প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর ঘিরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ভিভিআইপি ফ্লাইটের দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবরের এ সফরের জন্য প্রস্তুত করা তালিকায় রয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলার আসামি এক প্রকৌশলী এবং আওয়ামী লীগ আমলে শ্রমিক লীগের রাজনীতিতে যুক্ত এক বিমান কর্মকর্তার নাম। এ নিয়ে নিরাপত্তা যাচাই ও দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের বাছাই প্রক্রিয়া নিয়ে তৈরি হয়েছে আলোচনা।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রধানমন্ত্রীর মতো রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সফরে দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও যথাযথ যাচাই জরুরি। সফরের আগে জাপানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. দাউদ আলীকে ঢাকায় ফিরিয়ে আনার বিষয়টি সামনে এনে দায়িত্ব বণ্টনের মানদণ্ড নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, ভিভিআইপি ফ্লাইটের সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা, কূটনৈতিক মর্যাদা ও রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি জড়িত। তাই দায়িত্বপ্রাপ্তদের অতীত কর্মকাণ্ড ও নিরাপত্তা ছাড়পত্র যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম যুগান্তরকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ভিভিআইপি ফ্লাইট সাধারণ বাণিজ্যিক ফ্লাইট নয়। এর সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি জড়িত। এ ধরনের দায়িত্বে নিয়োগের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যোগ্যতা ও অতীত কর্মকাণ্ড যাচাই এবং নিরাপত্তা প্রক্রিয়া যথাযথভাবে সম্পন্ন করা জরুরি। বিতর্কিত ব্যক্তিদের দায়িত্ব দিলে নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
তালিকায় দুদকের মামলার আসামি প্রকৌশলী : যুগান্তরের হাতে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের চিফ ইঞ্জিনিয়ার (ইঞ্জিনিয়ারিং প্রডাকশন) মো. আলী নাসের স্বাক্ষরিত দায়িত্বপত্রে দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের বিজি ৩৭৬ ফ্লাইটে ২৬ অক্টোবর ঢাকা থেকে নারিতা এবং বিজি ৩৭৭ ফ্লাইটে ২৯ অক্টোবর নারিতা থেকে ঢাকায় ফেরার জন্য মনোনীত প্রকৌশলীর তালিকার প্রথমে রয়েছেন মো. সাদেকুল ইসলাম ভূঁইয়া।
সাদেকুল ২০১৪ সালে মিসরীয় উড়োজাহাজ সংস্থা ইজিপ্ট এয়ার থেকে দুটি বোয়িং উড়োজাহাজ লিজ নেওয়ায় অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে রাষ্ট্রের শত কোটি টাকা ক্ষতির অভিযোগে করা মামলার আসামি। ২০১৩-১৪ সালের ওই ঘটনা অনুসন্ধানের পর ২০২৩ সালে দুদক মামলাটি করে। তদন্ত শেষে সাদেকুলসহ বিমানের সাবেক একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। মামলাটি বর্তমানে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, জামিনে থাকা সাদেকুলকে প্রতি মাসের ১২ তারিখে আদালতে হাজিরা দিতে হয়।
বিমানের অভ্যন্তরীণ ইমেইল নথি অনুযায়ী, ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবরের সফরে নারিতা রুটের ভিভিআইপি ফ্লাইট পরিচালনায় প্রকৌশলীদের জন্য বিশেষ আসন বরাদ্দের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে-আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিমানের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী দেবেশ চৌধুরী ও সিজিএম ইকবালসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রভাবে সাদেকুল হজের দায়িত্ব, যুক্তরাষ্ট্র থেকে বোয়িং উড়োজাহাজ গ্রহণ এবং ইতালি ও চীনে ডি-চেকের মতো আকর্ষণীয় বিদেশ সফরে একাধিকবার অগ্রাধিকার পেয়েছেন।
সাদেকুল প্রথমে জাপান সফরে যাওয়ার কথা অস্বীকার করে বলেন, অন্য দুই প্রকৌশলী যাচ্ছেন। পরে তিনি বলেন, ‘আমি ২৯ তারিখে যাচ্ছি’। দুদকের মামলার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘হাজিরা দিচ্ছি; প্রায় প্রতি মাসেই হাজিরা থাকে।’ তবে পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তিনি ২৬ তারিখেই (আজ) জাপান সফরে যাচ্ছেন।
গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং দলে শ্রমিক লীগ নেতার নাম : আরেকটি নথিতে বিমানের গ্রাউন্ড সার্ভিস ম্যানেজার মো. শামীম হাসানের নাম পাওয়া গেছে। ৮ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে জাপান দূতাবাসে পাঠানো বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কান্ট্রি ম্যানেজার (জাপান) সাইফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত ভিসা সাপোর্ট লেটারে দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রীর সফরে ভিভিআইপি ফ্লাইটের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ও পরিচালনাগত দায়িত্ব পালনের জন্য গঠিত পাঁচ সদস্যের দলে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন শামীম। চিঠিতে তার জাপানে অবস্থান এবং নারিতার হোটেল ওয়েলকোতে থাকার ব্যবস্থা উল্লেখ করে ভিসা প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা চাওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তার ভিসাও প্রস্তুত হয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শামীম বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স শ্রমিক লীগের ট্রাফিক শপ কমিটির সভাপতি ছিলেন। তিনি বিমান শ্রমিক লীগের মশিকুর রহমান কমিটির উপদেষ্টার দায়িত্বও পালন করেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
বিমানের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সফরে সর্বোচ্চ গোপনীয়তা ও সতর্কতা বজায় রাখা প্রয়োজন। এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, শামীমের নাম কীভাবে তালিকায় যুক্ত হলো, তা খতিয়ে দেখা দরকার। সাধারণত ভিভিআইপি ফ্লাইটে বিমানবন্দর-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়, অথচ শামীম বলাকা ভবনে কর্মরত।
বিমানের জনসংযোগ মহাব্যবস্থাপক শাহনুর আহমেদ বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা হয়তো নাম দিয়েছেন। তবে শামীম যাচ্ছেন না বলে শুনেছি। আওয়ামী লীগের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতার কথাও শুনেছি, তবে তিনি কোন পদে ছিলেন, তা জানি না।
অভিযুক্ত প্রকৌশলীকে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে বিমানের পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ম্যাটেরিয়াল ম্যানেজমেন্ট) এয়ার কমোডর মো. মনজুর-ই-আলম বলেন, যথাযথ কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তা ছাড়পত্র পাওয়ার শর্তে ভিভিআইপি ফ্লাইটের জন্য কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয় এবং তাদের দক্ষতাও নিশ্চিত করা হয়। তিনি প্রশ্ন রাখেন-দুদকের মামলা বা অভিযোগ থাকলেই কি কাউকে দোষী বলা যায়?