
এদিকে বিএনপিসহ রাজপথে সক্রিয় থাকা কয়েকটি দলের সিনিয়র নেতারাও এনসিপির এসব বিষয় নিয়ে সমালোচনায় শামিল হচ্ছেন। সবমিলিয়ে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রদানের আকাশ ছোঁয়া স্বপ্ন দেখানো দলটির নেতারা কিছুটা স্নায়ুচাপে আছেন বটে। এনসিপির সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করে এমনটিই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
অবশ্য এনসিপি নেতারা এসব অভিযোগকে ভিন্নভাবে খণ্ডন করছেন। গণমাধ্যম ও টকশোসহ বিভিন্ন মাধ্যমে তারা বলছেন, বিভিন্ন অঙ্গন থেকে আসা নেতাকর্মীদের নিয়ে গঠিত হয়েছে নতুন এই রাজনৈতিক দল। এ কারণে দলের ভেতরে শুরুতে কিছুটা বিশৃঙ্খলা দেখা দিচ্ছে, যা স্বাভাবিক মনে করছেন তারা। প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোতে এক নেতা আরেকজনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে সমালোচনা করতে পারে না। নেতানির্ভর দল হলে যা হয়। কিন্তু এনসিপি তো নীতিনির্ভর দল। ফলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী বলে এই দলের নেতাদের ভিন্নমত প্রকাশের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে এবং এসব বিষয়কে ইতিবাচক হিসাবে দেখা হচ্ছে। ফলে নিজেদের মধ্যে কোনো দূরত্ব নেই বলেও তারা দাবি করছেন। তবে তারা মনে করেন, পালটাপালটি বক্তব্য ও ফেসবুক স্ট্যাটাস নিয়ে সাধারণ মানুষ ও কর্মীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে। এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে করণীয় ঠিক করতে দফায় দফায় নিজেদের মধ্যে বৈঠক করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানতে চাইলে এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব আলাউদ্দীন মোহাম্মদ যুগান্তরকে বলেন, নতুন এ দলটির গঠনতন্ত্র এখনো তৈরি না হওয়ায় নেতাকর্মীদের জন্য শৃঙ্খলা বিধিনিষেধ নির্ধারিত হয়নি। যে কারণে কারও ব্যক্তিগত বক্তব্য বা পালটা বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে সাংগঠনিকভাবে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে না। তবে এসব বক্তব্যের অন্তর্নিহিত প্রেক্ষাপট পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এছাড়া এ বিষয়ে পক্ষে-বিপক্ষে সাধারণ মানুষ যেসব মন্তব্য করছেন সেগুলো বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, সেনা সদরে সাক্ষাতের পর এনসিপির নেতারা সম্প্রতি একটি মিটিং করেছেন। সেখানে হাসনাত আবদুল্লাহ, সারজিস আলম ও নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারীর বক্তব্যের বিষয়ে পক্ষে-বিপক্ষে মত এসেছে। এ কারণে বর্তমানে কারও চিন্তা বা মতপ্রকাশে বাধা দেওয়া হচ্ছে না। এছাড়া এনসিপি একটি গণ-অভ্যুত্থানোত্তর বিশেষ প্রেক্ষাপটে তৈরি হওয়ায় আমরা চাই না কোনো বিশেষ ব্যক্তির একক সিদ্ধান্তে দল পরিচালিত হোক। কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্তের জন্য একটি বডি বা ফোরাম তৈরি করা হবে, যারা পরামর্শ করে নেতাদের জন্য মতামত দেবে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে ছাত্র-জনতা গণ-অভ্যুত্থানে গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। দলটির সভানেত্রী শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান। ওই গণ-অভ্যুত্থানের নেপথ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমর্থন ও সহযোগিতা ছিল। মূল আন্দোলনের সামনের সারিতে শিক্ষার্থীরা নেতৃত্ব দেওয়ায় তারা সারা দেশে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের প্রচলিত রাজনীতির ধারা বদলে দিতে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের ঘোষণা দেন শিক্ষার্থীরা। এ লক্ষ্যে তাদের নেতৃত্বে ২৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নামে নতুন দলের আত্মপ্রকাশ ঘটে। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পদ থেকে পদত্যাগ করে মো. নাহিদ ইসলাম এ দলের আহ্বায়ক হন। নতুন দল গঠন থেকে আলোচনা ও সমালোচনা তৈরি হয়। কমিটিতে পদ না পেয়ে ইসলামী ছাত্র শিবিরের সাবেক কয়েকজন নেতা এ দল থেকে বেরিয়ে যান। তখন থেকেই খানিকটা চাপের মধ্যে ছিলেন এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা। এছাড়া দেশের অনেক স্থানে দলের কমিটি গঠনের বিরোধ এবং আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অবমূল্যায়ন করার অভিযোগ নানামুখী চাপ সৃষ্টি করে।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে সরব আলোচনা চলছে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের সঙ্গে বৈঠক প্রসঙ্গে এনসিপির মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহ ও মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলমের ভিন্ন ভিন্ন পোস্ট নিয়ে। ওই পোস্ট ঘিরে রাজনীতিতে নতুন উত্তাপও ছড়িয়েছে। ২০ মার্চ হাসনাত আবদুল্লাহ ফেসবুকে লেখেন, ১১ মার্চ তিনিসহ দুজনকে ক্যান্টনমেন্টে ডেকে নিয়ে আওয়ামী লীগ পুনর্বাসনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর দুদিন পর রোববার এক ফেসবুক পোস্টে সারজিস আলম লেখেন, যেভাবে এই কথাগুলো ফেসবুক স্ট্যাটাসের মাধ্যমে এসেছে, এই প্রক্রিয়াটি আমার সমীচীন মনে হয়নি।’ সারজিসের এই পোস্টের নিচে মন্তব্যের ঘরে এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আবদুল হান্নান মাসউদ লিখেছেন, ‘এসব কী ভাই! পাবলিকলিই বলছি, দুজনের একজন মিথ্যা বলছেন। এটা চলতে পারে না। মানুষ এনসিপিকে নিয়ে যখন স্বপ্ন বুনছে, তখন এভাবে এনসিপিকে বিতর্কিত করা কাদের এজেন্ডা!
তাদের ওই স্ট্যাটাস দেওয়ার পরই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখায়। বিষয়টি নিয়ে এনসিপির নেতাদের মধ্যেও পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনার ঝড় ওঠে। সেনাবাহিনীকে বিতর্কিত করা হচ্ছে-এনসিপি নেতাদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগও তোলেন অনেকে। বিএনপির পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে কড়া বক্তব্য দেওয়া হয়। সোমবার রাজধানীর লেডিস ক্লাবে বিএনপির মিডিয়া সেল আয়োজিত ইফতার মাহফিলে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তারেক রহমান এ বিষয়টিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘কয়েকদিন আগেও আমরা দেখেছি, সংস্কার এবং নির্বাচনকে মুখোমুখি দাঁড় করানো হচ্ছে, ঠিক একইভাবে সেনাবাহিনীকে জনগণের মুখোমুখি করানোর চেষ্টা হচ্ছে। এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনো ষড়যন্ত্র আছে।’ এমনকি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী শনিবার সিলেটে এক অনুষ্ঠানে ওই পোস্টের বিরোধিতা করে বলেন, হাসনাত আবদুল্লাহ রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে বৈঠক করেন। কিন্তু তার ওই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসা উচিত হয়নি।
২১ মার্চ নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারীর আরেকটি ফেসবুক স্ট্যাটাস নিয়েও রাজনীতিতে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়। সেখানে নাসীরুদ্দীন বলেন, ‘গত ৫৩ বছরে জামায়াতে ইসলামীকে বারংবার রাজনীতিতে পুনর্বাসন করার প্রচেষ্টা করা হয়েছে। জেনারেল জিয়ার হাত ধরেই এই অবৈধ কাজ সম্পন্ন হয়। সেনা-জনতার অভ্যুত্থানের ফসল লুটকারী জিয়া জনগণের অভিপ্রায়কে তোয়াক্কা না করে গায়ের জোরে এই অবৈধ শক্তিকে জনগণের ওপর চাপিয়ে দেন।’ জিয়াউর রহমানকে নিয়ে তার এই ফেসবুক স্ট্যাটাস নিয়েও বিএনপি তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায়।
২৪ মার্চ সারজিস আলম ঢাকা থেকে বিমানে সৈয়দপুরে যান। সেখান থেকে তিনি সড়কপথে পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ যান। দেবীগঞ্জ থেকে শতাধিক গাড়ির বহর নিয়ে সারজিস আলম জেলার বোদা, পঞ্চগড় সদর, তেঁতুলিয়া ও আটোয়ারী উপজেলা সফর করেন। সারজিস আলমের বাড়ি আটোয়ারী উপজেলায়। নতুন রাজনৈতিক দলে গুরুত্বপূর্ণ পদ পাওয়ার পর প্রথমবার বাড়ি যাওয়ার পথে সারজিস আলমের এই ‘শোডাউন’ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। প্রশ্ন তুলেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. তাসনীম জারা। ফেসবুক স্ট্যাটাসে জারা বলেন, সারজিস আলম জনগণের সামনে এর একটি গ্রহণযোগ্য ও পরিষ্কার ব্যাখ্যা তুলে ধরবেন। এতে জনগণের কাছে এনসিপির ভাবমূর্তি আরও শক্তিশালী হবে। ডা. তাসনীম জারার প্রশ্নের জবাব দিতে সারজিস আলম দেরিও করেননি। তাদের দুজনের পুরো বক্তব্য নিয়ে নিজ দলসহ রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
দলটির একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা জানান, দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের মধ্যে এ রকম পালটাপালটি ফেসবুক স্ট্যাটাস নিয়ে দল ও জনমনে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হচ্ছে। এছাড়া কেন্দ্রীয় নেতাদের ওপর চাপও বাড়ছে। আবার সমালোচনার মুখে তাদের নানা প্রশ্নের যুক্তি খণ্ডন করতে হচ্ছে। বিষয়টি অনেকটা বিব্রতকর বলেও মন্তব্য করেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনসিপির একাধিক নেতা।