তা ব্যাংক চেকের মাধ্যমে দেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু কোনো ব্যক্তি পরামর্শকের সেবা গ্রহণ করলে পরামর্শককে দেওয়া বিল বা সম্মানী থেকে উৎসে কর কর্তন করতে হয় না। এছাড়া পরামর্শগ্রহীতা ব্যক্তি চাইলে নগদ যে কোনো পরিমাণ অর্থ পরামর্শককে দিতে পারেন। অনেকে ধারণা করছেন, মূলত এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কেউ কেউ ভিন্ন উপায়ে প্রাপ্ত অর্থ পরামর্শক আয় হিসাবে দেখাচ্ছেন। এক্ষেত্রে কোনো সম্পদশালী ব্যক্তি যদি কাউকে মোটা অঙ্কের অর্থ প্রদান করেন, সেটিও পরামর্শক ফি হিসাবে প্রদর্শন করলে আইনত কোনো বাধা নেই।

প্রসঙ্গত, এর আগে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও প্রার্থীদের হলফনামায় মৎস্য খাতের আয় দেখানো নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। সে সময় দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া শেখ ফজলে নূর তাপস, নূর-ই-আলম চৌধুরী, ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ, আব্দুল মান্নান খান, মাহবুবউল আলম হানিফ ও এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীর মতো অনেক হেভিওয়েট প্রার্থীর নির্বাচনি হলফনামায় আয়ের বড় অংশ দেখানো হয় মৎস্য খাতের আয়। গণমাধ্যমে ওই সময় বেশির ভাগ মন্ত্রী-এমপিকে মৎস্যজীবী হিসাবে উল্লেখ করে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়।

তখন কৃষি ও মৎস্য খাতে আয়ের ওপর আয়কর ছিল ৩ শতাংশ, যেখানে স্বাভাবিক ব্যক্তিশ্রেণির করদাতার সর্বোচ্চ করহার ছিল ৩০ শতাংশ। আওয়ামী লীগ আমলে অনুষ্ঠেয় পরবর্তী দুই নির্বাচনেও প্রার্থীদের এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত ছিল। মূলত কম ট্যাক্স দিয়ে আয়কর ফাইলে বেশি অর্থ প্রদর্শনে অবারিত সুযোগ থাকায় এই পন্থা অলম্বন করেন তখনকার হেভিওয়েট প্রার্থীরা।

আয়কর আইন অনুযায়ী, মৎস্য আয় রিটার্নে প্রদর্শনের জন্য উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার একটি সনদের প্রয়োজন হয়। মৎস্য খামারের আয়তন, মাছের জাত বিবেচনা করে মৎস্য কর্মকর্তা ওই খামারে কত টাকার মাছ চাষ করা যায়, সে বিষয়ে সনদ দেন। এর বাইরে আদৌ ওই রাজনীতিবিদ মৎস্য খাতে সঠিক আয় প্রদর্শন করেছেন কিনা, তা কর কর্মকর্তাদের পক্ষে নিরূপণ করা সম্ভবপর নয়। বিধায় কালো টাকা সাদা এবং আয়কর ফাঁকি দিতে সাধারণত রাজনীতিবিদরা তাদের আয়ের বড় অংশ কৃষি ও মৎস্য খাতে দেখিয়েছেন।

একাধিক শীর্ষ আয়কর কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দশম সংসদ নির্বাচনের পরে ব্যাপক সমালোচনার মুখে মৎস্য খাতে আয়কর হার ধাপে ধাপে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়। বর্তমানে মৎস্য খাতে প্রথম ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত করহার শূন্য। পরবর্তী ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত আয়ের ওপর ৫ শতাংশ, পরবর্তী ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত আয়ের ওপর ১০ শতাংশ এবং পরবর্তী ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত আয়ের ওপর ১৫ শতাংশ হারে কর ধার্য আছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা জেলা প্রশাসন ইতোমধ্যে প্রার্থীদের হলফনামায় উল্লিখিত আয়কর বিবরণীর তথ্য যাচাই-বাছাই করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) চিঠি দিয়েছে। এনবিআর থেকে সংশ্লিষ্ট সার্কেলগুলোতে চিঠি দিয়ে হলফনামার তথ্য যাচাই-বাছাই করতে বলা হয়েছে।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী মনোনয়নপত্রের সঙ্গে প্রার্থীর স্বাক্ষরিত হলফনামা জমা দিতে হয়। যেখানে প্রার্থীর সর্বশেষ করবর্ষের আয়কর রিটার্নের কপি সংযুক্ত করার বিধান রয়েছে। হলফনামার তথ্যগুলো যথাযথ কিনা-সেটি যাচাই করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসারের। তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সহায়তা নেওয়া হয়। যেমন-আর্থিক এবং ঋণ সংক্রান্ত তথ্য যাচাই করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। আয়কর সংক্রান্ত তথ্য যাচাইয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সহায়তা নেওয়া হয়। এছাড়া প্রার্থীর বিরুদ্ধে কোনো মামলা আছে কিনা বা তিনি সাজাপ্রাপ্ত কিনা, সেটি যাচাই করা হয় পুলিশ বিভাগ ও আদালতের রেকর্ডের মাধ্যমে। হলফনামায় মিথ্যা বা ভুল তথ্য দেওয়া হলে দণ্ডবিধি অনুযায়ী জেল-জরিমানার বিধান রয়েছে।