রাজধানীর মেরুল বাড্ডার বৈঠাখালী। এই এলাকার বাসিন্দা টিনা হাসান। কর্মজীবী এই নারী ভোটার হয়েও ভোট দিতে পারেননি গত তিন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। অনেকটা অনাস্থা তৈরি হয়েছে ভোট ব্যবস্থায়। তবে অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে আশার আলো দেখছেন টিনা। জাতীয় নির্বাচনের মতো বড় আয়োজনে নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন- এমনটাই প্রত্যাশা তার। সে সঙ্গে নিজ নির্বাচনী আসনের প্রার্থীদের নিয়েও ভাবছেন। টিনা বলেন, ঢাকা-১১ আসনে এর আগে বলতে গেলে কোনো ভোটই হয়নি। আমি ভোটার হওয়ার পর থেকে দেখছি, একবার এক প্রার্থীর জন্য ভোট লাগেনি।
২০১৮ সালে তো রাতেই ভোট হয়ে যাওয়ায় কেন্দ্রে গিয়ে ফিরে এসেছি। আর ২০২৪ সালেও পাতানো নির্বাচন ছিল। কর্মজীবী এই নারী আরও বলেন, অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে নতুন করে আশা করছি- একটি সুন্দর নির্বাচন হবে। ভোট দেয়ার ইচ্ছাটাও আছে। বাকিটা জানি না। গতকাল এই নির্বাচনী এলাকা ঘুরে পাওয়া গেছে ভোট নিয়ে নানা হিসাবনিকাশ। এখানে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এম এ কাইয়ুম এবং এনসিপি’র আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম আলোচনায় আছেন। কাইয়ুম বিএনপি ও সমমনা জোটের সমর্থনে প্রার্থী হয়েছেন। আর নাহিদ লড়ছেন জামায়াতসহ ১০ দলীয় জোটের সমর্থন নিয়ে। এই দুই প্রার্থীর বাইরে অন্য প্রার্থীদের নিয়ে খুব একটা আলোচনা নেই এখানে।
বৈঠাখালী এলাকার শিমুল নামের এক বাসিন্দা বলেন, এই এলাকায় বিএনপি’র প্রার্থী কাইয়ুম আগে থেকে নির্বাচনী মাঠে আছেন। নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপি’র আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে নিয়েও মানুষের আগ্রহ আছে। নতুন হিসেবে তাকে অনেক চ্যালেঞ্জ উৎরাতে হবে।
শুধু বৈঠাখালীই নয়। ঢাকা-১১ আসনের অন্তর্ভুক্ত মধ্য বাড্ডা, দক্ষিণ বাড্ডা, উত্তর বাড্ডা, হোসেন মার্কেট, ময়নারবাগ, ভাটারা, সাতারকুল বেরাইদ, শাহজাদপুর, রামপুরাসহ বিভিন্ন এলাকায় সরজমিন তথ্য সংগ্রহ করে মানবজমিন। এসব এলাকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা হয় মঙ্গলবার দিনভর। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আসনটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার লক্ষ্যে মোট ১১ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এর মধ্যে বাতিল হয়েছে দুজনের। বিএনপি’র এম এ কাইয়ুম ও এনসিপি’র আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামসহ ৯ প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। অন্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন-জাতীয় পার্টির শামীম আহমেদ, গণফোরামের মো. আবদুল কাদের, বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির জাকির হোসেন, গণঅধিকার পরিষদের আরিফুর রহমান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের শেখ মো. ফজলে বারী মাসউদ, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের কাজী মো. শহীদুল্লাহ এবং ন্যাশনাল পিপলস পার্টির প্রার্থী মো. মিজানুর রহমান।
মনোনয়ন বৈধ প্রার্থী নয়জন হলেও মাঠের আলোচনায় মূলত বিএনপি’র কাইয়ুম ও এনসিপি’র নাহিদকে ঘিরে। অবশ্য জামায়াতের সঙ্গে জোট হওয়ার আগে এ আসনে দলটির মনোনীত প্রার্থী আতিকুরও ছিলেন আলোচনায়।
উত্তর বাড্ডার পূর্বাচল এলাকার বাসিন্দা নাঈম হাসান চৌধুরী বলেন, ২০২৪ সালে এই আসনে আমার ভোটকেন্দ্রের আশপাশে ঘুরতে গিয়েছিলাম। আগেই জানতাম এটা একটা সাজানো ভোট। শুধু ঘুরতে গিয়েছিলাম। দিনভর কোনো ভোটারই ছিল না। খুব খারাপ লেগেছে রাষ্ট্রের এত টাকা নষ্ট করে এমন বাজে নির্বাচনের আয়োজন করায়। এই টাকা আমার-আপনার ঘাম ঝরানো। তাই এই টাকা নিয়ে যারা রঙ তামাশা করেছে তাদের অভিশাপ দিয়েছিলাম। তারা এখন নেই। এখন নতুন বাংলাদেশে নতুন স্বপ্ন দেখছি। কাকে ভোট দেবো সেই প্রশ্ন পরে। তবে এবার দুই প্রার্থীর মাঝেই বেশ চমক রয়েছে। বিএনপি’র ভোটব্যাংক বলা চলে এই বাড্ডাকে। সেখানে এনসিপি’র নাহিদ নতুন চমক সবার জন্য। তিনি কেমন ভোট পাবেন-এটা নিয়ে সবার আগ্রহ।
একই এলাকার বাসিন্দা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, আমি জন্মেছি এই এলাকায়। এখানে সুষ্ঠু ভোট হলে বিএনপিই জেতে। এবার যদি সুন্দর নির্বাচন হয় তাহলে তার ব্যতিক্রম হবে না। নাহিদ ইসলামের জন্য প্রথম পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় না জিতলেও ভালো কিছু করতে পারেন। কারণ তার নেতৃত্বে অভ্যুত্থান হয়েছে। শেখ হাসিনার পতন হয়েছে। তাই নতুন ভোটারদের একটা অংশ তাকে ভোট দিতে পারে। এ ছাড়া জামায়াত, ইসলামী আন্দোলনসহ ১০ দলের জোট আছে। তাদের ভোটও নাহিদ ইসলাম পাবেন।
হোসেন মার্কেট এলাকার পেছনেই ময়নারবাগ মহল্লা। এখানকার বাসিন্দা ইউনুস মিয়া বলেন, আমার বাড়ি নোয়াখালী হলেও ৪০ বছরের বেশি ময়নারবাগ আছি। আগের নির্বাচনগুলা তো কোনো নির্বাচন ছিল না। মানুষ ভোটই দিতে পারে নাই। এখন নতুন প্রেক্ষাপটে একটা সুন্দর ভোট হবে আশা করি। আসলে কে জিতবে কে হারবে সেটা বড় কথা না। আগে একটা সুন্দর ভোটের দরকার। যেটা ১৫ বছরে হয়নি।
ময়নারবাগ এলাকার বাসিন্দা আবদুল বাতেন বলেন, মানুষ তারেক রহমান আসার পর বেশি আশা করতেছে। এতদিন একটা বড় দলের নেতা ছিল না। আমি ভাবছিলাম নির্বাচন হবে না। নেতা ছাড়া নির্বাচন হয় নাই আগেও। এবার আশা করতেছি নির্বাচনটা হবে।
দক্ষিণ বাড্ডা আলাতুন্নেছা স্কুল রোডের বাসিন্দা মাসুদ এ আজিজ বলেন, একটি সুন্দর নির্বাচনের আশায় আমরা আছি। হয়তো সেটা হবে। তবে আমাদের এলাকায় খোঁজ নিয়ে দেখেছি কিছু দোদুল্যমান ভোটার বিএনপিকে চাচ্ছে না। কারণ বিএনপি’র চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া যখন কারাগারে ছিলেন তখন অনেক স্থানীয় নেতাই তার মুক্তির আন্দোলনে অংশ নেয়নি। এখন নতুন করে অনেকে সুবিধা নিতে দলীয় কার্যক্রমে দেখা দিচ্ছে। সঙ্গে বিএনপি’র প্রচারেও নামছে। এ ছাড়া যারা বংশ পরম্পরায় বিএনপিতে ভোট দেয় তাদের ভোটগুলো ঠিক থাকবে।
ওই এলাকার বাসেদ রহমান বলেন, নতুন বাংলাদেশে আমরা নতুন করে কিছু চিন্তা করতে পারি। যে দল বা যে প্রার্থী নির্বাচনে জিতে তার দলীয় নেতাকর্মী দিয়ে চাঁদাবাজি করাবে তাদের ভোট দেবো না।
বাড্ডার শাহজাদপুর এলাকার ভোটার ইসরাফিল মিয়া বলেন, এখানে নতুন বলতে কিছু নেই। সবসময়ই আমরা এক দলের রাজনীতি করে এসেছি। সাধারণ মানুষ হিসেবেও তাদের কাছে পেয়েছি। আশা করছি ভোটে জিতে কাইয়ুম ভাই আমাদের এলাকার জন্য ভালো কাজ করবেন।
রামপুরা টিভি রোডের বাসিন্দা শহীদুল ইসলাম বলেন, নাহিদ আসলেই এই আসনের জন্য চমক। এখানে বিএনপি’র ভোট বেশি হলেও নাহিদ হয়তো ভালো রেজাল্ট করতে পারে। কারণ ছেলেটার আচার ব্যবহারও ভালো। একরামুন্নেছা স্কুলের পেছনে উলন রোডের ভোটার ইকবাল হোসেন বলেন, আমি আমার পরিবারের সদস্যদের বলেছি এবার সুষ্ঠু ভোট হলে যেন নতুন কাউকে ভোট দেয়। আমিও তাই দেবো। তবে সরকারকে আগে ভোটের পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
পূর্ব রামপুরা হাইস্কুল রোডে একটি চায়ের দোকানে বসে নির্বাচন নিয়ে আলাপ করছিলেন কয়েকজন। তাদের মধ্যে সাইফুল ইসলাম নামের এক মাছ ব্যবসায়ী বলেন, আমি ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগকে ভোট দিছি। তারা আমাদের ভোটের ইজ্জত রাখে নাই। এবার বিএনপিকে দিবো। আর এই এলাকায় বেশি বিএনপি’র ভোটই। আওয়ামী লীগ বা অন্য দলের ভোটার অনেক কম।
ঢাকা-১১ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৫৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ১৭ হাজার ২২১ জন এবং নারী ভোটার ২ লাখ ৯ হাজার ৩৩১ জন।