ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের শাসনামল ছিল ব্যাংকিং সেক্টরে অরাজকতার সময়। ১৫ বছর ৮ মাসের শাসনামলে অসংখ্য ব্যাংক-বীমা কোম্পানির লাইন্সেস দেয়া হয়েছে। কেবল ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ আর কর্পোরেট ব্যবসায়ীরাই নয়, কাঠের ব্যবসায়ী, পরিবহন ব্যবসায়ী এবং আলু-পটলের ব্যবসায়ীরা পর্যন্ত ব্যাংক লাইসেন্স পেয়েছিলেন রাজনৈতিক যোগ্যতায়। ব্যাংক স্থাপনের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ঋণ নিয়ে ব্যাংকিং সেক্টরকে ফোকলা করেছিল ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের নেতা, ব্যবসায়ী, আমলা ও শিল্পপতিরা। প্রকল্প-মহাপ্রকল্প থেকে লুটপাটের পাশাপাশি ব্যাংকিং সেক্টর থেকে বিপুল অংকের টাকা ঋণ গ্রহণ করে রাজনৈতিক পরিচয়ে। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে পরিশোধ না করায় খেলাপি ঋণের পারদ ওপরে উঠে যায়। ফলে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ঋণ খেলাপি দেশের তালিকায় শীর্ষে উঠে গেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ফাইন্যান্সিয়াল সাউন্ডনেস ইন্ডিকেটরস ডেটাবেজে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এতে করে আ.লীগের শাসনামলে ব্যাংকঋণ নিয়ে পরিশোধ না করায় খেলাপি ঋণের বোঝা (দায়) নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারের ঘাড়ে পড়ে গেছে।
নির্বাচিত বিএনপি সরকারের দায়িত্ব নেয়ার ছয় মাস পেরিয়েছে। এ সময়ের ব্যবধানে ঋণ দেয়া হয়নি বললেই চলে। তবু সরকারের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে ছয় লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়া খেলাপি ঋণ। ব্যাংক থেকে বিতরণ করা প্রতি ১০০ টাকা ঋণের প্রায় ৩৩ টাকাই (৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ) এখন খেলাপি। এর মাধ্যমে খেলাপি ঋণের হারে বিশ্বে শীর্ষে বাংলাদেশ। চাদ, ইকুয়েটোরিয়াল গিনি, আলজেরিয়া, ঘানা কিংবা যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনের অবস্থানও বাংলাদেশের চেয়ে ভালো। ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়ে দেয়া লাখ কোটি টাকার ভুয়া ও বেনামি ঋণে ডুবছে দেশ।
জানা গেছে, ২০০৯ সালে পলাতক শেখ হাসিনা ক্ষমতা নেয়ার সময় খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ঠিক আগে ২০২৪ সালের জুনে তা বেড়ে দাঁড়ায় দুই লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। ২০২৬ সালের মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল পাঁচ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। পরের তিন মাসেই তা ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা বেড়ে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণ রেকর্ড ছয় লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকায় উঠেছিল।
খাত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্যাংক খাতের দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভূত অনিয়ম, জালিয়াতি ও বেনামি ঋণের প্রকৃত চিত্র এখন বেরিয়ে আসছে। আর এতেই খেলাপি ঋণের পরিমাণ আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ফ্যাসিস্ট আমলে দীর্ঘদিন ধরে ঋণ পুনঃতফসিল, বিশেষ ছাড় ও হিসাবগত পরিবর্তনের মাধ্যমে অনেক সমস্যাগ্রস্ত ঋণ নিয়মিত দেখানো হয়েছিল।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, খেলাপি ঋণ হঠাৎ সৃষ্টি হয়নি। চলমান সম্পদ মান পর্যালোচনার ফলে ব্যাংক খাতের প্রকৃত দুর্বলতা এখন প্রকাশ পাচ্ছে। আগে পুনঃতফসিল, বিশেষ ছাড় ও হিসাবগত পরিবর্তনের মাধ্যমে অনেক সমস্যাগ্রস্ত ঋণ আড়ালে ছিল।
রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান পর্যালোচনা, দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষায় অনিয়ম, জালিয়াতি ও বেনামি ঋণের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে এসেছে। ফলে আগে আড়ালে থাকা বিপুল ঋণ এখন খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।
খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, মূলত খেলাপি ঋণের ওপর নিয়মিত হারে সুদ যুক্ত হতে থাকায় ও অনেক আগের অনাদায়ি ঋণ হিসাবভুক্ত হওয়ায় খেলাপির পরিমাণ বেড়েছে। তবে খেলাপি কমাতে ইতোমধ্যে ঋণ পুনঃতফসিলের নীতিগত সুযোগ দেয়া হয়েছে। এতে ভবিষ্যতে খেলাপির হার কিছুটা কমে আসবে।
গত এপ্রিলে জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করেন। এর মধ্যে ১১টিই চট্টগ্রামের এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে। বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোও ছিল আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ।
ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা একীভূত পাঁচ ব্যাংকের। তীব্র তারল্য ও ঋণ সংকটে এই ব্যাংকগুলো বর্তমানে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক হিসেবে কার্যক্রম চালাচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, এই পাঁচটি ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের ৮০ শতাংশের বেশি এখন খেলাপি। ব্যাংকগুলো হলোÑএক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক। এর মধ্যে চারটিই ছিল এস আলম গ্রুপের। এক্সিম ব্যাংকের মালিকানা ছিল নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের। এর বাইরে সরকারি খাতের বেসিক, জনতা ও বেসরকারি খাতের এবি ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৫০ শতাংশের বেশি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজনৈতিক প্রভাবে বিগত সময়ে অনিয়ম, জালিয়াতি, ভুয়া ঋণপত্র (এলসি) খোলা ও বেনামি উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের টাকা বের করে নেয়ার ফলে ব্যাংকগুলোর এমন পরিস্থিতিতে পড়েছে।
ব্যাংকিং খাতের অচলাবস্থা কাটাতে বিশেষ ছাড় দিয়ে ঋণ পুনঃতফসিল ও সুদ মওকুফ করে এককালীন ঋণ পরিশোধের সুযোগ দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। বিএনপি সরকারও ঋণ আদায়ে এই সুবিধা দিয়েছে। তবে খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বারবার পুনঃতফসিল করে সাময়িকভাবে কাগজ-কলমে খেলাপি ঋণ কমানো সম্ভব হলেও ব্যাংকিং খাতের মৌলিক পরিবর্তন হবে না।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান মাসরুর আরেফিন বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক উদ্যোক্তা চাপে পড়েছেন। নতুন ঋণ বিতরণ বেশ কমে গেছে। বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। এ জন্য খেলাপি ঋণ বেড়ে গেছে। সামনে হয়তো খেলাপি ঋণ কমে আসবে।
খেলাপি ঋণের তালিকায় দীর্ঘসময় শীর্ষে ছিল ইউক্রেন। ২০২৩ সালের দেশটির খেলাপি ঋণের হার ছিল ৩৭ দশমিক ৪ শতাংশ। রাশিয়ার অভিযানের পর অর্থনৈতিক ধাক্কায় তা প্রায় ৩৯ শতাংশে উঠেছিল। তবে ২০২৪ সাল থেকে দেশটির ঋণ পরিস্থিতির উন্নতি হতে শুরু করে। ঋণ আদায়, পুনর্গঠন ও তুলনামূলক ভালো মানের নতুন ঋণ বিতরণ বাড়ায় মোট ঋণের বিপরীতে খেলাপি ঋণের অনুপাত কমেছে।
বাংলাদেশে খেলাপি ঋণ নতুন করে সৃষ্টি হয়নি। বরং দীর্ঘদিন ধরে পুনঃতফসিল, বিশেষ ছাড় ও হিসাবগত কৌশলে আড়াল করে রাখা বিপুল সমস্যাগ্রস্ত ঋণ এখন খেলাপি হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে। খেলাপি ঋণ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ শ্রেণিকরণ ও সঞ্চিতি রাখার নিয়ম আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করেছে। দুর্বল ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান পর্যালোচনা করা হচ্ছে। পুনর্গঠন করা হয়েছে কয়েকটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ। ঝুঁকিভিত্তিক তদারকিও চালু করা হয়েছে। এসব পদক্ষেপের কারণে আগে নিয়মিত দেখানো অনেক সমস্যাগ্রস্ত ঋণ এখন খেলাপি হিসেবে শনাক্ত হচ্ছে। এতে বাড়ছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফল পেতে হলে ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপিদের সম্পদ জব্দ ও অর্থ আদায়, দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি, ব্যাংকের পরিচালনা-ঋণ অনুমোদনে রাজনৈতিক প্রভাব বন্ধ ও নতুন করে খারাপ ঋণ সৃষ্টি ঠেকাতে হবে। এগুলো ধারাবাহিকভাবে করা গেলে মধ্যমেয়াদে খেলাপি ঋণ কমতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ২০২৪ সালে খেলাপি ঋণ ছিল ১১ শতাংশ। ২০২৫ সালের জুনে ফরেনসিক অডিটে দেখা যায়, খেলাপি ঋণের অনুপাত ৩৫ দশমিক ৫ শতাংশ। তার মানে যারা বিভিন্ন দায়িত্বে ছিলেন, তারা খেলাপিদের ঢেকে রাখতে সহযোগিতা করেছেন। এই হিসাবটাও সঠিক কি না নিশ্চিত নয়। খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরো বাড়তে পারে। চলতি বছরের মার্চে খেলাপি ঋণের অনুপাত কমে দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৬ শতাংশে। আমরা একটা আশার আলো দেখতে পাচ্ছি। খেলাপি ঋণের অনুপাত কমছে।