Image description

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের সব প্রস্তুতি প্রায় শেষ করেছে নির্বাচন কমিশন। এবার ভোটের দিনক্ষণ নির্ধারণের পালা। ইতিমধ্যেই প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে তফসিল ঘোষণার কথা জানিয়েছেন। এদিকে নির্বাচনের সময় যতই ঘনিয়ে আসছে ততই পুরো আয়োজন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে একই দিনে সাধারণ ভোট ও গণভোট এবং নতুন সংযোজন প্রবাসী ভোট সবই যেন সংস্থাটির কাছে ‘অগ্নি পরীক্ষা’। 

ইসি’র সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, আসন্ন নির্বাচনের সব প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে হলেও তফসিল নিয়ে চিন্তিত কমিশনের ঊর্ধ্বতনরা। পুরো নির্বাচনী কার্যক্রম কবে কখন কোন দিনে বাস্তবায়ন করা হবে সেসব নিয়ে নিয়মিতই বৈঠক করছেন। সেজন্য নির্বাচনের তফসিল কতো তারিখে হবে এ নিয়ে জোর আলোচনাও চলছে সংস্থাটির কর্মকর্তাদের মধ্যে। সূত্র বলছে, তফসিলের জন্য দু’টি দিন আলোচনায় রয়েছে। একটি হলো ৮ই ডিসেম্বর এবং অন্যটি হলো ১১ই ডিসেম্বর। এই দুইদিনের যেকোনো দিনেই তফসিল ঘোষণা করতে পারে ইসি। 

এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে কথা হয় নির্বাচন কমিশনার (ইসি) আব্দুর রহমানেল মাছউদের সঙ্গে। তিনি বলেন, তফসিলে দিন তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। আমাদের আলোচনা চলছে। তবে ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহের প্রথম কয়েকদিনের মধ্যেই তফসিল ঘোষণা করা হবে। 
আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে সরকারের তরফ থেকে বলা হয়েছিল। তারপরই সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিনও জানিয়েছেন একই কথা। এবার এই নির্বাচনের সঙ্গে নতুন করে যোগ হয়েছে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে গণভোট। সে সঙ্গে পোস্টাল ভোটও রয়েছে ইসি’র কর্মপরিকল্পনায়। 

‘গণভোট অধ্যাদেশ-২০২৫’-এর খসড়া নীতিমালা অনুমোদন দিয়ে গণভোট পরিচালনা, গণনা ও প্রস্তুতিমূলক প্রক্রিয়ার বিধান নির্ধারণ করা হয়েছে। গত ২৫শে নভেম্বর অধ্যাদেশ জারির পর সংবাদ সম্মেলনে আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল জানান, জাতীয় নির্বাচনের যেসব কেন্দ্রে ভোট হবে, সেই কেন্দ্রেই গণভোট অনুষ্ঠিত হবে এবং দুই ফলাফল একসঙ্গে ঘোষণা করবে ইসি। একই ভোটার তালিকা ও একই কর্মকর্তাদের অধীনেই গণভোট পরিচালিত হবে। 

বাংলাদেশে এর আগে ১৯৭৭, ১৯৮৫ ও ১৯৯১ সালে তিনটি গণভোট হয়েছে। তবে কখনো জাতীয় নির্বাচনের দিনে গণভোট হয়নি। একদিনে দুই ভোটের সিদ্ধান্তের পর অপ্রত্যাশিতভাবে ইসি’র কর্মপরিধি দ্বিগুণ হয়ে গেছে। ইতিমধ্যে সীমানা পুনঃনির্ধারণ, ভোটকেন্দ্রের তালিকা, ভোটার তালিকা, নতুন রাজনৈতিক দল ও পর্যবেক্ষক সংস্থার নিবন্ধন ও প্রশিক্ষকদের প্রশিক্ষণ- সবই শেষ হয়েছে। ইসি’র প্রকাশিত চূড়ান্ত ভোটার তালিকা অনুযায়ী এবার দেশে ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার। যার মধ্যে পুরুষ ৬ কোটি ৪৮ লাখ ১৪ হাজার ৯০৭ জন, নারী ৬ কোটি ২৮ লাখ ৭৯ হাজার ৪২ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের (হিজড়া) ভোটার ১ হাজার ২৩৪ জন। এর সঙ্গে যুক্ত হবেন প্রায় ১০ লাখ প্রবাসী ভোটার। এসব ভোটার প্রথমবার আইটি সাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দেবেন। সব মিলিয়ে ইসিকে সামলাতে হবে বিশাল এক কর্মযজ্ঞ।

ইসি’র সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ৩০০টি সংসদীয় আসনের জন্য কমিশন সারা দেশে মোট ৪২ হাজার ৭৬১টি ভোটকেন্দ্র চূড়ান্ত করেছিল। এর মধ্যে পুরুষদের জন্য এক লাখ ১৫ হাজার ১৩৭ এবং নারীদের জন্য এক লাখ ২৯ হাজার ৬০২ ভোটকক্ষ নির্ধারণ করা হয়েছিল। অস্থায়ী ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ধরা হয়েছে প্রাথমিকভাবে ১৪টি, যেখানে ভোটকক্ষ থাকবে ১২ হাজারের মতো। এবার গড়ে ৬০০ পুরুষ ভোটারের জন্য একটি কক্ষ এবং ৫০০ নারী ভোটারের জন্য একটি কক্ষ নির্ধারণ করা হয়েছে। ভোটগ্রহণ করা হবে ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে শীতকালে। সেক্ষেত্রে সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত চলবে ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া। এই সময়ে মোট ৪৮০ মিনিটের মধ্যে একটি নারী বুথে ৫০০ জন এবং পুরুষ বুথে ৬০০ জনকে ভোট দিতে হবে। যেহেতু একজন ভোটারকে দু’টি পৃথক ব্যালটে ভোট দিতে হবে এবং গণভোটের বিষয়টি অধিকাংশ ভোটারের কাছে নতুন তাই এই সময়ের মধ্যে ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা অনেকটা চ্যালেঞ্জিং বলে মনে করা হচ্ছে। 

বুথের সংখ্যা বাড়াতে হবে: ইসি কর্মকর্তারা জানান, গণভোট একসঙ্গে করার সিদ্ধান্তের পর ২ লাখ ৪৪ হাজার ৬৪৯টি ভোটকক্ষ বা বুথের সংখ্যা বাড়াতে হবে। কারণ দু’টি ব্যালট দেয়ায় ভোটারের বেশি সময় লাগবে। যেহেতু ভোট গণনাও একই সঙ্গে করার কথা, সেহেতু দু’টি ব্যালটের আলাদা গণনার জন্য দু’টি আলাদা গণনা টিম, অতিরিক্ত সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ও অতিরিক্ত গণনা প্রশিক্ষণেরও প্রয়োজন হতে পারে। ৯ থেকে ১০ লাখ ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৭ থেকে ৮ লাখ সদস্য নিয়োজিত থাকবেন ভোটে। 

এদিকে ভোটে নতুন করে কেন্দ্র বাড়ানোর পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছেন ইসি সচিব আখতার আহমেদ। প্রয়োজনে ভোটকক্ষের ভেতর গোপন কক্ষ বাড়তে পারে। গতকাল রোববার নির্বাচন কমিশন ভবনে আয়োজিত ৩৪টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সঙ্গে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক শেষে তিনি এ কথা জানান। 

ইসি সচিব বলেন, মক ভোটিং পর্যালোচনা করে আমরা বোঝার চেষ্টা করেছি ভোট দিতে কতো সময় লাগে এবং ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ানো লাগবে কিনা। প্রাথমিক পর্যালোচনা শেষে আমরা দেখেছি- দুটো গোপন কক্ষ করলে ভোটকেন্দ্র বাড়াতে হবে না। তবে আরও পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। 

২০ শতাংশ বাজেট বাড়াতে হবে: জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রস্তাবিত বাজেট ছিল ২ হাজার ৯৬৫ কোটি টাকা। আলাদা দিনে গণভোট হলে অতিরিক্ত ব্যয় হতো প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। যেহেতু একই দিনে গণভোট হতে চলেছে, তাই এই ব্যয় প্রায় ২০ শতাংশ অর্থাৎ ৬০০ কোটি টাকা বাড়বে।