নজিরবিহীন জনসমাগমে শেষ বিদায় জানানো হয়েছে বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে। তাকে শ্রদ্ধা জানাতে বুধবার সারা দেশ থেকে ছুটে এসেছিলেন লাখ লাখ মানুষ। এদিন জানাজায় অংশ নিলেও কবরে শ্রদ্ধা জানানো বা কবর জিয়ারতের সুযোগ ছিল না। তাই গতকাল সাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়ার পর বেগম জিয়ার কবরে ঢল নামে সাধারণ মানুষের। ফুল হাতে শ্রদ্ধা জানাতে যাওয়া সাধারণ মানুষদের অনেককে বেগম জিয়ার মাগফেরাত কামনা করে মোনাজাতে কাঁদতে দেখা যায়। কেউ তেলাওয়াত করছিলেন। কেউ মোনাজাতে হাত তোলেন।
গতকাল সকালে কাউকে জিয়া উদ্যানে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। এ সময় উদ্যানের চারপাশে ভিড় জমাতে থাকে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ও বিএনপি’র দলীয় নেতাকর্মীদের।
সরজমিন দেখা যায়, বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই খালেদা জিয়ার কবরে শ্রদ্ধা জানাতে আসেন সর্বস্তরের মানুষ। বেলা সাড়ে ১২টার দিকে সর্বসাধারণের প্রবেশের জন্য উন্মক্ত করে দেয়া হয় সমাধিস্থল। এ সময় বেগম খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করতে থাকেন সাধারণ মানুষ। অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়ে অনেকে, নীরবে দাঁড়িয়ে দোয়া করতে থাকেন কেউ কেউ। শোক ও শ্রদ্ধার আবহে অনেকে দোয়া ও মোনাজাতে অংশ নেন। সকালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রবেশপথ বন্ধ রাখায় বেশির ভাগ মানুষ বাইরে দাঁড়িয়েই দোয়া করেন। সকালে কবর জিয়ারত করতে যান সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর। তিনি বলেন, আজকে আমার আবেগ, অনুভূতি থেকে আমার নেত্রী ও আমার নেতার কবর জিয়ারত করতে এসেছি। আমার মন চেয়েছে, এটা কোনো রাজনীতিক পরিকল্পনা নয়। আমাদের নেত্রীর সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার সুযোগ আমি পেয়েছি। তখন উনি দেশপ্রেমের বিষয়ে কখনো আপস করেননি। দেশে মানুষের জান-মালের নিরাপত্তার বিষয়ে তিনি কখনো আপস করেননি। এমন দেশপ্রেম আর কারোর মধ্যেই আমি পাইনি। উনার ছেলের মধ্যে উনার স্বামীর মতোই গুণ রয়েছে।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার দিকে জিয়া উদ্যানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কবর জিয়ারত করতে আসেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গাড়ি থেকে নেমে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত এবং কিছু সময় দাঁড়িয়ে দোয়া-মোনাজাত করেন তিনি। তবে সমাধিস্থল থেকে বেরিয়ে তিনি কোনো কথা বলেননি।
সরজমিন দেখা যায়, দিনভর সমাধিস্থলে কোরআন তিলাওয়াত ও দোয়া-মোনাজাত করতে থাকেন সাধারণ মানুষ। কবর জিয়ারত শেষে উপস্থিত সাধারণ মানুষ তাদের আবেগ-অনুভূতির কথা জানান এবং বেগম জিয়ার রুহের মাগফিরাত কামনায় দোয়া করেন। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনও শ্রদ্ধা নিবেদন করে। কেউ অশ্রুসিক্ত নয়নে প্রিয় নেত্রীর স্মৃতি স্মরণ করেন, কেউ পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শ্রদ্ধা জানান। সমাধি কমপ্লেক্সের চারপাশ ফুলে ফুলে ভরে ওঠে। দুপুর ২টার পর থেকে জিয়া উদ্যান যেন পরিণত হয় এক বিশাল মিলনমেলায়। কবর জিয়ারত শেষে অনেককে দেখা যায় নীরবে দাঁড়িয়ে স্মৃতিচারণা করতে, আবার কেউ আশপাশে ঘুরে দেখছেন। অনেক পরিবার তাদের ছোট শিশুদেরও সঙ্গে নিয়ে এসেছেন।
উপস্থিত অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কেউ এসেছেন ঢাকার বাইরে দূরের জেলা থেকে, কেউ অফিসে যাওয়ার পথে একটু সময় বের করে, আবার কেউ দৈনন্দিন কাজের ফাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে হাজির হয়েছেন প্রিয় নেত্রীর সমাধিতে। সকাল পেরিয়ে দুপুর, বিকাল হয়ে সন্ধ্যা-দিনভরই মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে বিকাল ২টার পর থেকে কবর জিয়ারতকারী মানুষের সংখ্যা আরও বাড়তে থাকে। ভিড়ের মধ্যেই চোখে পড়ে ৫ থেকে ১০ বছর বয়সী অনেক শিশু। তারা কৌতূহলভরে বাবা-মা ও পরিবারের বড়দের কাছে জানতে চাইছে, বেগম খালেদা জিয়ার পাশেই থাকা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কবর সম্পর্কে।
১০ বছর বয়সী সাইদা হক জান্নাত পাবনার ইশ্বরদী থেকে এসেছেন বাবার সঙ্গে খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করতে। জান্নাতের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, বাবার সঙ্গে কবর জিয়ারত করতে এসেছি। গতকাল টিভিতে দেখেছিলাম। আজকে সকালে বাবার সঙ্গে ঢাকায় এসেছি কবর জিয়ারত করার জন্য।
এদিন জিয়া উদ্যানে একটি ব্যতিক্রমী দৃশ্যও নজর কাড়ে অনেকের। বেগম খালেদা জিয়ার কবরের উল্টো পাশে দেয়াল ঘেঁষে কোরআন তিলাওয়াত করতে দেখা যায় সাতক্ষীরা জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক এসএম মিলনকে। তিনি জানান, সকাল থেকেই মানুষ এখানে কবর জিয়ারত করতে আসছেন। আমি কোরআন তিলাওয়াত করছি আমাদের নেত্রীর জন্য। মহান আল্লাহ যেন আমাদের দেশনেত্রী, গণতন্ত্রের মা বেগম খালেদা জিয়াকে জান্নাত নসিব করেন।
জিয়া উদ্যানে আসা মানুষের মধ্যে কথা হয় রাজবাড়ী থেকে ঢাকায় আত্মীয় বাড়িতে বেড়াতে আসা আকলিমা খাতুনের সঙ্গে। তিনি বলেন, যখন বেগম জিয়ার মৃত্যুর খবরটা শুনি। তখন মনটা খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল। ঢাকায় আসার সুযোগ পেয়ে মনে হলো, একবার হলেও কবর জিয়ারত করে দোয়া করি। তিনি শুধু একজন রাজনৈতিক নেত্রী ছিলেন না, একজন শক্ত নারী নেতৃত্বের প্রতীক ছিলেন।
ঢাকার খামারবাড়ি থেকে এসেছেন নিলুফার সুলতানা। তিনি এককজন শিক্ষিকা। জিয়া উদ্যানে বেগম জিয়ার কবর দেখতে এসে তিনি বলেন, অল্প বয়সে উনার (খালেদা জিয়ার) স্বামী মারা যায়। দুই সন্তানকে নিয়ে সংগ্রাম করেছেন। এরপর গত ১৫ বছরের তিনি যে কষ্ট পেয়েছেন, ত্যাগ স্বীকার করেছেন সেটা দেশবাসী দেখেছেন। খালেদা জিয়া এই দেশের মানুষের অভিভাবক ছিলেন। দেশের মানুষও তাকে ভালোবাসতো, খালেদা জিয়ার জানাজায় সেই ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ হয়েছে। পঞ্চগড় থেকে এসেছেন বিএনপি নেতা জাহিরুল ইসলাম কাচ্চু। খালেদা জিয়ার জন্মস্থান থেকে এসেছেন গোলাম সরওয়ার মিলন। তিনি বলেন, শেষবারের মতো বেগম জিয়াকে দেখে গেলাম। তার দর্শন সবার জন্য শিক্ষণীয়।
খালেদা জিয়ার জীবন-সংগ্রাম ধারণ করে সবাইকে এগিয়ে যেতে হবে। নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা গোলাম মাওলা বলেন, গতকাল বেগম জিয়ার কবর আমরা দেখতে পারিনি। গতকালের জানাজায় দেশের লাখ লাখ মানুষ এসেছে। খালেদা জিয়া মানেই বাংলাদেশ, বাংলাদেশের গণতন্ত্র। খালেদা জিয়া আমাদের ছায়া ছিল। তার চলে যাওয়া হয়তো দেশের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি তারেক রহমান যেহেতু এসেছেন তিনি দেশকে আগলে রাখবেন বলে আমরা আশা করি।
চট্টগ্রাম থেকে আসা দক্ষিণ জেলা যুবদলের দপ্তর সম্পাদক মামুনুর রশিদ মামুন মানবজমিনকে বলেন, আমরা এসেছি একসঙ্গে, অনেকে মিলে এসেছি কবর জিয়ারত করতে। তিনি দেশের জন্য যা কিছু করেছেন তা বর্ণনাতীত।
বিএনপি’র স্থানীয় নেতাকর্মীরাও স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে উপস্থিত থেকে সারিবদ্ধভাবে ভিড় নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে দেখা যায়। আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবি’র সদস্যদের দেখা যায়।
পুলিশ জানায়, শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পর্যায়ক্রমে সীমিত সংখ্যক মানুষকে প্রবেশের সুযোগ দেয়া হচ্ছে। সন্ধ্যা ৬টার দিকেই সমাধিস্থলে প্রবেশ বন্ধ করে দেয়া হতে পারে।