Image description
বিডিআর বিদ্রোহ ► জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন ► জড়িত আওয়ামী লীগ সমন্বয়কারী তাপস

পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গ্রিন সিগন্যালেই বিডিআর (বাংলাদেশ রাইফেলস) হত্যা সংঘটিত হয়েছে। জাতির ইতিহাসে ন্যক্কারজনক এ ঘটনায় দায়ীদের রক্ষা করতে দলগতভাবে জড়িত ছিল আওয়ামী লীগ। মূল সমন্বয়কারীর দায়িত্বে ছিলেন পতিত সরকারের তৎকালীন সংসদ সদস্য শেখ ফজলে নূর তাপস। বহুল আলোচিত বর্বর এ হত্যাযজ্ঞের তদন্তে গঠিত জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ভয়াবহ এসব তথ্য। কমিশনের প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমানসহ অন্য সদস্যরা রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় গতকাল প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তাদের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। এ সময় কমিশনের সদস্য মেজর জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর কবির তালুকদার (অব.), ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সাইদুর রহমান বীরপ্রতীক (অব.), যুগ্মসচিব (অব.) মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদ, ডিআইজি (অব.) ড. এম আকবর আলী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. শরীফুল ইসলাম এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক মো. শাহনেওয়াজ খান চন্দন উপস্থিত ছিলেন।

কমিশন প্রধান ফজলুর রহমান বলেন, তদন্তকাজ সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও ত্রুটিমুক্ত করার স্বার্থে সর্বোচ্চ পেশাদারি বজায় রাখা হয়েছে। আমরা যখন কাজ শুরু করি তখন ১৬ বছর আগের এ ঘটনার বহু আলামত ধ্বংস হয়ে গেছে। এ ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত অনেকে বিদেশে চলে গেছেন। কমিশন দুটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাক্ষীদের কারও কারও আট ঘণ্টা পর্যন্ত বক্তব্য শুনেছি আমরা। যতক্ষণ তিনি বলতে চেয়েছেন। যারা তদন্তে জড়িত ছিলেন, তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। তাদের তদন্তের রিপোর্ট সংগ্রহ করেছি। প্রয়োজনীয় অন্যান্য উপকরণও সংগ্রহ করা হয়েছে। তিনি বলেন, এ তদন্তের মাধ্যমে বিডিআর হত্যা নিয়ে জনমনে থাকা প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়েছে। উদ্ঘাটনের চেষ্টা করা হয়েছে কার কী ভূমিকা ছিল। কেন সেনাবাহিনী দাঁড়িয়ে থাকল। অ্যাকশন নিল না। তদন্তে বিডিআর হত্যায় বহিঃশক্তির সরাসরি সম্পৃক্ততা ও তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সরাসরি জড়িত থাকার শক্তিশালী প্রমাণ মিলেছে।

জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশনের সদস্যদের উদ্দেশে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বিডিআর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জাতি দীর্ঘদিন ধরে অন্ধকারে ছিল। আপনারা সত্য উদ্ঘাটনে যে ভূমিকা রেখেছেন, জাতি তা স্মরণে রাখবে। জাতির পক্ষ থেকে আপনাদের প্রতি ধন্যবাদ জানাচ্ছি। তিনি বলেন, ইতিহাসের এ ভয়াবহতম ঘটনা নিয়ে জাতির অনেক প্রশ্ন ছিল। এ কাজের মধ্য দিয়ে সেসব প্রশ্নের অবসান ঘটবে। এ প্রতিবেদনে শিক্ষণীয় বহু বিষয় এসেছে। জাতির জন্য মূল্যবান সম্পদ হয়ে থাকবে এটি। কমিশনের ফাইন্ডিংস সম্পর্কে জাহাঙ্গীর কবির তালুকদার বলেন, কিছু বাহ্যিক ও প্রকৃত কারণ বের করেছে কমিশন। এ হত্যা পরিকল্পিত এবং এর পেছনে প্রধান সমন্বয়কের ভূমিকায় ছিলেন তৎকালীন সংসদ সদস্য শেখ ফজলে নূর তাপস। পুরো ঘটনাটি সংঘটিত করার ক্ষেত্রে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গ্রিন সিগন্যাল ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, জড়িতদের রক্ষা করতে স্থানীয় আওয়ামী লীগ সরাসরি ভূমিকা রেখেছে। তারা ২০-২৫ জনের মিছিল নিয়ে পিলখানায় ঢুকেছে এবং বের হওয়ার সময় সেই মিছিলে দুই শতাধিক মানুষ ছিল। পুরো ঘটনার দায় নিরূপণের সমীকরণ টেনে তিনি বলেন, ঘটনার দায় তৎকালীন সরকারপ্রধান থেকে শুরু করে সেনাপ্রধানেরও।

পুলিশ, র‌্যাব এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোরও চরম ব্যর্থতা ছিল। এই ঘটনাকে রাজনৈতিকভাবে সমাধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ওই ঘটনার সময় কিছু প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং কয়েকজন সাংবাদিকের ভূমিকা ছিল অপেশাদার। তিনি বলেন, ওই হত্যার সময় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় (তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন) যেসব বিডিআর সদস্যের সঙ্গে শেখ হাসিনা বৈঠক করেছেন, তাদের সঠিক নাম-পরিচয় ও তথ্য সংরক্ষণ করা হয়নি। ভবিষ্যতে বাহিনীগুলোর মধ্যে এ ধরনের বিপর্যয় ঠেকাতে এবং ভিকটিমদের ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করতে প্রতিবেদনে একাধিক সুপারিশও করেছে কমিশন।

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান, প্রধান উপদেষ্টার প্রতিরক্ষা ও জাতীয় সংহতি উন্নয়নবিষয়ক বিশেষ সহকারী লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আবদুল হাফিজ এবং স্বরাষ্ট্র সচিব নাসিমুল গনি। প্রসঙ্গত, গত বছর ২৩ ডিসেম্বর রাজধানীর পিলখানায় তৎকালীন বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) সদর দপ্তরে ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি নৃশংস হত্যাযজ্ঞের তদন্তে সাত সদস্যের স্বাধীন জাতীয় কমিশন গঠন করা হয়। বিডিআরের সাবেক মহাপরিচালক এ  এল এম ফজলুর রহমানকে সভাপতি করে এ কমিশন গঠন করা হয়।

তদন্ত কমিশনের অন্য সদস্যরা হলেন, সামরিক বাহিনীর দুজন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক, সিভিল সার্ভিসের একজন ও পুলিশের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা।