রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ আসন ঢাকা-১৭। কূটনৈতিক এলাকা খ্যাত এই আসনে যেমন উচ্চবিত্তের বাস তেমনি আছেন নিম্নবিত্তের বস্তিবাসীও। এ ছাড়া বিদেশি কূটনীতিকদের প্রায় সবাই বসবাস করেন এই আসন এলাকায়। গুরুত্বপূর্ণ এই আসনে এবার প্রার্থী হয়েছেন বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি প্রার্থী হওয়ায় ভোটের মাঠে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। আসনটিতে তারেক রহমানের বিপরীতে জামায়াত জোটের প্রার্থী ডা. এস এম খালিদুজ্জামান প্রতিদ্বন্দ্বীতা করবেন। এই দুই প্রার্থী ছাড়া আলোচিত কোনো প্রার্থী নেই এ আসনে।
গুলশান-বনানী ও বারিধারা এলাকা নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৭ (আসন) এখানকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষদের সঙ্গে কথা হয়েছে মানবজমিনের। তারা জানিয়েছে, সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পর থেকেই এই আসনে জামায়াতের প্রার্থী প্রচারণা চালিয়ে আসছেন। বিএনপি ও সমমনা জোটের প্রার্থী হওয়ার কথা ছিল বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান পার্থের। বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে আসার পর তার সম্মানে পার্থ ভোলা-১ আসনে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নেন। তারেক রহমান প্রার্থী হওয়ার পর থেকেই মাঠের চিত্র পাল্টে গেছে।
ওদিকে এই আসনে বিএনপি নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করেছে। এই কমিটি তারেক রহমানের নির্বাচনের সমস্ত কার্যক্রম পরিচালনা করবে। নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত আচরণ বিধিমালা অনুযায়ী তারা ভোটের কার্যক্রম চালাবে। এই আসনে প্রতিটি থানা এবং ওয়ার্ডে একটি করে নির্বাচনী ক্যাম্প করবে বিএনপি। তারেক রহমানও নির্বাচন কমিশনের আচরণ বিধিমালা মেনে প্রচারণায় নামবেন বলে জানিয়েছেন ঢাকা-১৭ আসনে বিএনপি’র নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়ক আবদুস সালাম। তিনি মানবজমিনকে বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া যেমন বাংলাদেশের জনগণের আস্থার প্রতীক, তেমনি বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানও জনগণের আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছেন। আমরা আশা করছি, তারেক রহমান নির্বাচনে জিতবেন। উনি জিতলে দেশে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে।
গুলশান এলাকার বাসিন্দা সাইফুর রহমান আসাদ মানবজমিনকে বলেন, গুলশান-বনানী ও বারিধারার মতো অভিজাত এলাকা নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৭ আসন। এই আসনে প্রার্থী হয়েছেন বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। উনি প্রার্থী হওয়ার পর থেকে নির্বাচনী মাঠের চিত্র পাল্টে গিয়েছে। অভিজাত এলাকার ভোটাররা অনেক বিচার-বিশ্লেষণ করে ভোট দেন।
বানানী এলাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা সজীব ভূঁইয়া মানবজমিনকে বলেন, এই আসনে আগে প্রচারণায় এগিয়ে ছিলেন জামায়াতের প্রার্থী। কিন্তু বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেয়ার পর থেকে ভিন্ন প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে। সবার মুখে এখন তারেক রহমানের নাম। এখন তিনি ভোটের মাঠে এগিয়ে রয়েছেন।
গুলশান ডিএনসিসি মার্কেটের ব্যবসায়ী আব্দুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, নির্বাচনে বিএনপি এগিয়ে রয়েছে। এই মার্কেটে বিএনপি’র সমর্থন বেশি। আওয়ামী লীগের আমলেও এই মার্কেটে বিএনপি’র সমর্থন বেশি ছিল। এখন তো আরও বেশি।
সরজমিন গুলশান-১, গুলশান-২ এবং বানানী এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিদিনের মতো গতকালও ব্যস্তময় ছিল এই তিনটি এলাকা। সবাই যার যার কাজে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। এরমধ্যে দুই-একটি জায়গায় দেশের বর্তমান পরিস্থিতি ও নির্বাচন নিয়ে কথা বলতে শোনা গেছে। এরমধ্যে ব্যস্তময় এলাকায় গুলশান-২ নাম্বারে একটি চা-এর দোকানে বসে ৪ থেকে ৫ জন কথা বলছিলেন। তাদের কেউ কেউ দেশের বর্তমান অবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক দল ও সরকারকে দোষারোপ করছিলেন। তবে এর মধ্যে দু-একজন বলেন যে, নির্বাচন হলে পরিস্থিতি ঠিক হয়ে যাবে। তাদের ভাষ্য, তারেক রহমান এই আসনে প্রার্থী হয়ে ভালো একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
ওদিকে এই আসনে অনেকটা ভিন্ন চিত্রও দেখা গেছে। এর মধ্যে গুলশান-১ ও বানানী এলাকায় কয়েকজন বাসিন্দা ও সাধারণ মানুষকে নির্বাচন নিয়ে কথা বলতে অনীহা প্রকাশ করতে দেখা গেছে। তাদের ভাষ্য, তারা নির্বাচন নিয়ে কোনো চিন্তা করেন না। তাই নির্বাচনে কোন দলের কে প্রার্থী হয়েছেন, তা নিয়ে তারা কথা বলতে চান না।
গুলশান এলাকায় রিকশা চালান আলমগীর হোসেন। তার সঙ্গে নির্বাচন প্রসঙ্গে কথা বললে তিনি জানিয়েছেন, ঢাকা-১৭ আসনে তারেক রহমান এগিয়ে রয়েছেন।
গুলশানে বই বিক্রিতা সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ঢাকা-১৭ আসনে বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এবং জামায়াতের প্রার্থী আলোচনায় আছেন। তারেক রহমান দেশে আসার পর পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। তবে তাদের দু’জনের মধ্যেই লড়াই হবে।
গতকাল ঢাকা-১৭ আসনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নির্বাচন নিয়ে গুলশান চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে মতবিনিময় করেছেন দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বেলা ১১টায় ১টা পর্যন্ত বনানী থানার নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। এরপরে বিকালে ক্যান্টনমেন্ট থানার সঙ্গে মতবিনিময় করেন। আজ গুলশান ও ভাষানটেক থানার নেতাকর্মীদের সঙ্গে তারেক রহমান মতবিনিময় করার কথা রয়েছে।
ঢাকা-১৭ আসনে উচ্চবিত্ত ও নিম্নবিত্ত-দুই ধরনের ভোটার হয়েছে উল্লেখ করে তাদের সমস্যাগুলো তারেক রহমানের কাছে তুলে ধরেন নেতাকর্মীরা। সেগুলো সমস্যা পরিবর্তন করার বিষয়ে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেন বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান।
এই আসনে জামায়াতের প্রার্থী ডা. খালিদুজ্জামান তফসিল ঘোষণার আগে থেকেই নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে আসছেন। সম্প্রতি করাইল বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডের পর সেখানে ব্যাপক ত্রাণ তৎপরতা চালায় জামায়াত। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, বস্তির ভোটারদের টার্গেট করে জামায়াত আগে থেকে অনেক কাজ করেছে। এ ছাড়া তারা বাড়ি বাড়ি যাচ্ছে। নারী নেত্রীরা নারী ভোটারদের কাছে যাচ্ছেন। কড়াইল বস্তির বাসিন্দা আমিনুর রহমান পেশায় ব্যাবসায়ী। তিনি বলেন, তারেক রহমান প্রার্থী হওয়ায় হিসাব বদলে গেছে। তবে বিএনপি এবং জামায়াত প্রার্থীর মধ্যেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে।
এই আসনে খেলাফত মজলিসের মো. এমদাদুল হক, ইসলামী আন্দোলনের মোহাম্মদ উল্লাহ, জাতীয় পার্টির আতিক আহমেদ, বিএনএফের এস এম আবুল কালাম আজাদ, ইনসানিয়াতের মঞ্জুর হুমায়ুনসহ যারা প্রার্থী হয়েছেন তাদের কেউই নির্বাচনী লড়াই বা আলোচনায় নেই।
ঢাকা-১৭ আসনটি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১৫, ১৮, ১৯ ও ২০ নম্বর ওয়ার্ড এবং ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থানার ক্যান্টনমেন্ট এলাকা নিয়ে গঠিত। গুলশান, বনানী, নিকেতন, মহাখালী, বারিধারা, শাহজাদপুর এবং ঢাকা সেনানীবাসের অংশ বিশেষ এই আসনের মধ্যে পড়েছে। এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ২৫ হাজার। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৭০ হাজার এবং নারী ভোটার ১ লাখ ৫৩ হাজার।