স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের কৌশল নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যে চাপা অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। জামায়াত এসব নির্বাচনে আলাদাভাবে অংশ নেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিলেও জোটের অন্যতম শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) চায় জোটবদ্ধভাবে একক প্রার্থী দিতে। এনসিপির আশঙ্কা, ঢাকা সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন স্থানে জোটের শরিকরা আলাদা প্রার্থী দিলে ভোট ভাগাভাগি হবে এবং এর ফলে ক্ষমতাসীন বিএনপি সরাসরি লাভবান হবে। তবে জামায়াত নেতারা জোটে কোনো বিরোধ না থাকার দাবি করে বিষয়টি স্থানীয় পর্যায়ে সমঝোতার ওপর ছেড়ে দিয়েছেন।
শরিকদের যুক্তি, স্থানীয় নির্বাচনে জোটের প্রশ্নটি শুধু প্রার্থী সমন্বয়ের নয়, এর সঙ্গে শরিক দলগুলোর রাজনৈতিক গুরুত্ব, সাংগঠনিক বিস্তার এবং ভবিষ্যৎ নির্বাচনি অবস্থানও জড়িত। জোটগত নির্বাচনের কারণে জাতীয় নির্বাচনে জামায়াত নেতৃত্বাধীন এই রাজনৈতিক জোট ভালো ফলাফল করেছে। আগামীতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আরেকটি সমঝোতা হলে ফলাফল ভালো হবে বলে মনে করছে তারা।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জামায়াত ইতোমধ্যে ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েমকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। অন্যদিকে এনসিপি প্রার্থী করেছে নাসিরুদ্দীন পাটওয়ারীকে। দুজনেই জুলাই অভ্যুত্থানের সামনের সারির যোদ্ধা এবং বেশ জনপ্রিয়। জোটের নেতারা মনে করছেন, এই দুই প্রার্থী শেষ পর্যন্ত মাঠে থাকলে ভোট ভাগাভাগি হবে এবং বিএনপি প্রার্থী সহজেই জয়ী হবে। এই সমীকরণ অন্যান্য স্থানীয় নির্বাচনেও প্রভাব ফেলবে। তাছাড়া জাতীয় নির্বাচন ও আন্দোলনে একসঙ্গে থাকার পর স্থানীয় নির্বাচনে সমন্বয় না হওয়াটা জোটের রাজনৈতিক গুরুত্ব ও ঐক্যকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার এ প্রসঙ্গে বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলভিত্তিক নয়, দলীয় প্রতীকও সেখানে থাকবে না। কাজেই আমরা ১১ দল বিষয়টি নিয়ে আগেই আলোচনা করেছি। সেখানে সবাই একমত হয়েছে যে, সব পর্যায়ের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থীরা আলাদা আলাদাভাবে নির্বাচনে অংশ নেবে।
অসন্তোষ বা টানাপোড়েনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে জোটে কোনো টানাপোড়েন নেই। ফেসবুকে তো কতজন কত রকম লেখে। সেটা তাদের ব্যাপার। তবে এ বিষয়ে ১১ দলে কোনো অসন্তোষ নেই। কারও প্রতি কারও কোনো চাপ নেই বলে দাবি করেন তিনি।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, স্থানীয় নির্বাচনে কেন্দ্রীয়ভাবে জোট করার সিদ্ধান্ত নেই। তবে কোনো জেলা, উপজেলা বা এলাকায় শরিক দলগুলো নিজেরা আলোচনা করে একক প্রার্থী ঠিক করলে কেন্দ্র থেকে বাধা দেওয়া হবে না। অতীতে বিএনপির সঙ্গে জোটে থাকার সময়ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কেন্দ্রীয়ভাবে আসন ভাগাভাগি হয়নি। ২০১৪ সালের উপজেলা ও ২০১৫ সালের পৌরসভা নির্বাচনে কোথাও বিএনপি জামায়াতকে, কোথাও জামায়াত বিএনপিকে ছাড় দিয়েছিল। সেসব সমঝোতা হয়েছিল স্থানীয় পর্যায়ে।
তবে জামায়াতের এই অবস্থানের কড়া সমালোচনা করেছে এনসিপি। দলটির রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য আরিফুল ইসলাম আদিব যুগান্তরকে বলেন, শরিকদের জামায়াত ইচ্ছামতো ব্যবহার করছে। জাতীয় নির্বাচন ও আন্দোলনে একসঙ্গে থাকার পর স্থানীয় নির্বাচনে সমঝোতা না হওয়ায় অবশ্যই অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। অতীতে বিএনপির সঙ্গে জোটে থাকার সময় জামায়াত ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত সমঝোতা করেছিল, এখন কেন ব্যতিক্রম হবে?
সমঝোতা না হওয়ায় এককভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে এনসিপি। ইতোমধ্যে ঢাকা দক্ষিণে নাসিরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং উত্তরে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে প্রার্থী করার ঘোষণা দিয়েছে দলটি। শতাধিক উপজেলা, পৌরসভা ও সিটিতে প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি চললেও ইউনিয়ন পর্যায়ে তাদের যোগ্য প্রার্থীর সংকট রয়েছে। তবে ভবিষ্যতের কথা বিবেচনায় কিছু স্থানে সমঝোতার পথও খোলা রাখছে দলটি।
জোটের অন্য শরিকরাও আলাদা নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে তাদের মধ্যেও ভিন্নমত রয়েছে। ১১ দলের অন্যতম শরিক আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু যুগান্তরকে বলেন, আলাদা নির্বাচনের সিদ্ধান্তে তাদের কোনো অসন্তোষ নেই, তবে এনসিপির থাকতে পারে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন-ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরসহ যেখানে আমাদের ভালো প্রার্থী আছে, সেখানে আমরা নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। তবে ১১ দলের পক্ষ থেকে একক প্রার্থী দিলে ভালো হতো।