Image description

মুক্ত অর্থনীতির জায়গা সংকুচিত হচ্ছে। কমছে সহযোগিতার হাত। বিস্তার লাভ করছে মার্কিন আধিপত্যবাদ। বৈশ্বিক এমন পরিবর্তনে নতুনভাবে সামনে এসেছে সার্কের গুরুত্ব। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার ৮টি দেশ নিয়ে গঠিত দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) বর্তমানে কার্যত অচল। তবে রুটিনমাফিক কিছু কাজ চলছে। অরাজনৈতিক সংস্থা হলেও ভূরাজনৈতিক মেরুকরণে সার্ক এই অঞ্চলের শক্তি হিসাবে কাজ করতে পারে। সার্ক পুনর্জীবিত ও কার্যকর করা গেলে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, ব্লু-ইকোনমির সুরক্ষা, কানেক্টিভিটিসহ আর্থসামাজিক নানা উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। তাই সার্ক কার্যকর করা এখন সময়ের দাবি। দ্বিপাক্ষিক নানা টানাপোড়েনে স্থবির সার্ককে পুনর্জীবিত এবং কার্যকর করতে সদস্য দেশগুলোর রাজনৈতিক ঐকমত্যের প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সার্কের অন্য সদস্যদের পাশাপাশি ভারতের ভূমিকা বিশেষভাবে প্রয়োজন, এমনটাই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

৩১ ডিসেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জানাজায় দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল অংশ নেয়। তাদের মধ্যে ছিলেন পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকার সরদার আইয়াজ সাদিক, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালা নন্দ শর্মা, শ্রীলংকার পররাষ্ট্র, কর্মসংস্থান ও পর্যটনমন্ত্রী বিজিথা হেরাথ এবং মালদ্বীপের উচ্চশিক্ষা ও শ্রমমন্ত্রী আলী হায়দার আহমেদ। পরে পাকিস্তানের স্পিকার এবং নেপাল, শ্রীলংকা ও মালদ্বীপের মন্ত্রীরা রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। অনেকেই মনে করেন, এটি যেন ছিল সার্কেরই ছোট একটি সম্মেলন। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে প্রতিটি দেশের আলোচনায় একটি সাধারণ বিষয় ছিল ‘সার্ক’ প্রসঙ্গ। সার্ক পুনর্জীবিত হওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজায় একাধিক আঞ্চলিক নেতার উপস্থিতি প্রমাণ করে সার্কের চেতনা এখনো জাগ্রত রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় দুই বিলিয়ন মানুষের জন্য একটি অর্থবহ প্ল্যাটফর্ম হিসাবে সার্ক পুনর্জীবিত হবে এমন আশাও তিনি ব্যক্ত করেন।

সার্ক গঠনে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা আছে। ক্ষমতা গ্রহণের পর ১৯৭৭ সালে তিনি আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয়ে গুরুত্ব দেন। ১৯৭৯ সালে তিনি দক্ষিণ এশিয়ার সাতটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে দেশগুলোর অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয় উল্লেখ করে চিঠি দেন, যা ইতিহাসে ‘জিয়াউর রহমানের সার্ক প্রস্তাব’ নামে খ্যাত। ১৯৮০ সালে ঢাকায় প্রথম বৈঠকে অংশ নেয় সাতটি দেশ-বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, শ্রীলংকা ও মালদ্বীপ। ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমান শহীদ হলেও তার রেখে যাওয়া উদ্যোগ এগিয়ে যায়। অবশেষে ১৯৮৫ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয় দক্ষিণ এশিয়ার সাত দেশের প্রথম শীর্ষ সম্মেলন। সার্ক সনদে স্বাক্ষরের মাধ্যমে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়।

নেপালের কাঠমান্ডুতে ২০১৪ সালে সার্কের সর্বশেষ শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। তারপর থেকে কার্যত সার্ক স্থবির। এজন্য ভারত-পাকিস্তানের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও আস্থাহীনতাকে অন্যতম কারণ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। তবে কোভিড-১৯ মহামারির সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আহ্বানে সার্কভুক্ত দেশগুলোর নেতাদের ভিডিও কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। তখন আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করা, স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় যৌথ প্রতিষ্ঠান গঠনের প্রস্তাব এবং আর্থিক সহায়তার বিষয়গুলো উঠে আসে। সে সময় এই ঘটনাকে সার্কের পুনর্জন্মের সূচনা হিসাবে দেখা হলেও পরবর্তী সময়ে সংস্থাটি সক্রিয় হতে পারেনি।

২০১৬ সালে সার্ক শীর্ষ সম্মেলন পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু উরিতে সন্ত্রাসবাদী আক্রমণের প্রতিবাদে ভারত সম্মেলনে যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

সার্ক পুনর্জীবিত হওয়া সম্ভব কি না জানতে চাইলে সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির যুগান্তরকে বলেন, সার্কের গুরুত্ব অপরিসীম। দক্ষিণ এশিয়া পৃথিবীর একমাত্র অঞ্চল যেখানে জনসংখ্যা ১ বিলিয়নের বেশি। তারপরও বর্তমানে আঞ্চলিক সহযোগিতার সক্রিয় কাঠামো অনুপস্থিত। বর্তমানে সার্ক থাকলেও তা সক্রিয় নয়। তার কিছু অংশ কাজ করে। সার্ককে সক্রিয় করার ইচ্ছাও হয়তো সদস্য রাষ্ট্রের অনেকের আছে। কিন্তু এখনো সে ইচ্ছা সহমতের জায়গায় আসেনি। সে জায়গাটি তৈরি করা দরকার। ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশেই সার্ক সৃষ্টি হয়েছিল। তাই সার্ক পুনর্জীবিত হয়ে এই অঞ্চলের মানুষের অগ্রগতির পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখুক, এটি বাংলাদেশ সরকার চায়। এই অঞ্চলের অধিকাংশ দেশের জনগণ ও সরকারও সেটা চায়। তিনি বলেন, সার্ক সক্রিয় করার বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্যের ঘাটতি আছে। তবে দুটি বিশেষ উপাদান সার্কের প্রয়োজনীয়তা নতুন করে অনুভূত করাচ্ছে। প্রথমত, বাইরের পৃথিবী বদলে গেছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন কার্যক্রম ও নীতির কারণে বৈশ্বিক পরিবেশে আমূল পরিবর্তন এসেছে। এখন সবাইকে সবার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। সহযোগিতার জায়গাটি সীমিত হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা গত ২০-৩০ বছর মুক্ত পৃথিবীর অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল ছিল। বিশ্ব এখন আর উন্মুক্ত থাকছে না, নানা ধরনের প্রতিকূলতা ও প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার জনগণ নিজেরা যদি সংগঠিত হয়, তাহলে নিজেরাই একটা শক্তি হিসাবে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা আছে। এই উপলব্ধি এখন নতুন করে আসা প্রয়োজন।

সার্কের দেশগুলো ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। হুমায়ুন কবির বলেন, সার্কভুক্ত দেশগুলো পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে সংঘবদ্ধভাবে আত্মনির্ভরশীল হতে পারে। এনার্জি সিকিউরিটি, ইনভেস্টমেন্ট, কানেক্টিভিটি, জলবায়ু চ্যালেঞ্জ, সমুদ্রসম্পদ ব্যবস্থাপনা, ব্লু ইকোনমির মতো বিষয়ে সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করা গেলে তা সবার জন্য মঙ্গলজনক হবে। এই প্রেক্ষাপটে নিষ্ক্রিয় সার্ককে পুনর্জীবিত করা যায় কিনা তা দক্ষিণ এশিয়ার সব রাষ্ট্রের স্বার্থেই সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করা উচিত।

সাবেক রাষ্ট্রদূত এম শফিউল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, পটভূমিতে দেখা যায় জিয়াউর রহমান ৭টি দেশের মধ্যে জোট গঠনে অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছিলেন। উদ্যোগটি সফল হয়েছিল। সার্ক মূলত অরাজনৈতিক জোট। কমন এজেন্ডা ছিল জলবায়ু পরিবর্তন ও ফলাফল, খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য নিরাপত্তাসহ একে অন্যকে সহায়তা করা। প্রতি ২ বছর পরপর শীর্ষ সম্মেলন হতো। কিন্তু ২০১৪ সালের পর আর শীর্ষ সম্মেলন হয়নি। তিনি বলেন, বিজেপি সরকার ভারতে ক্ষমতায় আসার পর সেখানকার নতুন পার্লামেন্ট ভবনে তারা অখণ্ড ভারতের মানচিত্র পেশ করে। তাতে বাংলাদেশ, শ্রীলংকা, মালদ্বীপ, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান অন্তর্ভুক্ত হয়। ২০১৬ সালে শীর্ষ সম্মেলনে ভারত যোগ দেয়নি। তারপর থেকে অকার্যকর হয়ে গেছে সার্ক। ভারতের অনীহার কারণে সার্ক এগোচ্ছে না। অখণ্ড ভারতের যারা স্বপ্ন দেখে তারা তো সার্কের স্বপ্ন দেখতে পারবে না। সার্ক হলো সাতটি দেশকে স্বীকার করে নেওয়া। ভারত ছাড়া সব দেশ উন্মুখ হয়ে আছে সার্কের জন্য। ভারতে রাষ্ট্রক্ষমতায় যদি বিজেপির পরিবর্তে সেক্যুলার কোনো সরকার আসে যারা গণতান্ত্রিক ও সেক্যুলার, তখন সার্কের পুনর্জীবিত হবে। এর আগে সম্ভব নয় বলে মনে করি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শহীদুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, সার্কের পুনর্জীবিত হওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে কানেক্টিটিভির জন্য। কিন্তু অবস্থা অনেকটা এমন যে, ভারত মাঝখানে বসে আছে। আর বাকি সদস্য দেশগুলো যোগাযোগ করতে পারছে না। এমনকি বিমানপথেও তারা বাধা দিচ্ছে। পাকিস্তানকে ভারত তাদের আকাশ ব্যবহার করতে দিচ্ছে না।

সার্কের অন্যান্য দেশকে নিয়ে চীন একটি ফোরাম করতে অত্যন্ত আগ্রহী। সেখানে নামটা হয়তো সার্ক থাকবে না, অন্য কিছু হবে; যা কমবেশি ব্রিকসের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। চীনের সঙ্গে সম্প্রতি পাকিস্তানের যে কৌশলগত আলাপ হয়েছে সেখানে তারা বাংলাদেশকে সংযুক্ত করার কথা জোরালোভাবে বলেছে। শ্রীলংকা, নেপালও চাইছে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক করতে। আফগানিস্তানের ব্যাপক উন্নয়নে চীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ভারত এখানে একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাচ্ছে। মাঝখানে ভারত আগ্রহ দেখিয়েছিল। বলেছিল, সার্কের আইডিয়া যেন চীনের কাছে চলে না যায়। কিন্তু তারপর তারা নানারকম জটিলতা সৃষ্টি করেছে। যার কারণে সার্ক পুনর্জীবিত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। ধারণা করা যায়, আগামীতে ভারতকে বাদ দিয়েই ব্রিকসের চারপাশে সার্কের ধারণা গড়ে উঠবে এবং ভারত বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।

প্রসঙ্গত, সার্কের বর্তমান সদস্য রাষ্ট্র বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ এবং আফগানিস্তান। আফগানিস্তান সর্বশেষ সদস্য হিসাবে ২০০৭ সালে সার্কে যোগ দেয়।