বিদায়ী ২০২৫ সাল বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে এক অনন্য ও ঘটনাবহুল বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। সংবিধানিক কাঠামো থেকে শুরু করে রাজনৈতিক বাস্তবতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। সবকিছু মিলিয়ে এ বছর সুপ্রিম কোর্ট একের পর এক যুগান্তকারী রায় ও আদেশ দিয়েছে। যা রাষ্ট্র পরিচালনার বহু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে।
দীর্ঘ দুই যুগের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের চূড়ান্ত ধাপ হিসেবে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের যাত্রা শুরু, নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল, অধস্তন আদালতের ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়া, রাজনৈতিক দলগুলোর নিবন্ধন ও প্রতীকের প্রশ্নে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত, পাশাপাশি বহুল আলোচিত ফৌজদারি ও রাজনৈতিক মামলার রায়। সব মিলিয়ে ২০২৫ সাল সুপ্রিম কোর্টকে এনে দিয়েছে বিশেষ উচ্চতা।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল
বিদায়ী বছরের ২০ নভেম্বর নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের রায়কে অবৈধ ঘোষণা করেন আপিল বিভাগ। একইসঙ্গে ত্রয়োদশ সংশোধনীকে বৈধ ঘোষণা করে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল করা হয়।
প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে সাত বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ আপিল বেঞ্চ সর্বসম্মতিক্রমে এ ঐতিহাসিক রায় দেন। রায়ে বলা হয়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে হলেও চতুর্দশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা কার্যকর হবে।
সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ সংশোধনী বাতিল
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণে আরেকটি মাইলফলক রায় আসে ২ সেপ্টেম্বর। বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাবিধান সংক্রান্ত সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে বাহাত্তরের মূল সংবিধান বহাল রাখেন হাইকোর্ট। ফলে অধস্তন আদালতের বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলা বিধানের পূর্ণ ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের হাতে ফিরে আসে। রায়ে তিন মাসের মধ্যে পৃথক বিচার বিভাগীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশনাও দেওয়া হয়।
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের যাত্রা
এই রায়ের ধারাবাহিকতায় ১১ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে বহু প্রতীক্ষিত সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ বলেন, ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষায় রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সম্মিলিত প্রয়াস অপরিহার্য। এটি বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বতন্ত্রীকরণের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।’
২৫তম প্রধান বিচারপতির বিদায়
২০২৫ সাল বিচার বিভাগের ইতিহাসে স্মরণীয় থাকবে আরেকটি কারণে—এই বছরই অবসরে গেছেন বাংলাদেশের ২৫তম প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর হাইকোর্টের বিচারপতি থেকে সরাসরি প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পাওয়া এই বিচারপতি দায়িত্ব পালনকালে সাহসী ও সংস্কারমুখী নেতৃত্বের স্বাক্ষর রাখেন।
জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন ও প্রতীক ফিরে পাওয়া
১ জুন রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণার হাইকোর্টের রায় বাতিল করেন আপিল বিভাগ। একইসঙ্গে দলটির নিবন্ধন ও প্রতীক ‘দাঁড়িপাল্লা’ ফিরে পায় জামায়াতে ইসলামী। এই রায় দেশের রাজনীতিতে বড়ধরনের প্রভাব ফেলে।
রাজনৈতিক ও আলোচিত মামলার গুরুত্বপূর্ণ রায়
২০২৫ সালে রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল বহু মামলায় উচ্চ আদালত গুরুত্বপূর্ণ রায় দেয়—
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান খালাস। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় তারেক রহমান ও বাবরসহ সব আসামির খালাস বহাল।
মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায়জামায়াত নেতা এটিএম আজহারুল ইসলাম মৃত্যুদণ্ড থেকে খালাস। মেজর সিনহা হত্যা মামলায় ওসি প্রদীপসহ আসামিদের সাজা বহাল। আবরার ফাহাদ হত্যা মামলায় ২০ আসামির মৃত্যুদণ্ড ও ৫ জনের যাবজ্জীবন বহাল। বিশেষ করে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির আপিল বিভাগে খালাস পাওয়াকে বিচার বিভাগের ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সামাজিক ও প্রশাসনিক গুরুত্বপূর্ণ রায়
এছাড়া বিয়ে ও তালাক নিবন্ধন ডিজিটালাইজেশনের নির্দেশ, বাগেরহাটের চারটি সংসদীয় আসন পুনর্বহালের রায়, চট্টগ্রাম বন্দর পরিচালনা নিয়ে দ্বিধা-বিভক্ত রায়। এসব সিদ্ধান্তও বছরজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল।
২০২৫ সাল শুধু একটি বছর নয়, বরং বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে একটি টার্নিং পয়েন্ট। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সাংবিধানিক ভারসাম্য ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সুপ্রিম কোর্ট যে সাহসী ভূমিকা রেখেছে, তা দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, ততদিন বিচারাঙ্গনে ২০২৫ সালের এই অধ্যায় মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হবে।