Image description

জনপ্রিয়তা, জনগ্রহণযোগ্যতা ও আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা এই তিন মানদণ্ডে আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে একক প্রার্থী চূড়ান্ত করতে চায় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল বিএনপি। একক প্রার্থী চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে ইতিমধ্যে দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অন্তত সপ্তাহে একদিন জেলা নেতাদের সঙ্গে এ নিয়ে বৈঠক করছেন। তাদের উদ্দেশে তিনি বরাবরই বলছেন, আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ। দলীয় প্রতীকে আগামীতে স্থানীয় নির্বাচন হবে না তাই দলের পক্ষে একক প্রার্থী চূড়ান্ত করার জন্য সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হলে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারির কথা জানানো হচ্ছে। এদিকে দলের দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, জাতীয় নির্বাচনের সময় দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে বহিষ্কার হয়েও ১৯০ জন বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মাঠে ছিলেন। এবার দলীয় প্রতীকবিহীন এ নির্বাচনে একক প্রার্থী নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ বিএনপির। তবে সম্ভাব্য বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে নানামুখী কৌশল নেওয়া শুরু করেছে দলটি।

জানতে চাইলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কেউ বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী হলে তাঁর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কারা প্রার্থী হবেন, তা স্থানীয় নেতা-কর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হবে। তিনি আরও বলেন, দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রতিটি নির্বাচনে দল থেকে একজন একক প্রার্থী দেওয়া হবে। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কেউ বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী হলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের নেতারা সবকিছু যাচাই-বাছাই করে ইউপি নির্বাচনে যোগ্য প্রার্থীকে সমর্থন দেবেন। জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, নির্বাচনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর চেয়ে নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতিই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কমিশন তাদের সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করে যথাসময়ে তফসিল ঘোষণা করবে। তবে একটি গণতান্ত্রিক দল হিসেবে যে যার অবস্থান থেকে নির্বাচনি প্রস্তুতি নেবে- এটাই স্বাভাবিক।

বিএনপিসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে দলীয় প্রার্থী বাছাই শুরু করেছে ক্ষমতাসীন বিএনপি। সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। প্রার্থী বাছাইয়ে বিগত আন্দোলন ও সংগ্রামে রাজপথে ভূমিকা রাখা নেতাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। দলের ত্যাগী নেতাদেরও মূল্যায়ন করা হবে প্রার্থী দেওয়ার ক্ষেত্রে। দেখা হচ্ছে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিজ এলাকায় জনপ্রিয়তা এবং গ্রহণযোগ্যতার বিষয়। এসব কিছু যাচাই-বাছাই শেষে নির্বাচনে প্রার্থী চূড়ান্ত করছে বিএনপি। বিএনপির নাম ভাঙিয়ে যারা সুবিধা নিচ্ছে তাদের বিষয়েও দল সতর্ক রয়েছে। অন্যদিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে মাঠপর্যায়ে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমে গতি আনার সুযোগ হিসেবেও দেখছে বিএনপি।

সূত্রটি জানায়, দেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দল হিসেবে স্থানীয় নির্বাচনে প্রতিটি এলাকায় একাধিক প্রার্থী থাকা স্বাভাবিক। এজন্য এসব নেতার মধ্যে কীভাবে সমন্বয় করা যায় সেটা নিয়ে দল কাজ করছে। অনানুষ্ঠানিকভাবে প্রতিটি এলাকায় একক প্রার্থী ঠিক করার কাজ চলছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে যেসব দলীয় নেতাকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়, এর মধ্যে থেকে কয়েকজন স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও প্রার্থী করার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে তা নির্ভর করবে তাদের কাজের ওপর। ইতিমধ্যে নিয়োগ পাওয়ার পর থেকেই তাদের কাজ মূল্যায়ন করা হচ্ছে। যারা ভালো কাজ করবেন তাদের দল মূল্যায়ন করবে।

জানা গেছে, ইতিমধ্যে রংপুর বিভাগসহ বেশ কয়েকটি জেলার শীর্ষ নেতাদের নিয়ে বৈঠক করেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং দ্রুত দলের পুনর্গঠন কার্যক্রমে ইতি টানতে পরামর্শ দেন তারেক রহমান। বিএনপি ও অঙ্গ সহযোগী সংগঠনগুলোকে শক্তিশালী ও গতিশীল করতে দল পুনর্গঠন, মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির বিলুপ্তি এবং জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন এমনকি ওয়ার্ড পর্যায়ে নতুন কমিটি দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, বৈঠকে দলীয় প্রতীকবিহীন স্থানীয় নির্বাচন, কিন্তু দলের প্রার্থী যেহেতু থাকছেন সে বিষয়ে জেলা নেতারা তারেক রহমানের কাছে পরামর্শ চান। জবাবে বিএনপিপ্রধান বলেছেন, দল ও দলের অঙ্গ সহযোগী সংগঠনগুলোর পুনর্গঠনের কার্যক্রম দ্রুততার সঙ্গে ইতি টানতে বলেছেন। তবে তড়িঘড়ি করে আবার ভিন্ন দল কিংবা বিতর্কিতদের যেন অন্তর্ভুক্ত করা না হয় সেই বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলের একক প্রার্থী নির্ধারণ করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার নির্দেশনাও দেন দলীয় প্রধান। ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সল আমিন বলেন, সংগঠনকে শক্তিশালী ও গতিশীল করার জন্য বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান আমাদের কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন। সামনে ইউনিয়ন পরিষদসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে আমাদের সামগ্রিক করণীয় কী হবে, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এদিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগেই দল গোছানোর কার্যক্রম শেষ করতে চাইছেন বিএনপির নীতিনির্ধারকরাও। তাঁরা বলছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনি বৈতরণি পার হতে হলে নতুনভাবে দল গোছানোর বিকল্প নেই। কারণ তৃণমূলে বিএনপিকে পুনর্গঠন ছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিলে সাংগঠনিক বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে। তাই এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ‘কেন্দ্র থেকে তৃণমূল এবং তৃণমূল থেকে কেন্দ্র’ পর্যন্ত নতুন গতি আসবে এবং ঝুলে থাকা সাংগঠনিক প্রক্রিয়াও শেষ করার সুযোগ তৈরি হবে।

গত জাতীয় নির্বাচনে অর্ধশতাধিক আসনে দলের নেতারা ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ হওয়ায় তৃণমূলের অনেক জায়গায় কোন্দল ও বিভক্তি তৈরি হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতার আলোকেই এবার তারেক রহমান নেতাদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানাচ্ছেন। স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, দলীয় প্রতীক না থাকলেও স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থীদের বিষয়ে দলের সিদ্ধান্ত যেন সামষ্টিক হয় এবং একক প্রার্থীর পক্ষে সবাই একযোগে কাজ করেন। তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত ঝুলে থাকা সাংগঠনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দলে নতুন গতি সঞ্চার করার ওপর জোর দিয়েছেন। তড়িঘড়ি করে কমিটি গঠন করতে গিয়ে যাতে কোনো বিতর্কিত বা অন্য দলের অনুপ্রবেশকারী স্থান না পায়, তা নিশ্চিত করা। মাঠপর্যায়ে তুলনামূলক তরুণ, সক্রিয় ও ত্যাগী নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বে নিয়ে আসতে দায়িত্বশীল নেতাদের নির্দেশনা দিয়েছেন বলেও বৈঠক সূত্রে জানা গেছে। এদিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা এলাকায় শুভেচ্ছা-সংবলিত পোস্টার-ফেস্টুন সাঁটিয়েছেন। সমাজ মাধ্যমেও প্রচারণা ও বিভিন্ন ইস্যুতে সোচ্চার ভূমিকা রাখছেন। স্থানীয় সংসদ সদস্যদের সমর্থন পেতে অনেকেই জোর তদবির-লবিং শুরু করেছেন।