বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুম হয়ে এখনো সন্ধান মেলেনি এমন ২৫০ জনের ঘটনা একসঙ্গে বিচারিক প্রক্রিয়ায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন। এর মধ্যে বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলমসহ বিভিন্ন সময়ে গুমের ঘটনা রয়েছে। এসব ঘটনায় একই ধরনের প্যাটার্ন পাওয়ায় এগুলোকে ‘ব্যাপক ও পদ্ধতিগত’ অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তদন্ত শেষ করতে পাঁচজন বিশেষ তদন্ত কর্মকর্তা কাজ করছেন। আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যেই তদন্ত প্রতিবেদন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আকারে ট্রাইব্যুনালে দাখিল করে ২৫০ ব্যক্তির গুমের ঘটনা একক বিচারে আনার চেষ্টা চলছে বলে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানিয়েছেন প্রসিকিউশন।
এদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গুম-নির্যাতন ও গুমের ফলে হত্যার ঘটনায় চলমান তিন মামলার বিচারও শেষের পথে। এসব মামলায় সাক্ষীদের জবানবন্দিতে গুম করে গোপন বন্দিশালায় আটকে রাখা, নির্যাতন এবং তুলে নেওয়ার পর নিখোঁজ করে দেওয়ার নানা রোমহর্ষক বর্ণনা উঠে আসছে। অন্যদিকে গুমের শিকার পরিবারগুলো থেকে এই ধরনের মামলার বিচার ও তদন্তে ধীরগতির অভিযোগ করা হচ্ছে। তাদের দাবি, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিশেষ বিশেষ কিছু অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়েছে। এখন তারা রাজনৈতিক বিবেচনা থেকে মুক্তি চায়।
এমন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আজ ৩০ আগস্ট পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। জাতিসংঘ ২০১০ সালে ৩০ আগস্টকে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। ২০১১ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। দিবসটিকে কেন্দ্র করে বাণী দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বাণীতে গুমকে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বর্তমান সরকার গুমের প্রতিটি ঘটনা তদন্ত করে বিচার কার্যক্রম শুরু করেছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে গুমের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ বন্ধে পৃথক আইনি কাঠামো প্রণয়ন করা হচ্ছে। এ ছাড়া বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে পৃথক বাণী দিয়েছেন।
প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় ২০১১ থেকে ২০২৪ সালের আগস্টের আগপর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে গুমের ঘটনায় ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশনে তিন শতাধিক অভিযোগ দাখিল হয়েছে। এর মধ্যে যাচাইবাছাই করে ২৫০টি ঘটনা একসঙ্গে করে একটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগে আনা হচ্ছে। এই ২৫০ জন জীবিত না মৃত, সেটিও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। দায়ের হওয়া অভিযোগগুলোর মধ্যে ১৫০ জন গুমের ঘটনায় ‘মায়ের ডাক’ এবং ৬০ জন গুমের ঘটনায় ‘আমরা গুম পরিবার’ অভিযোগ দাখিল করেছে। বিএনপির পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যক্তিসংগঠন থেকে সব মিলিয়ে তিন শতাধিক অভিযোগ দায়ের হয়েছে।
প্রসিকিউশন জানিয়েছে, ২৫০ ব্যক্তির ঘটনা একক বিচারে আনার চেষ্টা করা হলেও প্রত্যেকের ঘটনায় আলাদা কাউন্ট ও অভিযোগ থাকবে। যার বিরুদ্ধে যে ধরনের প্রমাণ পাওয়া যাবে, সেই অনুযায়ী আসামিদের পরিচয় ও অভিযোগ নির্ধারণ করা হবে। তদন্তে এরই মধ্যে প্রত্যেক ব্যক্তিকে কোথা থেকে, কবে এবং কীভাবে তুলে নেওয়া হয়েছিল, তার তথ্য চিহ্নিত করা হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য নেওয়া হয়েছে। একাধিকবার গণশুনানি করা হয়েছে। অনেকের বক্তব্য রেকর্ড করা হয়েছে। বিভিন্ন ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য আলামতও সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রসিকিউশনের মতে, আলাদা আলাদাভাবে বিচার করার পরিবর্তে একটি বিচারের মধ্যে আনতে পারলে সময় বাঁচবে এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে এসব ঘটনা যে একই ধরনের প্যাটার্নে এবং ব্যাপকভাবে সংঘটিত হয়েছে, সেটিও আদালতের কাছে তুলে ধরা সম্ভব হবে।
গুমের শিকার পরিবারগুলো থেকে ধীরগতির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, গণ অভ্যুত্থানের মামলাগুলোর সব তথ্যপ্রমাণ যেমন চোখের সামনে রয়েছে, গুমের ঘটনার অভিযোগগুলোর ক্ষেত্রে ঠিক উল্টো। এ ধরনের মামলার এখন পর্যন্ত অনেক গুমের শিকার ব্যক্তি ফিরেও আসেননি। তিনি বলেন, যেহেতু বিভিন্ন বাহিনী এই গুমের ঘটনা ঘটাত, তারা পরিকল্পিতভাবে তথ্যপ্রমাণ নষ্ট করে ফেলত। তাই একটু সময় লাগবে।
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে পরিবারগুলোর সঙ্গে নিয়মিত বসছি আমরা। আগামী ৬ সেপ্টেম্বর গুমের শিকার পরিবারের সদস্যদের আবারও শুনানি নেওয়া হবে। এরপর প্রতি সপ্তাহে তদন্তের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হবে। সেপ্টেম্বরের মধ্যেই ২৫০ জনের বিষয়ে একটি সমন্বিত রিপোর্ট দাখিলের চেষ্টা চলছে।’
তদন্ত চলছে সালাহউদ্দিন আহমদ গুমের মামলাও : গুমের পর যাঁরা ফিরে এসেছেন, তাঁদের ঘটনাও আলাদাভাবে তদন্ত করছে প্রসিকিউশন। এর মধ্যে বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ গুমের অভিযোগের তদন্তও এগিয়েছে। এ ঘটনায় ভারতের আদালতের নথি সংগ্রহ করেছে তদন্ত সংস্থা। প্রসিকিউশনের দাবি, ভারতীয় আদালতের নথিতে ভুক্তভোগী, তাঁর পরিবারের সদস্য, চিকিৎসক এবং তাঁকে উদ্ধারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য রয়েছে। এসব নথি পর্যালোচনায় বাংলাদেশ থেকে অপহরণ করে ভারতে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। এরই মধ্যে এই মামলায় সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, এ তদন্তও প্রায় শেষ পর্যায়ে। মূল তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মধ্যে অনেকে ইতোমধ্যে কারাগারে রয়েছেন। তদন্তের ভিত্তিতে আরও কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের প্রক্রিয়াও চলছে।
শেষের পথে তিন মামলার বিচার : গুমের ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বর্তমানে তিনটি মামলার বিচারিক কার্যক্রম চলছে। এর মধ্যে জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে ২০০-এর বেশি গুম-খুনের অভিযোগ রয়েছে। মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ডিজিএফআইয়ের জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টার (জেআইসি) ও টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে গুম-নির্যাতনের ঘটনায় করা পৃথক দুই মামলা সেনা কর্মকর্তাদের বিচারও চলছে ট্রাইব্যুনালে। এসব মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণের মাধ্যমে গুমের বিভিন্ন ঘটনা এবং সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা সম্পর্কে তথ্য উঠে আসছে।
এই তিন মামলাসংশ্লিষ্ট প্রসিকিউটর শাঈখ মাহাদী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, জিয়াউল আহসানের মামলায় ২০ জনের বেশি ব্যক্তিকে সাক্ষী করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত ৯ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা শেষ হয়েছে। এই মামলায় ভুক্তভোগীর সংখ্যা ২০০-এর বেশি। তিনি বলেন জেআইসিতে ২৩ জনকে গুম-নির্যাতনের মামলায় এখন পর্যন্ত ৭ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। এই মামলায় ৪০ জনের বেশি সাক্ষী রয়েছেন। পাশাপাশি ১৪ জনকে গুম-নির্যাতনের ঘটনায় করা টিএফআই সেলের মামলায় ৩০ জনের বেশি সাক্ষীর মধ্যে ৭ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। তিনটি মামলায়ই আগামীকাল সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য দিন ধার্য রয়েছে।
সাক্ষ্যে বন্দিশালার ভয়াবহতা : চলমান গুমের তিনটি মামলাতেই সাক্ষীদের জবানবন্দিতে উঠে আসছে ভয়াবহ সব তথ্য। জেআইসিতে গুম করে রাখার মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন নূরে আলম। তাঁর জবানবন্দিতে উঠে এসেছে বন্দিশালার অমানবিক পরিবেশের বর্ণনা। নূরে আলমের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁকে যে সেলে রাখা হয়েছিল, সেটি এতটাই ছোট ছিল যে সেখানে শুয়ে পড়লে তাঁর পা শৌচাগার পর্যন্ত চলে যেত। সেলের মধ্যেই ছিল শৌচাগার ও পানির ব্যবস্থা।
বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলীকে গুমের ঘটনাও উঠে এসেছে ট্রাইব্যুনালের সাক্ষ্যে। সেনাসদস্য ইমরুল কায়েস তাঁর জবানবন্দিতে ইলিয়াস আলীকে গুমের আগে ও পরে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা সম্পর্কে তথ্য দেন। ইমরুল কায়েস সে সময় জিয়াউল আহসানের সঙ্গে কাজ করতেন। তাঁর জবানবন্দি অনুযায়ী, ইলিয়াস আলীকে গুমের আগে মহাখালী এলাকায় একটি মাইক্রোবাসে অপেক্ষা করার বিষয়টি তিনি জানতে পারেন। পরে গণমাধ্যমে ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হওয়ার খবর জানতে পারেন বলে সাক্ষ্যে জানান তিনি।
তদন্ত ও বিচার যেন রাজনৈতিক বিবেচনায় না হয় : অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিশেষ কয়েকটি মামলায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন মায়ের ডাক-এর সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম তুলি। গত মঙ্গলবার চিফ প্রসিকিউটরের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে তিনি সাংবাদিকদের কাছে এমন দাবি করেন। তিনি বলেন, গণ অভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রত্যাশা ছিল তাঁদের দেওয়া গুমের অভিযোগ তদন্ত ও বিচার ট্রাইব্যুনালে গতি পাবে। মায়ের ডাক থেকে প্রায় ১৫০টির মতো গুমের অভিযোগ তারা ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে দিয়েছেন। এক যুগের বেশি সময়ের তথ্য-উপাত্ত তাঁরা দিয়েছেন। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের এক বছর তিন মাস তাঁরা কোনো তদন্ত দেখেননি।
গুম কমিশনে দেড় হাজার অভিযোগ : ২০২৪ সালের গুমসংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারি গঠনের পর তাদের কাছে ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ জমা পড়ে। এর মধ্যে ১১৩টি অ-যোগ্য মামলা বাদ দেওয়ার পর ১ হাজার ৫৬৯টি অভিযোগ প্রকৃত গুমের ঘটনা হিসেবে যাচাই হয়। এই কমিশনের হিসাবে, ১ হাজার ২৮২ জন বিভিন্ন মেয়াদে অবৈধ আটকাবস্থার পর ফিরে এসেছেন। ২৫১ জন কখনো ফিরে আসেননি। ৩৬ জনের লাশ পরে উদ্ধার হয়েছে (নদীতে গুলিবিদ্ধ অবস্থায়)। এই ২৫১ জনের তাঁদের অনেকেরই ১০, ১২ কিংবা ১৪ বছর ধরে কোনো খোঁজ নেই।
গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সাবেক সদস্য ও মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ১ হাজার ৫৬৯ জন গুমের শিকার হয়েছেন, যাঁদের প্রত্যেককে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তুলে নিয়ে গিয়েছিল। এই ব্যক্তিদের মধ্যে এখনো ২৫১ জন ফিরে আসেননি এবং তাঁদের পরিণতি সম্পর্কেও জানা যায়নি। তবে সরকার এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর এখনো সুযোগ আছে সেগুলো নিয়ে কাজ করার। তারা চাইলে ওই সব গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিণতি কী হয়েছিল, তা বের করতে পারবে।