ঢাকার প্রস্তাবিত প্রথম পাতালরেল (মেট্রোরেল লাইন-১) নির্মাণের অপেক্ষা বাড়ছে তো বাড়ছেই। অপেক্ষার সঙ্গে বাড়ছে নির্মাণ ব্যয়ও। এ প্রকল্প শুরু হয়েছিল ২০১৯ সালে। এর সাত বছর পর প্রকল্পের সামগ্রিক অগ্রগতি ৭ শতাংশ। আর্থিক অগ্রগতি আরও কম, মাত্র ৩ শতাংশ।
পাতালরেলের আরেক প্রকল্পের (মেট্রোরেল লাইন-৫) অনুমোদন ও প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছিল ২০১৬ সালে। এর ১০ বছর পর এ প্রকল্পের সামগ্রিক অগ্রগতি ১৬ শতাংশ; যা খুবই হতাশাজনক। এদিকে সময়ের সঙ্গে ডলারের দর বৃদ্ধির কারণে মেট্রোরেল লাইন-১ ও ৫-এর ব্যয় বাড়িয়ে দ্বিগুণ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। শুরুতে প্রকল্প দুটির অনুমোদিত ব্যয় ছিল প্রায় ৯৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। এখন প্রথম সংশোধিত প্রস্তাবে তা বেড়ে দাঁড়াচ্ছে প্রায় ২ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা। আজ প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভা ডাকা হয়েছে। সেখানে এ দর ও মেয়াদ বৃদ্ধির প্রস্তাব অনুমোদনের সুপারিশ করা হতে পারে। প্রকল্প দুটির ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাবসংক্রান্ত পিইসির প্রস্তুত করা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এমআরটি লাইন-১-এর প্রকল্প পরিচালক মো. সারওয়ারউদ্দীন খান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমাদের সব ধরনের তথ্য এমডির কার্যালয় থেকে নেওয়ার নিয়ম রয়েছে।’ তবে প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটা তো সময় এবং ডলারের দরবৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়। কারণ সাত বছর কেটে গেছে, অথচ এখনো মূল কাজই শুরু করতে পারিনি।’ সূত্র জানান, মেট্রোরেল লাইন-৫-এর সামগ্রিক অগ্রগতি ১৬ শতাংশ। এ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছিল ২০১৬ সালে। এর ব্যয় বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ৪১ হাজার থেকে ৯৩ হাজার কোটি টাকায়। লাইন-১-এর ব্যয় বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ৫২ হাজার কোটি থেকে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা। এ প্রকল্প নির্মাণের মেয়াদও বাড়ছে ছয় থেকে নয় বছর। পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভার কার্যপত্রে উঠে এসেছে এসব তথ্য। ব্যয়বৃদ্ধির বিভিন্ন খাতের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে কমিশন।
ওই প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, ২০১৯ সালে অনুমোদন পাওয়া এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পের মূল ব্যয় ছিল ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা। প্রথম সংশোধিত প্রস্তাবে তা বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ১ লাখ ২০ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যয় বাড়ছে ৬৮ হাজার ২৩৩ কোটি টাকা বা প্রায় ১৩০ শতাংশ। জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত প্রকল্পটির আর্থিক অগ্রগতি মাত্র ৩ দশমিক ২৪ শতাংশ এবং বাস্তব অগ্রগতি ৭ দশমিক ৩০ শতাংশ। অথচ মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পটি শেষ করার কথা ছিল। এখন মেয়াদ বাড়িয়ে ২০৩৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এদিকে এমআরটি লাইন-৫ নর্দান রুটের অবস্থাও খুব একটা ভিন্ন নয়। ২০১৯ সালে অনুমোদিত এ প্রকল্পের মূল ব্যয় ছিল প্রায় ৪১ হাজার ২৭৯ কোটি টাকা। সংশোধিত প্রস্তাবে ব্যয় বেড়ে প্রায় ৯৩ হাজার ১৯১ কোটি টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে অতিরিক্ত ব্যয় যোগ হচ্ছে প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা বা প্রায় ১২৬ শতাংশ। জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত প্রকল্পটির আর্থিক অগ্রগতি প্রায় ৯ দশমিক ৪৬ এবং বাস্তব অগ্রগতি ১০ দশমিক ২০ শতাংশ। এর নির্মাণ ২০২৮ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখন তা বাড়িয়ে ২০৩৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
দুই প্রকল্পের ব্যয়বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময়হার। লাইন-১-এর মূল ডিপিপিতে ১ ডলারের মূল্য ধরা হয়েছিল ৮৫ টাকা ৮০ পয়সা। সংশোধিত হিসাবে তা বেড়ে প্রায় ১২৩ টাকা ধরা হয়েছে। লাইন-৫-এর ক্ষেত্রেও ডলারের মূল্য ৮৪ টাকা ৫০ পয়সা থেকে বেড়ে ১২৩ টাকা ৮২ পয়সা হয়েছে। পাশাপাশি কভিড-১৯-পরবর্তী বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় সংকট, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, জ্বালানি ও নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি, দেশে মূল্যস্ফীতি এবং করের হার বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে। সরকারের স্বাধীন বিশেষজ্ঞ কমিটিও মূল্যস্ফীতি, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি ও করকে ব্যয়বৃদ্ধির বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তবে শুধু বিনিময়হার বা মূল্যস্ফীতি দিয়ে ব্যয়বৃদ্ধির পুরোটা ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না। প্রকল্পের বিস্তারিত নকশায় পরিবর্তনও বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
লাইন-৫-এর ক্ষেত্রে বিভিন্ন নির্মাণ প্যাকেজে দরপত্রের দামও মূল প্রাক্কলনের তুলনায় অনেক বেশি এসেছে। একটি ভূগর্ভস্থ প্যাকেজের মূল প্রাক্কলন ছিল ৩ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা। পরে পরামর্শক প্রাক্কলন করেন ৫ হাজার ২১৩ কোটি টাকা। কিন্তু সর্বনিম্ন দরপ্রস্তাব আসে ১১ হাজার ১৭৮ কোটি টাকা। আরেকটি প্যাকেজের মূল প্রাক্কলন ৪ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকার বিপরীতে সর্বনিম্ন দরপ্রস্তাব এসেছে ১৫ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা। ফলে প্রশ্ন উঠছে-প্রাথমিক প্রাক্কলন বাস্তবসম্মত ছিল নাকি প্রকল্প প্রস্তুতির পর্যায়েই বড় ধরনের ঘাটতি ছিল?
লাইন-১ প্রকল্পে সুপারভিশন কনসালট্যান্সি খাতে ব্যয়বৃদ্ধিও পরিকল্পনা কমিশনের নজরে এসেছে। মূল ডিপিপিতে ২২ হাজার ৬৭১ জনমাসের (পারিশ্রমিক ব্যয়) জন্য বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা। সংশোধিত প্রস্তাবে জনমাস বাড়িয়ে ২৮ হাজার ৬০০ করার পাশাপাশি ব্যয় বাড়িয়ে ৩ হাজার ৪৩২ কোটি ৭০ লাখ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ শুধু এ খাতেই অতিরিক্ত প্রায় ২ হাজার ৪৩৩ কোটি টাকা প্রয়োজন হচ্ছে। কেন এত অতিরিক্ত জনমাস প্রয়োজন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে কমিশন। এ ছাড়া লাইন-৫-এর ক্ষেত্রেও পরামর্শক সেবা, ডিজাইন, টেন্ডার সহায়তা, নিরাপত্তা অডিটসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে।
সূত্র জানান, ব্যয়বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে সরকারের অর্থায়ন ও বৈদেশিক ঋণও। লাইন-১-এ জিওবি অংশ ১৩ হাজার ১১১ কোটি থেকে বেড়ে ৩৫ হাজার ২৫৯ কোটি এবং জাইকার ঋণ ৩৯ হাজার ৪৫০ কোটি থেকে বেড়ে ৮৫ হাজার ৫৩৬ কোটি টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে।
লাইন-৫-এ জিওবি প্রায় ১২ হাজার ২২২ কোটি থেকে বেড়ে ২৪ হাজার ২৬০ কোটি এবং প্রকল্প ঋণ প্রায় ২৯ হাজার ১১৭ কোটি থেকে বেড়ে ৬৮ হাজার ৯৩১ কোটি টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এজন্য শুধু নির্মাণ ব্যয় নয়, ভবিষ্যতে এসব প্রকল্পের ঋণ পরিশোধের চাপও বাড়বে।