বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনী আসন সমঝোতায় যাওয়ার সিদ্ধান্তের পর জাতীয় নাগরিক পার্টিতে (এনসিপি) একের পর এক পদত্যাগের ঘটনা ঘটছে। এ পর্যন্ত দলটি থেকে অন্তত ১০ জন কেন্দ্রীয় নেতা পদত্যাগ করেছেন। তাদের বেশিরভাগই বাম ঘরানার ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে জানা গেছে। দল ছাড়া নেতাদের অভিযোগ, এনসিপি নতুন বন্দোবস্তের কথা বললেও বাস্তবে পুরোনো ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার অংশীজনের সঙ্গে আপস করেছে। জোট করার মাধ্যমে দল মূল লক্ষ্য থেকে সরে গেছে।
জামায়াতের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে জোট ঘোষণার আলোচনার মধ্যে প্রথমেই পদত্যাগ করেন এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব, আলোচিত চিকিৎসক ও সমাজকর্মী ডা. তাসনিম জারা। এরপর ধারাবাহিকভাবে গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত কেন্দ্রীয় পর্যায়ের মোট ১০ জন নেতা দল ছেড়েছেন। দলের সব পদ থেকে অব্যাহতি চেয়ে আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের কাছে পৃথক পদত্যাগপত্র জমা দেন তারা। অনেকে ফেসবুকে ঘোষণা দেন এবং কেউ অনলাইনে পদত্যাগপত্র জমা দেন। কেন্দ্রীয় নেতা ছাড়াও বিভিন্ন ইউনিটের কয়েকজন পদত্যাগ করার ঘটনা ঘটেছে। এর বাইরে অন্তত পাঁচ নেত্রী এ বিষয়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন, যাদের মধ্যে দুজন এনসিপির মনোনীত প্রার্থী হয়েও নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।
পদত্যাগকারী নেতারা হলেন সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. তাসনিম জারা, যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ, তাজনূভা জাবীন, যুগ্ম সদস্য সচিব ও মিডিয়া সেলের সম্পাদক মুশফিক উস সালেহীন, যুগ্ম সদস্য সচিব আরিফ সোহেল, কেন্দ্রীয় যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক খান মুহাম্মদ মুরসালীন, আইসিটি সেলের প্রধান ফারহাদ আলম ভূঁইয়া, কেন্দ্রীয় সদস্য আল আমিন আহমেদ টুটুল, কেন্দ্রীয় সংগঠক ও মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নাতি আজাদ খান ভাসানী। এর আগে গত ২৫ ডিসেম্বর জোট আলোচনার শুরুতেই পদত্যাগ করেন কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব ও চট্টগ্রাম-১৬ আসনের মনোনীত প্রার্থী মীর আরশাদুল হক।
কেন্দ্রীয় এক নেতা কালবেলাকে বলেন, পদত্যাগ করা বেশিরভাগ নেতাই বাম ঘরানার ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তারা কেউই জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতাকে মানতে পারেননি। তবে এনসিপি মূলত নির্বাচনী কৌশল হিসেবেই এ জোটে গিয়েছে। এখানে আদর্শগত কোনো বিষয় নেই।
গত ২৮ ডিসেম্বর জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান এনসিপির সঙ্গে জোটের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। পরে আরেক সংবাদ সম্মেলনে এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামও বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানান। দল সূত্রে জানা যায়, অন্তত ৩০টি আসনে জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতায় গিয়েছে এনসিপি। এ সিদ্ধান্তে কেন্দ্রীয় ৩০ নেতা ওইদিনই আপত্তি জানিয়ে আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে চিঠি দেন। অন্যদিকে, দলের বাকি নেতারা নাহিদ ইসলামের সিদ্ধান্তের পক্ষে থাকার ঘোষণা দেন। শেষ পর্যন্ত জোটের সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ায় একের পর এক পদত্যাগের ঘটনা ঘটছে।
গত রোববার বিকেলে জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির নির্বাচনী আসন সমঝোতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসে। এ আলোচনা চূড়ান্ত হলে আগের দিন এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেন তাসনিম জারা। তিনি দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিবের দায়িত্বে ছিলেন। ঢাকা-৯ সংসদীয় আসনে এনসিপির মনোনীত প্রার্থীও ছিলেন তিনি।
এনসিপি থেকে পদত্যাগের পর স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঢাকা-৯ আসনে প্রার্থিতা ঘোষণা করেন তিনি। পরে গত বৃহস্পতিবার তার স্বামী ও এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহও পদত্যাগ করেন।
তার আগে ২৫ ডিসেম্বর জোট আলোচনার শুরুতেই পদত্যাগ করেন কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব ও চট্টগ্রাম-১৬ আসনের মনোনীত প্রার্থী মীর আরশাদুল হক। তিনি একাধারে এনসিপির নির্বাহী কাউন্সিল এবং মিডিয়া সেল ও শৃঙ্খলা কমিটির সদস্য ছিলেন। তিনি জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ও নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের প্রতিশ্রুতি নিয়ে এনসিপি যাত্রা শুরু করলেও গত ১০ মাসে নেতারা সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছেন। দল ও বড় অংশের নেতারা ভুল পথে আছেন বলেই মনে করেন এ নেতা।
গত ২৮ ডিসেম্বর পদত্যাগ করেন তাজনূভা জাবীন। জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির আসন সমঝোতার প্রসঙ্গ টেনে ফেসবুকে তিনি লেখেন, ‘এই জিনিস হজম করে মরতেও পারব না আমি।’ তিনি আরও লেখেন, ‘ওই পুরোনো ফাঁকা বুলির রাজনীতি করতে হলে পুরোনো দলই করতাম, নতুন কেন? এবার আবারও আসি, জামায়াতের সঙ্গে জোট প্রসঙ্গে, এনসিপি স্বতন্ত্র স্বকীয়তা নিয়ে দাঁড়িয়ে গেলে যে কারও সঙ্গে রাজনৈতিক জোটে অসুবিধা ছিল না। সেটা ৫ বছর পরে হতো, ঠিক প্রথম নির্বাচনেই কেন? কিন্তু আর সব অপশনকে ধীরে ধীরে রাজনীতি করে বাদ দেওয়া হয়েছে, যাতে জামায়াতের সঙ্গে জোট ছাড়া কোনো উপায় না থাকে। সুনিপুণভাবে এখানে এনে অনেককে জিম্মি করা হয়েছে। যাই হোক। এটা কোনো রাজনৈতিক কৌশল নয়। এটাই পরিকল্পনা।’
৩০ ডিসেম্বর পদত্যাগ করেন কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব আরিফ সোহেল। তিনি ফেসবুকে অভিযোগ তুলে লেখেন, ‘নতুন গণরাজনীতি, রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী নির্মাণ ও জুলাইয়ের গণশক্তিকে সংগঠিত করার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালিত না হওয়ায় জাতীয় নাগরিক পার্টি প্রতিষ্ঠিত পুরোনো দলগুলোর সঙ্গে আপসরফা করে পুরোনো ক্ষমতার রাজনীতিতেই প্রবেশ করতে বাধ্য হয়েছে।’
২৯ ডিসেম্বর দলটির কেন্দ্রীয় সংগঠক ও মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নাতি আজাদ খান ভাসানী এনসিপির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। তিনি ফেসবুকে লেখেন, ‘নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ও স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এনসিপির প্রত্যাশিত সাফল্য দেখা যায়নি। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, বাস্তব অভিজ্ঞতায় নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা, গণমানুষের প্রতি দরদ ও ত্যাগের যে গভীরতা প্রয়োজন, এখানে (এনসিপি) তার স্পষ্ট ঘাটতি আমি অনুভব করেছি।’
পদত্যাগ করা আরেক নেতা মুশফিক উস সালেহীন পদত্যাগপত্রে উল্লেখ করেন, আসন্ন জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় জোটে এনসিপির অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্তের সঙ্গে তিনি নীতিগতভাবে একমত নন। এ বিষয়ে তিনি আগে কার্যনির্বাহী পরিষদের সভায় ‘নোট অব ডিসেন্ট’ আকারে এবং পরে স্মারকলিপির মাধ্যমে আপত্তি জানিয়েছিলেন। তার মতে, ওই জোটে যোগদান জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নাগরিক রাষ্ট্র গঠনের রাজনৈতিক লক্ষ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
আইসিটি সেলের প্রধান ফারহাদ আলম ভূঁইয়া আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। কেন্দ্রীয় সদস্য আল আমিন আহমেদ টুটুলও একইভাবে পদত্যাগপত্র দেন। টুটুল তার পদত্যাগপত্রে বলেন, দলের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও আদর্শ স্পষ্ট না হওয়া এবং সদস্যদের মধ্যে বৈষম্য তৈরির কারণে তিনি স্বেচ্ছায় এনসিপির সব দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিচ্ছেন।
এনসিপির নীতিনির্ধারণী ফোরাম রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য ও সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন বলেন, ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নির্ভরযোগ্য মিত্র না। তার রাজনৈতিক অবস্থান বা দর্শনসহ কোনো সহযোগিতা বা সমঝোতায় যাওয়া এনসিপিকে কঠিন মূল্য চুকাতে হবে বলে আমি মনে করি।’
দলে ভাঙন ও নেতাদের পদত্যাগ প্রসঙ্গে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আমরা আমাদের দলের নির্বাহী পরিষদের সঙ্গে আলোচনা করে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে জোটের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। যে কোনো মতামতের ক্ষেত্রে কারও ভেটো (আপত্তি) থাকতে পারে, মতামত থাকতে পারে। তবে এনসিপির সারা দেশের নেতাকর্মী ও সহযোগী সংগঠনগুলো এ সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত।’
তিনি আরও বলেন, ‘যারা বিরোধিতা করছেন, তাদের সঙ্গে কথা বলে বোঝানোর চেষ্টা করা হবে। তারা এনসিপির এ সিদ্ধান্তের সঙ্গেই থাকবেন বলে আশা করি।’