বিকাশ প্রতারণা, হুন্ডিতে টাকা পাচার, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, অপরিচিত নম্বর থেকে জীবননাশের হুমকি বা অপহরণের মুক্তিপণ আদায়। প্রতিদিনই ঘটছে এমন শত শত অপরাধের ঘটনা। এসব অপরাধে ব্যবহার করা হচ্ছে ‘অনিবন্ধিত’ মোবাইল ফোন। ফলে বেশির ভাগ ঘটনায়ই অপরাধীরা থেকে যাচ্ছে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। ‘অনিবন্ধিত’ মোবাইল ফোনের আইএমইআই নম্বর দেশের রেগুলেটরি সার্ভারে নিবন্ধিত না থাকায় অপরাধীদের শনাক্ত করতে বেগ পেতে হচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)-এর এডিশনাল ডিআইজি মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, যখন একটা ফোন চুরি হয়ে যায় বা ছিনতাই হয়ে যায় বা খুঁজে পাওয়া যায় না সেগুলোতো আনএটেন্ডেন্ট থাকে। ট্র্যাক করে সেগুলো বের করা লাগে। আর এটা আমরা করি ডিউ টু আইএমইআই। এখন অবৈধভাবে যদি কোনো ফোন ব্যবহার করে তাহলে ট্র্যাক করে এটা খুঁজে পাওয়া খুব জটিল হয়ে যায়। তিনি বলেন, যারা বিকাশ প্রতারক তারা কিন্তু এসব মোবাইল ফোন ব্যবহার করে। তাদের টাকাগুলো ট্রান্সফার হয়ে বিকাশ থেকে ব্যাংকে যাচ্ছে। ব্যাংক থেকে আরেকটা ব্যাংকে যাচ্ছে। সেখান থেকে আরেকটা ব্যাংকে, আল্টিমেট ডেস্টিনেশন হুন্ডিওয়ালার একাউন্টে যাওয়ার পরে টাকাগুলো আবার ডলারে কনভার্ট হয়ে বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। এতে আমাদের অর্থনীতির ব্যাপক ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে। অনেক সময় আবার আমাদের মোবাইলে ফিশিং লিংক আসে। লিংকে ক্লিক করলেই আপনার সকল ইনফরমেশন অন্যের কাছে চলে যায়। আর এ সবই হচ্ছে চোরাই বা অনিবন্ধিত ফোন দিয়ে।
পুলিশের এই অতিরিক্ত ডিআইজি বলেন, এখন চোরাই বা অনিবন্ধিত ফোনগুলো সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে মানুষকে হুমকি দেয়ার জন্য। গতকালই নাসিরউদ্দিন নামে এক ভদ্রলোককে একটি অচেনা নম্বর থেকে তার ছেলে-মেয়েকে অপহরণ করার হুমকি আসে। তার বাসা লালবাগে। পরে আমরা খোঁজ নিয়ে জানতে পারি ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে তার ফোনে ফোন দিয়ে হুমকি দেয়া হয়েছে। পরে তাকে জায়গার নামটা বলতেই তিনি বুঝে ফেলেন, তার বাসার পাশের লোকই এটা করিয়েছে। এদিকে বিভিন্ন মেয়েদের ছবিও কিন্তু এডিট করে ভিডিও বানিয়ে ব্ল্যাকমেইলসহ আরও অনেক কিছু করা হচ্ছে। কিছুদিন আগেও উত্তরায় একটি বাচ্চা মেয়ের সঙ্গে এমনটা করা হয়েছে। আবার একজনের নাম-ছবি ব্যবহার করে তার স্বজনকে ফোন দিয়ে বলে- ওই নাম্বারটা আমার লক হয়ে গেছে, আমি এয়ারপোর্টে বিপদে পড়ছি কিছু টাকা পাঠাও এভাবে বিভিন্নভাবে প্রতারণা হচ্ছে। এই জন্য আমাদের দেশের গ্রে মার্কেটে যে হ্যান্ডসেটের আদান-প্রদান এবং যে ব্যবসা-বাণিজ্য হয় এটাকে প্রতিহত করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, আমরা হারানো মোবাইল বা মিসিং ফোনগুলো আগে খুব বেশি উদ্ধার করতে পারতাম। কিন্তু এখন এগুলোর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ আমাদের যে মোবাইলগুলো হারিয়ে যাচ্ছে বিশেষ করে দামি ফোনগুলো, সেগুলো আমাদের দেশ থেকে লাগেজে পার্টির মাধ্যমে আখাউড়া, দর্শনা, বেনাপোল, মৌলভীবাজার এসব সীমান্ত দিয়ে দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। যার জন্য আমাদের আউট অব ট্র্যাক চলে যাচ্ছে। ঠিক সেভাবেই দেশের বাইরে থেকে অনেক সেকেন্ড হ্যান্ড ফোন আসছে। কেউ কেউ লাগেজ ভর্তি সিঙ্গাপুর গিয়ে পুরাতন ফোন দিয়ে নতুন ফোন এক্সচেঞ্জ করে নিয়ে আসছে। যেগুলোর ওয়ারেন্টি আছে সেগুলো নিয়ে সমস্যা না হলেও পাশের দেশের কলকাতা, আগরতলা থেকে যে ইউজ বা চুরি-ছিনতাই হওয়া, হারানো ফোনগুলো আমাদের দেশে ঢুকছে। আবার আমাদের অনেক ম্যানপাওয়ার আছে মধ্যপ্রাচ্যে, তারা এমপ্লয়ী কার্ড দিয়ে মোবাইল কিনে অভাবে পরে আবার বিক্রি করে দেয়। বাঙালি দোকানির মাধ্যমে সেগুলোও আমাদের দেশে চলে আসে। সেগুলো খুঁজে পেতে আমাদের কিন্তু ঝক্কি পোহাতে হয়। আবার চুরি যাওয়া বা ছিনতাই হওয়া ফোনগুলো পাচার হওয়ার পাশাপাশি এখন স্পেয়ার পার্টস খুলে আমাদের দেশের দোকানে দোকানে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। তখন আমরা আইএমইআই ট্র্যাক করে এটা পাচ্ছি না। তিনি বলেন, দেশে সেকেন্ড হ্যান্ড ফোন দ্রুত বিক্রি হয়ে যায়। এর পেছনেও কারণ আছে। কারা এই ফোনগুলো বেশি ব্যবহার করছে। এসব অপরাধ প্রবণতা আমরা যদি বন্ধ করতে না পারি তাহলে অপরাধ বৃদ্ধি পাবে। কারণ রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে আমাদের দেশে ক্রস ম্যাচিংটা হয় না। তাই এইগুলো রোধে সীমান্তের মোবাইল দোকানগুলোতে নজর দেয়ার পাশাপাশি দেশের সকল মোবাইল ফোনগুলোকে নিবন্ধনের (এনইআইআর প্রকল্প) তালিকায় নিয়ে আসতে হবে। তাহলে আমার মার্কেটটা ক্যাপচার করতে পারবো। তখন সকল ফোনের তথ্য ডাটাবেজে অটো আপডেট হয়ে যাবে।
বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ মোবাইল ফোন ডিস্ট্রিবিউশন এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল হারুন রাজু বলেন, বসুন্ধরা সিটি ও যমুনা ফিউচার পার্কে কিছু রিটেইলার আছেন। আর চট্টগ্রামে দুইটা মার্কেটে কিছু রিটেইলার আছে। এই কয়েকটা মার্কেটে কিছু ব্যবসায়ী আছে যারা এই গ্রে বিজনেসে জড়িত। গত ৬/৭ বছর এই গ্রে চ্যানেলটা বেশি ডেভেলপ হয়ে আজকের এই জায়গাটায় এসেছে। আর বাংলাদেশের বর্ডার লাইনে (সীমান্ত) যে বাজারগুলো আছে সেগুলোর মাধ্যমে যেই চোরাই প্রোডাক্টটা আমাদের দেশে ঢুকছে সেটার ইম্প্যাক্ট আরও বেশি।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনার (স্পেকট্রাম বিভাগ) মাহমুদ হোসেন বলেন, আমি মনে করি একটা কোয়ালিটি অফ নেটওয়ার্ক প্রয়োজন। হ্যান্ডসেটের কোয়ালিটি কিন্তু আমার নেটওয়ার্কের কোয়ালিটিকে সরাসরি ইম্প্যাক্ট করে। কারণ আমাদের দেশে বিভিন্নভাবে চোরাই ফোন আসছে। যা আমাদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। আপনি ডিটেক্টই করতে পারবেন না অপরাধটা কে করছে। তাই আমাদের স্মার্টফোনের পেনিট্রেশন বাড়াতে হবে। সরকার যেই এনইআইআর প্রকল্পটি চালু করতে যাচ্ছে তার মাধ্যমে আমাদের দেশের সকল তথ্য নিবন্ধিত থাকবে। যা আমাদেরকে নিরাপত্তা দিবে।