Image description

সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদের হাজার কোটি টাকার সম্পদ নিয়ে বিস্ফোরক তথ্য বেরিয়ে এসেছে। বিশ্বব্যাপী সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকার বেশি সম্পত্তি রয়েছে তার নামে।

নামে-বেনামে তিন দেশে ৫৭৮টি সম্পদ সুনির্দিষ্টভাবে শনাক্ত হয়েছে। এর বাইরেও উদঘাটন হয়েছে দেশগুলোতে তার বিপুল সম্পদ ও বিনিয়োগের তথ্য। সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২২৮টি, যুক্তরাষ্ট্রে ৭টি ও যুক্তরাজ্যে ৩৪৩টি সম্পত্তির সন্ধান ও বিনিয়োগের তথ্য সুনির্দিষ্টভাবে পাওয়া গেছে। এছাড়া সিঙ্গাপুরেও সম্পদ ও বিনিয়োগের তথ্য মিলেছে। 

সম্পদের মধ্যে বেশির ভাগ বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট, হাউজিং ব্যবস্থা, ট্রেডিং কোম্পানি গঠন, হুন্ডি ব্যবসা ইত্যাদি। দেশ থেকে টাকা পাচার করে এসব খাতে বিনিয়োগ করা হয়েছে। সম্পদগুলো উদ্ধারে সরকার তিনটি দেশে আলাদা তিনটি মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট রিকোয়েস্ট (এমএলএআর) পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। 

বাংলাদেশ ও সংশ্লিষ্ট তিন দেশের আইনগত দিক পর্যালোচনা করে ইতোমধ্যে তিনটি এমএলএআর তৈরি করা হয়েছে। এগুলো যৌথ তদন্ত দল থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সংশ্লিষ্ট তিন দেশের যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাবে। বিএফআইইউ ও যৌথ তদন্ত দলের প্রতিবেদন সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট (বিএফআইইউ) থেকে গত সেপ্টেম্বরে সাইফুজ্জামান চৌধুরীর বিদেশে থাকা সম্পদের তথ্য চেয়ে এগমন্ট গ্রুপের (বিভিন্ন দেশগুলোতে মানি লন্ডারিং নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংস্থার আন্তর্জাতিক সমন্বয়ক) মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে চিঠি দেওয়া হয়। এ ছাড়া তার সম্পদের তথ্য উদঘাটনে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও সংযুক্ত আমিরাত সরকারের কাছেও সহায়তা চাওয়া হয়। 

এছাড়া সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর গোয়েন্দা সংস্থার সহযোগিতাও নেওয়া হয়। এর মাধ্যমে ওই তিনটি দেশে জাভেদের মোট ৫৭৮টি ও বিনিয়োগের তথ্য উদঘাটন করা হয়। এর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতে তার নামে-বেনামে ২২৮টি সম্পাদ শনাক্ত করা হয়েছে। এর সপক্ষে সব ধরনের দালিলিক তথ্য-প্রমাণও সংগ্রহ করা হয়েছে। এর বাইরেও দেশটিতে বেনামে তার আরও সম্পদ থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সেগুলোর বিষয়েও বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। এতে জানা গেছে, হাউজিং ব্যবসার কোম্পানি স্থাপন ও এতে বিনিয়োগ করেছেন তিনি। এ ছাড়া রয়েছে ট্রেডিং কোম্পানি। হুন্ডি ব্যবসার সঙ্গেও তার সম্পৃক্তার তথ্য পাওয়া গেছে।

যুক্তরাজ্যে ৩৪৩টি সম্পত্তির সন্ধান ও বিনিয়োগের তথ্য সুনির্দিষ্টভাবে পাওয়া গেছে। এগুলোর বেশির ভাগই বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট। এগুলোর মূল্য তিন হাজার কোটি টাকার বেশি হতে পারে। তিনি দেশটিতে নামে-বেনামে হাউজিং ব্যবসা পরিচালনা করছেন। এজন্য গঠন করেছেন একাধিক কোম্পানি। দেশ থেকে পাচার করা টাকায় এগুলোতে পুঁজি বিনিয়োগও করেছেন। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যে দেখা যায়, যুক্তরাজ্যে সাইফুজ্জামান চৌধুরীর নামে ১৫ কোটি পাউন্ড বা আড়াই হাজার কোটি টাকার ২৮০টি সম্পত্তি সরাসরি শনাক্ত করা হয়েছে। যৌথ তদন্ত দলের প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রে সাইফুজ্জামান চৌধুরীর ৭টি সম্পদের তথ্য সুনির্দিষ্টভাবে উদঘাটন করা হয়েছে। এর মধ্যে বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টই বেশি।

আলোচ্য তিনটি দেশে শনাক্ত করা সম্পদ উদ্ধারে সরকার পৃথক তিনটি মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট রিকোয়েস্ট (এমএলএআর) পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাংলাদেশ ও সংশ্লিষ্ট তিন দেশের আইনগত দিক পর্যালোচনা করে ইতোমধ্যে তিনটি এমএলএআর তৈরি করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে যৌথ তদন্ত দল (দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এনবিআর ও সিআইডি)। এদের কার্যক্রম সমন্বয় করছে বিএফআইইউ। যৌথ তদন্ত দল থেকে তিনটি এমএলএআর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে এটি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট তিন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাবে। এর আলোকে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে সিঙ্গাপুরেও সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদের সম্পদ ও বিনিয়োগের তথ্য পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে বিশদ তদন্ত চলছে। গত বছরের শেষদিকে আলজাজিরার এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাইফুজ্জামান চৌধুরীর বিশ্বব্যাপী মোট সম্পত্তির পরিমাণ ৬০ কোটি ডলারের বেশি বা বাংলাদেশি মুদ্রায় সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকার বেশি। সাইফুজ্জামানের পিতা আওয়ামী লীগ নেতা প্রয়াত আক্তারুজ্জামান চৌধুরীর নামে লন্ডনে আগে থেকেই একাধিক ফ্ল্যাট ছিল। তার বিরুদ্ধেও টাকা পাচারের অভিযোগ ছিল। তার পিতার মৃত্যুর পর সাইফুজ্জামান চৌধুরী সেগুলো দেখশোনা করছেন। একই সঙ্গে তিনিও টাকা পাচার করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে বিদেশে তাদের সম্পদ বিশাল আকার ধারণ করেছে।

সাইফুজ্জামান মন্ত্রী হওয়ার পর অতিমাত্রায় টাকা পাচার করেছেন। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতের ইউনাইটেড কর্মাশিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) ২০১৮ সালে দখলে নিয়ে লুটপাট চালান। ব্যাংক থেকে তার সহযোগীদের নামে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে। যার বড় অংশই বিদেশে পাচার করা হয়েছে। এসব ঋণ এখন খেলাপির পথে।

বিএফআইইউর প্রতিবেদনে বলা হয়, সাইফুজ্জামান চৌধুরীর বিষয়ে গোয়েন্দা প্রতিবেদন ও বিদেশি গোয়েন্দা তথ্য দুদকে পাঠানো হয়েছে। এর আলোকে সংস্থাটি বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন ব্যাংকে ১৫ কোটি ৬ লাখ টাকার স্থিতিসহ ১২৫টি ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে।