Image description

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি’র চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যু সংবাদে শোকে মুহ্যমান গোটা জাতি। মঙ্গলবার শোকাবহে ছেয়ে যায় ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতাল প্রাঙ্গণ। ২৩শে নভেম্বর রাত থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই হাসপাতালেই চিকিৎসাধীন ছিলেন আপসহীন এই নেত্রী। সেসময় থেকেই হাসপাতালের সামনে ভিড় করতে থাকে দলের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষজন। তারা নিঃশব্দে সেখানে অবস্থান করেন। কারও চোখ ছিল অশ্রুসিক্ত। কেউ কেউ দোয়া করেছেন। বিএনপি কর্মী রিয়াদুল ইসলাম বলেন, খালেদা জিয়ার অসুস্থতার সংবাদ শোনার পর আমরা আর ঘরে থাকতে পারিনি। যেহেতু তাকে শেষবারের মতো দেখার সুযোগ নেই তাই সবাই বাইরে অপেক্ষা করেছে। সবার চোখই ছিল অশ্রুসিক্ত। 

বুধবার ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয় গণতন্ত্রকামী নেত্রী খালেদা জিয়ার জানাজা। তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে মানিক মিয়া এভিনিউ ও এর আশপাশের এলাকা লোকে  লোকারণ্য হয়ে যায়। সারা দেশ থেকে ছুটে আসেন বিএনপি’র নেতাকর্মীরা। এ ছাড়া রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সম্পন্ন এই জানাজায় উপস্থিত হন বিভিন্ন দলের নেতাকর্মী, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও সর্বস্তরের জনগণ। খালেদা জিয়ার জানাজায় বিভিন্ন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, কূটনীতিক ও রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদার ব্যক্তিবর্গরাও অংশ নেন। এতে খালেদা জিয়ার রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার ও দেশ ছাপিয়ে তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টিকেই স্পষ্ট করে। যদিও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মত- এই শোকাবহের বাইরেও খালেদা জিয়ার মৃত্যু এমন গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে বিএনপি’র জন্য রাজনৈতিক ভাঙনের চিন্থ।

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের তারিখ নির্ধারিত হয়েছে আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি। ভোটকে কেন্দ্র করে বিএনপি এমন এক সময় নির্বাচনী প্রচারণা করছে যখন তাদের সঙ্গে দলটির ঐক্যের প্রতীক খালেদা জিয়া নেই। তার মৃত্যু দলটিকে কার্যত ‘খালেদা-পরবর্তী’ যুগে ঠেলে দিয়েছে। ফলে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে  শেখ হাসিনার পতন ও আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ-পরবর্তী রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান মজবুত করতে এবং নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে বিএনপি। যেখানে কর্তৃত্ব এবং জবাবদিহিতা খালেদাপুত্র ও বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ওপর কেন্দ্রীভূত।

খালেদার অনুপস্থিতিতে উত্তরাধিকার রক্ষার পরীক্ষায় তারেক: কয়েক দশক ধরে আনুষ্ঠানিক নেতৃত্বের বাইরেও বেশ প্রাসঙ্গিক ছিলেন খালেদা জিয়া। এমনকি যখন তিনি সম্মুখ রাজনীতির বাইরে ছিলেন, তখনো দলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হিসেবে ভূমিকা পালন করেছেন তিনি। যা দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ঠেকিয়ে নেতৃত্বের সংঘাত এড়াতে সাহায্য করেছে। তারেক রহমানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন আল জাজিরাকে বলেন, বাংলাদেশ একজন প্রকৃত অভিভাবককে হারিয়েছে। তিনি খালেদা জিয়াকে সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের এক ঐক্যবদ্ধ প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, বিএনপি যদি নির্বাচিত হয় তাহলে তাদের নীতি ও সুশাসনের অগ্রাধিকারের মাধ্যমে খালেদা জিয়ার উত্তরাধিকারকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে। মাহদী আমিন বলেন, তার রাজনীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল একটি শক্তিশালী সংসদীয় গণতন্ত্র। যেখানে আইনের শাসন, মানবাধিকার এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। তিনি আরও যোগ করেন, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত খালেদা জিয়ার দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে যেসব প্রতিষ্ঠান ও অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে- বিএনপি সেগুলো পুনরুদ্ধার করতে চায়। আমিন বলেন, তারেক রহমান ইতিমধ্যে তার নেতৃত্বকে সুসংহত করেছেন। হাসিনাবিরোধী আন্দোলন সমন্বয় এবং ভোটাধিকার ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিতে তারেক রহমানের ৩১ দফা সংস্কার কর্মসূচি প্রণয়নের কথা উল্লেখ করেন তিনি।

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে সেই প্রতীকী কর্তৃত্বের বলয়টি সরে গেছে। যা দীর্ঘদিন বিএনপি’র অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করেছে। লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত ক্যারিশমা দলকে চাঙ্গা এবং ঐক্যবদ্ধ রাখতে মূল ভূমিকা পালন করে। তিনি বলেন, এখন সেই ছন্দে ব্যাঘাত ঘটবে। তারেক রহমানকে এখন একটি প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে নিজের নেতৃত্ব প্রমাণ করতে হবে। তার নেতৃত্ব এখনো পরীক্ষিত নয়।

নির্বাচনের কঠিন ময়দান: বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক আবহে চ্যালেঞ্জগুলো বিএনপি’র জন্য এখন আরও কঠিন। তিন দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতি মূলত আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি’র মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার ওপর নির্ভরশীল ছিল। ১৯৯০ সালে সামরিক শাসনের পতনের পর এই ধারা শুরু হয় এবং ৯০ ও ২০০০-এর দশকের নির্বাচনগুলোতে তা আরও প্রকট হয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন। ইউনূস সরকার আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করায় সেই দ্বিদলীয় আধিপত্য এখন ভেঙে পড়েছে। এখন বিএনপিকে অনেক বেশি প্রতিযোগিতামূলক ময়দানে লড়তে হচ্ছে। যেখানে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন একটি শক্তিশালী জোট সক্রিয়। এই জামায়াত-ঘনিষ্ঠ জোটে যুক্ত হয়েছে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়া তরুণ নেতাদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।

এই জোট বিএনপি’র জন্য সহজ হবে না বলে মনে করেন বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেছেন, চব্বিশের জুলাই-পরবর্তী রাজনীতি এখন সমীকরণ বদলে দিয়েছে। নতুন মেরূকরণ তৈরি হচ্ছে এবং দুই দলের সেই একচেটিয়া আধিপত্য আর অবশিষ্ট নেই। বিশ্লেষকরা কিছু অনিশ্চয়তার দিকেও আঙ্গুল তুলেছেন। সময়মতো নির্বাচন হবে কিনা সেই সংশয় এখনো পুরোপুরি কাটেনি। এ ছাড়া নির্বাচন কি শান্তিপূর্ণভাবে হবে? অথবা বড় দলগুলো কি এই প্রক্রিয়ায় জনগণের আস্থা নিশ্চিত করতে পারবে?

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী বলেন, খালেদা জিয়া কেবল তার দলের জন্য নন, বরং দেশের জন্যও একজন অভিভাবক হিসেবে কাজ করেছিলেন। তার মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতিতে একজন জ্যেষ্ঠ এবং স্থিতিশীল ব্যক্তিত্বের বিদায়কে নির্দেশ করে। এদিকে তারেক রহমান ২০০৮ সাল থেকে যুক্তরাজ্যে নির্বাসনে ছিলেন। তিনি ২০২৫ সালের ২৫শে ডিসেম্বর দেশে ফেরেন। দিলারা চৌধুরী মনে করেন, তারেক রহমানের দেশে ফিরে আসা দলের ভেতরে অভ্যন্তরীণ বিভক্তির আশঙ্কা কমিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী শক্তি পুনর্নিশ্চিত করা, স্বৈরতন্ত্রকে প্রত্যাখ্যান এবং ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দেয়া তার সামপ্রতিক ভাষণগুলো দলের সমর্থকদের আদর্শিক ধারাবাহিকতা সম্পর্কে আশ্বস্ত করেছে। তিনি বলেন, বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ উভয়ই ব্যক্তিকেন্দ্রিক দল। খালেদা জিয়ার পর তারেক রহমান স্বাভাবিকভাবেই বিএনপি’র সেই জায়গায় উঠে এসেছেন।

উত্তরাধিকার থেকে জনমত: বিএনপি নেতারা স্বীকার করেছেন, কেবল উত্তরাধিকারই দলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের জন্য যথেষ্ট নয়। প্রায়ই দলটির কিছু নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠছে। মাহদী আমিন এই বিষয়টিকে ‘অতিরঞ্জিত’ বলে বর্ণনা করে বলেন, কঠোর অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দলটি এই সমস্যা সমাধানের পরিকল্পনা করছে। কক্সবাজার জেলা যুবদলের এক নেতা বলেন,  কোনো সমস্যা হবে না- এমন কথা বলা যৌক্তিক নয়। অতীতে খালেদা জিয়া বা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে কাজ করা সিনিয়র নেতাদের মধ্যেও দ্বিমত হয়েছিল। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এটি একটি চ্যালেঞ্জ হতে পারে। তবে আমি বিশ্বাস করি, তারেক রহমান এটি সামলে নিতে পারবেন।

তবে বিএনপি’র সিনিয়র নেতাদের মধ্যে তারেক রহমানের  নেতৃত্ব নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ইতিমধ্যেই তারেক রহমানের নেতৃত্বের যোগ্যতা প্রমাণিত হয়েছে। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, তার নেতৃত্ব প্রমাণিত। তিনি কার্যকরভাবে দল পরিচালনার সক্ষমতা রাখেন। 

বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের প্রস্তুতি নেয়ার সময় দলে শৃঙ্খলা বজায় রাখা, সংস্কার পরিকল্পনা তুলে ধরা এবং একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচনে অবদান রাখার মতো বিষয়গুলোই হবে তারেক রহমানের নেতৃত্বের আসল পরীক্ষা।

অনেক সমর্থকের কাছে রাজনীতি এখনো অত্যন্ত ব্যক্তিগত একটি আবেগ। ৫৭ বছর বয়সী দুলাল মিয়া কিশোরগঞ্জ থেকে ২৫শে ডিসেম্বর তারেক রহমানের সংবর্ধনা সমাবেশে যোগ দেন। এখনো আজীবনের জন্য বিএনপি’র সমর্থক হওয়ার স্মৃতি স্মরণ করেন তিনি। ১৯৭৯ সালে দুলাল যখন ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র, তখন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তার কৃষিজমি পরিদর্শনে এসে তার সঙ্গে হাত মেলান। জিয়াউর রহমান খাল খনন কর্মসূচির মাধ্যমে খরা মোকাবিলা এবং প্রটোকল ছাড়াই খালি পায়ে দুর্গম এলাকায় ঘুরে বেড়ানোর জন্য স্মরণীয় হয়ে আছেন। দুলাল মিয়া বলেন, তারেক রহমানকে তার বাবা-মায়ের উত্তরাধিকার বহন করতে হবে। যদি তিনি তা না করেন, মানুষ মুখ ফিরিয়ে নেবে। বিএনপি’র রাজনীতি হলো জনগণের রাজনীতি। যা জিয়াউর রহমান শুরু করেছিলেন এবং খালেদা জিয়া আজীবন লালন করে গেছেন। আমি বিশ্বাস করি, তারেক রহমানও তাই করবেন।