Image description

২০০৭ সালের ২২ এপ্রিল। আ’লীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ) সভাপতি শেখ হাসিনা যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যে দীর্ঘ দিন অবস্থান শেষে দেশে ফিরতে উদ্যত হন। ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের টিকিট কেটে তিনি হাজির হন হিথরো এয়ারপোর্টে। মইন উ.-ফখরুদ্দিন সরকার তখন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)-এর মাধ্যমে সাফ জানিয়ে দেয়, কোনো বিমান সংস্থা যদি শেখ হাসিনাকে বোর্ডিং পাস দেয় কিংবা ঢাকায় নিয়ে আসে তাহলে ওই বিমানকে বাংলাদেশের মাটিতে নামতে দেয়া হবে না। বাংলাদেশ সরকারের এক হুমকিতে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ শেখ হাসিনাকে বিমানে তুলতে অস্বীকৃতি জানায়। স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে ব্যর্থ হাসিনা ফিরে যান ভাগ্নি টিউলিপের বাসায়। একই বছর ৭ মে তিনি ফিরে আসেন বটে। কিন্তু প্রায় এক মাস ধরে সরকারের সঙ্গে শেখ হাসিনার চলে দর কষাকষি। ভারতের কূটনৈতিক তৎপরতা তৎকালীন সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করেই তখন ফিরতে হয়েছিল শেখ হাসিনাকে। যারা ওই দেন-দরবারে যুক্ত ছিলেন-এ তথ্য জানিয়েছেন তারাই। গ্রেফতারের ভয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। পক্ষান্তরে সকল ভয়-ভীতি উপেক্ষা করে দেশের মাটিতে পড়ে ছিলেন আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া।

দেশে ফিরে সেবার কী বিপ্লবী কথা-বার্তাই না বলেছিলেন হাসিনা! অথচ নেপথ্যের সেই সমঝোতার কথা অনেকের অজানা। 
ওয়ান-ইলেভেনের পর গ্রেফতার-আতঙ্কে দেশ ছেড়ে পালানো শেখ হাসিনা এবারও নাকি দেশে ফিরবেন! সেই ‘ফেরা’টা নাকি ঘটবে চলতি বছর ডিসেম্বরেই। ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী সময়ে হাসিনা যখন দেশে ফেরেন তখন তার বিরুদ্ধে কোনো গ্রেফতারি পরোয়ানা ছিল না। এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে সাড়ে ১৪শ’ মানুষকে গুলি করে হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা। তার জন্য অপেক্ষা করছে ফাঁসির মঞ্চ। শত শত শিশু-ছাত্র-জনতা-সংখ্যালঘু শিশুর রক্তে রঞ্জিত তার হাত।

হাসিনার গুলিতে অন্ধ হয়ে গেছেন ৭শ’ জনেরও বেশি মানুষ। বিকলাঙ্গ হয়ে জীবন্মৃত অবস্থায় রয়েছেন ২২ হাজার প্রাণ। মানুষ হত্যাকারী বর্বর, ঘৃণ্য অপরাধীর ‘দেশে ফেরা’ আর ‘রাজনীতিক’র দেশে ফেরা এক কথা নয়। এখন তিনি দণ্ডিত অপরাধী। একজন দণ্ডিত অপরাধীকে বয়ে আনতে বোর্ডিং পাস দেবে কোন এয়ারলাইন্স? ১৯ বছর আগের শেখ হাসিনা আর এখনকার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হাসিনা কি এক? সামান্য গ্রেফতারের ভয়েই যিনি দেশ ছেড়ে পালিয়েছিলেন, তিনি কি না স্বেচ্ছায় আসবেন মৃত্যুদণ্ড মাথায় নিয়ে? ঘিলুসম্পন্ন একজন পাগলও হাসিনার দেশে ফেরার আকাক্সক্ষার কথা বিশ্বাস করবে না। কিছু ‘টোকাইলীগ’ মার্কা নির্বোধ টাইপের মানুষ অর্থকড়ির লোভে হাসিনাকে ‘বিপ্লবী’ হিসেবে প্রচার করতে পারেন। 

ভারতের গদি মিডিয়াও জুলাই গণহত্যার মতো টাটকা ঘটনাকে বালুচাপা দিয়ে হাসিনার দেশে ফেরার গাল-গপ্প প্রচার করতে পারে। বাস্তবতা হচ্ছে, বর্বর হাসিনার কবরও এ দেশের মাটিতে হবে না। বয়োবৃদ্ধ, ন্যুব্জ, পরাজিত, ভীতসন্ত্রস্ত পলাতক হাসিনা নিভৃত কোন গুহায় বসে অডিও বক্তৃতায় দেশে ফেরার আকুতি জানালেন, আর সেটিকে স্বাগত জানিয়ে ব্যানার নিয়ে কয়েক সেকেন্ডের জন্য কোন্ কোন্ টোকাই গলির ভেতর ঝটিকা মিছিল করলো: সেটি গোনায় ধরার কিছু নেই। কারণ হাসিনা ভালো করেই জানেন, দেশের মানুষ তাকে কতটা ঘৃণা করে। বহুবার তিনি বলেছেন, বিশেষত আ’লীগ (বর্তমানে নিষিদ্ধ) নেতাদের দায়ী করে। তার পিতাকে হত্যার পর একজন মানুষও যে ছিল না প্রতিবাদ করার: এ কথা বার বার বলেছেন। 

ক্ষমতাচ্যুত হাসিনা ভারত পালিয়ে যাওয়ার পরও তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন একই চিত্র। তার জন্য একটি প্রাণীও রাস্তায় নেমে জীবন দেয়নি। ‘চাচা আপন জান বাঁচা’ বলে যেখানে শেখ হাসিনা এবং তার পরিবারের সকল সদস্য আগেভাগেই দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন, সেখানে কার এত ঠেকা হাসিনার জন্য জীবন বাজি রাখার? দেশের লাখ লাখ কর্মী-সমর্থকের অনিশ্চয়তা এবং প্রাণহানির হুমকিতে রেখে যিনি পরিকল্পিতভাবে নিজের পরিবারের সকল সদস্যকে নিরাপদে আগেই দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিতে পারেন: তার জন্য জীবন দিয়েই বা কী লাভ? এসব হিসাব-নিকাশ করে দেশের ভেতর চুপটি করে থাকা মধ্যম সারির নেতা এবং কর্মীরা হাসিনার বিষয়ে অনাগ্রহী। 

তাদের রাস্তায় নামাতে, উজ্জীবিত করতেই হাসিনা মাঝে মধ্যে ‘দেশে ফেরা’র কথা বলে দেশের রাজনীতিতে নিজের প্রাসঙ্গিকতা ধরে রাখার প্রাণান্ত চেষ্টা। 
তার দেশে ফেরার ঘোষণার পর হুক্কা-হুয়া রব তুলেছে যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে পালিয়ে থাকা আওয়ামী নেতা-কর্মীরা।
অন্যদিকে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনার ‘দেশে ফেরার ঘোষণা’র পর যুক্তরাজ্য প্রবাসী আওয়ামী সমর্থক আইনজীবী নিরাপদ দূরত্বে থেকে মেতে উঠেছেন নতুন এক ধান্ধায়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানাচ্ছে, শেখ হাসিনার ‘দেশে ফেরা-তত্ত্ব’ প্রচারের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপীয় দেশগুলোতে প্রবাসীদের কাছ থেকে চলছে চাঁদাবাজি। ক্যানভাসারের মতো সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিডিও ছেড়ে প্রকাশ্যেই করছেন এসব।

সম্প্রতি ‘সিলেট লেন্স’ নামের একটি ফেসবুক আইডিতে এক আইনজীবীকে বলতে শোনা যায়, ‘আইনজীবী সহায়ক পরিষদ’ নেত্রীর সামনে (পালিয়ে যাওয়ার পর যদিও হাসিনাকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি) ঘোষণা দিয়েছে একশ’র মতো আইনজীবী বাংলাদেশে যাবেন। তাদের শুভেচ্ছা। আপনারা জানেন, প্রায় ১০টি বিমান নিয়ে যাওয়ার জন্য আমাদের টিম কাজ করছে। প্রায় ২২০টি বিদেশি মিডিয়া যাবে। তাদের সাধুবাদ জানাই। যুক্তরাজ্যের আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, তাঁতি লীগ, কৃষক লীগ, শ্রমিক লীগ, মহিলা লীগসহ প্রায় প্রত্যেকটি ব্রাঞ্চ কমিটি সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করছে। 
‘আইনজীবী সহায়ক পরিষদ’র এ উদ্যোগ কতটা উপকারে আসবে: এমন প্রশ্নের জবাবে আইনজীবী সহায়ক পরিষদ নেতা এসব কথা বলেন

লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, কথিত এই হাসিনাভক্ত আইনজীবীর হাস্যকর বক্তব্য ফেসবুকে কয়েক হাজার ‘লাইক-শেয়ার’ও হয়েছে। বলা বাহুল্য, দেশের রীতি-নীতি, আইন-কানুন, ইমিগ্রেশন, বাংলাদেশ বার কাউন্সিল সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা যাদের আছে তারা এ ধরনের দাবিকে হাস্যকরই মনে করবেন না, মুহূর্তে বুঝে যাবেন: এটি ধান্ধাবাজি ছাড়া কিছুই নয়। ১০টি বিমান ভাড়া করা, দুই শতাধিক আইনজীবীকে বাংলাদেশে হায়ার করে এনে হাসিনাকে মুক্ত করা, ২২০টি মিডিয়াকে হাসিনার কাভারেজের জন্য আনার সঙ্গে আর্থিক সংশ্লেষ রয়েছে, যা প্রবাসীদের কাছ থেকে চাঁদা তোলার একটি মওকা তৈরি করেছে। কারণ বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সনদ না থাকলে কোনো আইনজীবী দেশের আদালতে আইনি লড়াই চালাতে পারবেন না। ১০টি বিমান ভাড়া করা যেন এক আষাঢ়ে গপ্পো। 

সিভিল এভিয়েশনের অনুমোদন ছাড়া পৃথিবীর কোন্ বিমান সংস্থার বিমান বাংলাদেশে ল্যান্ড করতে পারবে? ২২০টি মিডিয়া আসবে হাসিনার নিউজ কাভার করার দাবিও অবাস্তব। তাদের ইমিগ্রেশনের বিষয় রয়েছে। ভিসাপ্রাপ্তির বিষয় আছে। সবই বর্তমান সরকারের এখতিয়ারে। সরকার না চাইলে তারা কেমন করে আসবেন? মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে ‘বন্দি বিনিময় চুক্তি’র আওতায় সরকারই তো বার বার ভারত সরকারকে তাগিদ দিচ্ছে হাসিনাকে ফেরত দিতে। এ চুক্তির কারণে হয় শেখ হাসিনাকে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে বাংলাদেশে ‘পুশব্যাক’ করতে হবে: নয়তো ‘বন্দি’ অবস্থায় ফেরত দিতে হবে।

সে ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে আইনি আনুষ্ঠানিকতা সম্পাদনের জন্য হাসিনাকে রাখতে হবে বাংলাদেশে অবস্থানরত আইনজীবী। ‘বন্দি’ হিসেবে হাসিনা দেশে ফিরলে তাকে প্রথম হস্তান্তর করতে হবে ইমিগ্রেশন পুলিশের কাছে। ইমিগ্রেশন পুলিশ হস্তান্তর করবে থানা পুলিশের কাছে। থানা পুলিশ হেলমেট পরিয়ে প্রিজন ভ্যানে করে নিয়ে তুলবে আদালতে। আদালত পাঠাবে কারাগারে। তাকে আর প্রকাশ্যে দেখার আইনি সুযোগ কোথায়? 
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম গত ১২ জুলাই সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, ক্ষমতাচ্যুত, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা দেশে ফেরা মাত্রই গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হবে। প্রশ্নটা হচ্ছে, তিনি যদি ভারত সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকেন তাহলে তিনি নিজে নিজে আসার কোনো সুযোগ নেই।

হয় প্রত্যর্পণ (এক্সট্রাডিশন) চুক্তির আওতায় তাকে বাংলাদেশ সরকারের কাছে হস্তান্তর করতে হবে অথবা তাকে ‘পুশব্যাক’ করতে হবে। আর শেখ হাসিনা (রয়টার্সে) যেটা বলছেন, তিনি এবং তার দলীয় নেতাকর্মীরা একত্রে এসে আত্মসমর্পণ করবেন। এই বক্তব্যের কোনো ভিত্তি নেই। কারণ তিনি তো এখন তার নিয়ন্ত্রণে নেই। তিনি তো স্বাধীন নেই অথবা তিনি আত্মগোপনে নেই।

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, আমাদের কাছে মনে হয় তার বক্তব্য বাংলাদেশে তার নেতাকর্মীদের কোনোভাবে একটু উজ্জীবিত রাখা কিংবা একটা অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করা ছাড়া অন্য কোনো কারণ নেই। 
যদি শেখ হাসিনাকে কোনোভাবে বাংলাদেশে আনা হয় অথবা তাকে বাংলাদেশে পাওয়া যায় তাহলে তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডাদেশ থাকায়, তিনি প্রথমত জেলে যাবেন। জেলে যাবার পর তিনি আপিল করতে পারবেন কি পারবেন না সে বিষয়টি নিষ্পত্তি হবে। যদি আপিল করার সুযোগ না থাকে তাহলে সাজা বহাল থাকবে। যদি আপিল করা যায়, তাহলে আপিল নিষ্পত্তি সাপেক্ষে যা হয়, সেটি করা হবে।