রাজধানীর মোহাম্মদপুরে আসাদ অ্যাভিনিউতে অবস্থিত দ্য পিপলস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ। ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নেই কোনো স্থায়ী ক্যাম্পাস। দীর্ঘদিন ধরে ভাড়া করা ভবনে কার্যক্রম চালানো বিশ্ববিদ্যালয়টিতে নেই পূর্ণকালীন উপাচার্য (ভিসি), উপ-উপাচার্য (প্রোভিসি) কিংবা ট্রেজারার বা কোষাধ্যক্ষ। ভারপ্রাপ্ত দিয়েই চলছে নীতিনির্ধারণী সব কার্যক্রম।
শুধু তাই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সর্বশেষ তথ্যমতে, ৭১৪ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষকের সংখ্যা মাত্র ৮৬ জন। এর মধ্যে ৪১ জনই খণ্ডকালীন। তাদের মধ্যে বেশিরভাগই আবার প্রভাষক। স্থায়ী ও খণ্ডকালীন মিলিয়ে অধ্যাপকের সংখ্যা মাত্র ৯ জন। একই অবস্থা প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটিতে। ২০০৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি ও ট্রেজারার থাকলেও নেই প্রোভিসি ও স্থায়ী ক্যাম্পাস। আবার দুই সহস্রাধিক শিক্ষার্থী থাকলেও শিক্ষক সংখ্যা ২৩৯ জন। এর মধ্যে পূর্ণকালীন শিক্ষক ৬১ জন, আর খণ্ডকালীন ১৭৮। মোট শিক্ষকদের মধ্যে ১৯৫ জনই প্রভাষক। বিপরীতে অধ্যাপকের সংখ্যা মাত্র তিনজন।
অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থাও একই। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস থাকলেও নেই পূর্ণকালীন ভিসি-প্রোভিসি কিংবা ট্রেজারার। ২ হাজার ৩০৯ জন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়টিতে অধ্যয়ন করলেও শিক্ষকের সংখ্যা মাত্র ১৭৫ জন। এর মধ্যে ৬৯ জনই খণ্ডকালীন। অধ্যাপকের সংখ্যা মাত্র ১৪ জন। বাকিদের বেশিরভাগই প্রভাষক।
শুধু এই তিনটি নয়, দেশের বেশিরভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্রও প্রায় একইরকম। কোনোটির নেই স্থায়ী ক্যাম্পাস, কোনোটিতে নেই যোগ্য শিক্ষক, পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী, কোনোটির নেই স্থায়ী সনদ, আবার কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ তিন প্রশাসনিক পদই দীর্ঘদিন থেকে শূন্য। আবার কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকেই কখনোই করেনি সমাবর্তন। এ ছাড়া নতুন জ্ঞান সৃষ্টি বা গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কাজ হলেও বেশিরভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েরই এদিকে নজর নেই। এভাবেই জোড়াতালি দিয়ে দেশের বেসরকারি খাতে চলছে উচ্চশিক্ষা কার্যক্রম। সম্প্রতি শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনও এক অনুষ্ঠানে বলেন, দেশে অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে, যেগুলোর মান মোটেও সন্তোষজনক নয়। সেগুলো চিহ্নিত করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে ইউজিসিকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে।
শিক্ষা বিশ্লেষকরা বলছে, ইউজিসির নতজানু অবস্থানের কারণে এসব সংকট সমাধান করা সম্ভব হচ্ছে না। আর এসব সংকট সমাধান না করে কোনোভাবেই মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।
ভিসি-প্রোভিসি-ট্রেজারার নেই ১৬ বিশ্ববিদ্যালয়ে, ৩১টিতে নেই ভিসি, ৮৬টিতে প্রোভিসি: ইউজির সর্বশেষ তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১১৬টি। এর মধ্যে নানা কারণে ৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। বাকি ১০৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩ লাখ ৫৮ হাজার ৪১৪ জন। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে পূর্ণকালীন ভিসি, প্রোভিসি ও ট্রেজারার ছাড়াই চলছে ১৬টি বিশ্ববিদ্যালয়। ১০৭টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে মধ্যে ভিসি নেই ৩১টিতে, প্রোভিসি নেই ৮৬টিতে। এর মধ্যে ভিসি-প্রোভিসি নেই ২৯টিতে। আর ট্রেজারার
নেই ৪০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে। এর বাইরে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই অধ্যাপকসহ জ্যেষ্ঠ শিক্ষক। দীর্ঘদিন ধরে ভারপ্রাপ্ত দিয়ে চলছে দায়সারা কার্যক্রম। ফলে প্রশাসনিক কাজের পাশাপাশি বিঘ্ন ঘটছে একাডেমিক কার্যক্রমে।
ভিসি, প্রোভিসি ও ট্রেজারার নেই এমন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হলো দি পিপলস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, চট্টগ্রামের সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি, ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, রয়েল ইউনিভার্সিটি অব ঢাকা, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট নর্থ ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়, কিশোরগঞ্জের ঈশাখাঁ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও ডা. মমতাজ বেগম ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, কুষ্টিয়ার রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয় এবং লালন বিজ্ঞান ও কলা বিশ্ববিদ্যালয়, সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, খুলনা খান বাহাদুর আহসান উল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, নারায়ণগঞ্জের ইউনিভার্সিটি অব স্কিল এনরিচমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজি।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী, প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, প্রোভিসি, কোষাধ্যক্ষ, রেজিস্ট্রারের মতো ব্যক্তিদের পূর্ণকালীন ভিত্তিতে নিয়োগদান বাধ্যতামূলক। এর মধ্যে ভিসি, প্রোভিসি ও ট্রেজারার—এই তিন পদে নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর। তবে প্রাথমিক কাজটি করে থাকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ইউজিসির মাধ্যমে প্রস্তাব আসার পর তারা সেটি সরকারের কাছে পাঠায়। সেটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে যায়।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টিজ এই তিন পদে নিয়োগ দিতে একেকটি পদের বিপরীতে তিনজন অধ্যাপকের নাম প্রস্তাব করে। সেগুলো ইউজিসির মাধ্যমে যাচাই করে সরকারের উচ্চপর্যায়ে পাঠায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সেখান থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর হিসেবে রাষ্ট্রপতি একজনকে নিয়োগ দেন। তবে অনেক প্রতিষ্ঠান যোগ্য ব্যক্তিদের প্যানেল না পাঠিয়ে নিজেদের মতো করে একটি প্যানেল পাঠায়। পরে সেটি আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেরত আসে। এরপর থমকে যায় এ নিয়োগ প্রক্রিয়া। পরবর্তীকালে ট্রাস্টি বোর্ড এবং মালিকপক্ষ তাদের পছন্দের ব্যক্তিকে ভারপ্রাপ্ত ভিসির দায়িত্ব দিয়ে কাজ চালিয়ে নেয়।
এ ছাড়াও পূর্ণকালীন ভিসি না থাকায় অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন আটকে আছে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় আবার প্রতিষ্ঠার পর কখনোই সমাবর্তন আয়োজন করেনি। তবে কতগুলো বিশ্ববিদ্যালয় এখনো সমাবর্তন করেনি, সে তালিকা নেই ইউজিসির কাছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা সমাপ্তির পর সমাবর্তন ছাড়া মূল সার্টিফিকেট তোলা যায় না। এতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পরও অনেকেই মূল সার্টিফিকেট হাতে না পাওয়ায় কর্মক্ষেত্র ও বিদেশে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে নানা বাধার মুখোমুখি হচ্ছেন।
স্থানীয় সনদ নেই ৮৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের: পাঠদান চালু থাকা ১০৭টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে মধ্যে স্থায়ী সনদ আছে মাত্র ২২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের। বাকি ৮৫টি বিশ্ববিদ্যালয় চলছে স্থায়ী সনদ ছাড়াই। ইউজিসি বলছে, স্থায়ী সনদ ছাড়া শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রাখা ‘অবৈধ ও আইনে শর্ত লঙ্ঘনের শামিল’।
ইউজিসির তথ্য অনুযায়ী, যে কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রথমে সাময়িক অনুমোদন দেওয়া হয়। সাময়িক অনুমতির মেয়াদ সাত বছর। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আবেদন করলে সরকার তিন দফায় সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় বাড়িয়ে দিতে পারে। স্থায়ী সনদ পেতে সাতটি শর্ত পূরণ করতে হয়। এই ১২ বছরের মধ্যে সব শর্ত পূরণ করতে ব্যর্থ হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি ও শিক্ষা-সংক্রান্ত সব কার্যক্রম বন্ধ করার নির্দেশনা রয়েছে আইনে। কিন্তু ইউজিসি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তাগাদা দিয়ে দায় সারছে।
স্থায়ী সনদপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হলো—ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, চিটাগং, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস এগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি, আহছানউল্লা ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, ইস্ট-ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক, ব্রাক ইউনিভার্সিটি, লিডিং ইউনিভার্সিটি, প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, সিটি ইউনিভার্সিটি, গ্রিন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, সিলেটের মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, অতীশ দ্বীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটি, বরেন্দ্র ইউনিভার্সিটি, বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি, খাজা ইউনূস আলী বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি, কাদিয়াবাদ। বাকি কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েরই সনদ নেই।
স্থায়ী ক্যাম্পাস নেই ৫৪ বিশ্ববিদ্যালয়ের: দেশে কার্যক্রম চলা ১০৭টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৫৪টির নেই স্থায়ী ক্যাম্পাস। ভাড়া করা ক্যাম্পাসে চলছে কার্যক্রম। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় আবার বাড়ি ভাড়া নিয়ে একাধিক স্থানে খুলেছে শাখা। কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে জমি কেনা হলেও ভবন নির্মাণের সামর্থ্য হয়নি। স্থায়ী ক্যাম্পাস নেই এমন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে দফায় দফায় নির্দেশ দেওয়া হলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি ইউজিসি। আবার মাঝেমধ্যে স্থায়ী ক্যাম্পাস না থাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি।
স্থায়ী ক্যাম্পাস না থাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হলো—দ্য পিপলস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অলটারনেটিভ, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, দ্য মিলেনিয়াম ইউনিভার্সিটি, ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, প্রাইম এশিয়া ইউনিভার্সিটি, আশা ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, বরেন্দ্র ইউনিভার্সিটি, নর্থ ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ, ঈশাখাঁ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, এক্সিম ব্যাংক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, সোনারগাঁও ইউনিভার্সিটি, ফেনী ইউনিভার্সিটি, পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্স, চিটাগং ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি, টাইমস ইউনিভার্সিটি, নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, রাজশাহী সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ইউনিভার্সিটি, ব্রহ্মপুত্র ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, আর পি সাহা বিশ্ববিদ্যালয়, জার্মান ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, গ্লোবাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, সিসিএন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, ইউনিভার্সিটি অব স্কলার্স, কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, এন পি আই ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, নর্দান ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টোকনোলজি, রবীদ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি, সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, রবীন্দ্র সৃজনকলা বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজ, আনোয়ার খান মডার্ন ইউনিভার্সিটি, জেডএনআরএফ ইউনিভার্সিটি অব ম্যানেজমেন্ট সায়েন্সেস, আহছানিয়া মিশন বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা খান বাহদুর আহছানউল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, বান্দরবান বিশ্ববিদ্যালয়, ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি, ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব স্কিল এনরিচমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজি, ডা. মমতাজ বেগম ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলোজি, আরটি এম আল-কবির টেকনোলজি ইউনিভার্সিটি, চট্টগ্রাম বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি, বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, তিস্তা ইউনিভার্সিটি, লালন বিজ্ঞান ও কলা বিশ্ববিদ্যালয়।
ভারপ্রাপ্ত আর প্রভাষক দিয়েই চলছে পাঠদান: ইউজিসির তথ্য মতে, পাঠদান চালু থাকা ১০৩টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষকের সংখ্যা ১৭ হাজার ৪৭৯ জন, যাদের মধ্যে পূর্ণকালীন শিক্ষক ১৩ হাজার ১৬৯ জন এবং খণ্ডকালীন শিক্ষক ৪ হাজার ৩১০ জন। এ ছাড়াও পূর্ণকালীন শিক্ষকদের মধ্যে অধ্যাপক ৯৫২ জন, সহযোগী অধ্যাপক ১ হাজার ১১৯ জন, সহকারী অধ্যাপক ৩ হাজার ৪১০ জন, প্রভাষক ৭ হাজার ৪৭৮ ও অন্যান্য ২১০ জন শিক্ষক। খণ্ডকালীন শিক্ষকদের মধ্যে অধ্যাপক ১ হাজার ৭ জন, সহযোগী অধ্যাপক ৫ হাজার ৯৯ জন, সহকারী অধ্যাপক ৬৯৮ জন, প্রভাষক ১ হাজার ৬৫০ জন ও অন্যান্য পদে ৩৫৬ জন রয়েছেন। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডিধারী শিক্ষকের সংখ্যা মাত্র ৩ হাজার ৬০৩। যাদের মধ্যে পূর্ণকালীন ২ হাজার ৭২ এবং খণ্ডকালীন শিক্ষক ১ হাজার ৫৩১ জন।
ইউজিসি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি বিভাগ বা প্রোগ্রামের খণ্ডকালীন শিক্ষক সংখ্যা পূর্ণকালীন শিক্ষক সংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের বেশি হবে না। এই নীতি অনুযায়ী ২০২৩ সালের অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্ণকালীন শিক্ষকের তুলনায় খণ্ডকালীন শিক্ষকের সংখ্যা বেশি, যা আইন অনুযায়ী সন্তোষজনক নয়।
এ ছাড়াও বিশ্বব্যাপী উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর গড় অনুপাতের ন্যূনতম মানদণ্ড ধরা হয় ১:২০। অর্থাৎ প্রতি ২০ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন করে শিক্ষক থাকতে হবে; কিন্তু অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ই এই শর্ত পূরণ করতে পারেনি।
যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা: দ্য পিপলস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু কামাল মো. মাহবুবুজ্জামান কালবেলাকে বলেন, ট্রাস্টি বোর্ড নিয়ে জটিলতার কারণে এতদিন প্রশাসনিক শীর্ষ পদগুলো পূরণ করা যায়নি। এ মাসেই আমরা ভিসি ও ট্রেজারার নিয়োগের প্যানেল পাঠাব। বাকি সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা চলছে।
অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মো. আব্দুল কাইয়ুম সরদার বলেন, দুমাস আগে আমরা ভিসি ও ট্রেজারার নিয়োগের প্যানেল পাঠিয়েছি। তবে এখনো তা অনুমোদন হয়নি। আবার সাম্প্রতিক সময়ে আমরা কিছু সিনিয়র শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছি। বাকি সমস্যার সমাধানও দ্রুত হবে।
ইউজিসির সাবেক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আলমগীর কালবেলাকে বলেন, বেসরকারি খাতে উচ্চ শিক্ষা নিয়ে এসব সংকট দীর্ঘদিনের। তা সমাধানের সক্ষমতা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নেই, এমনকি আমাদের দেশেরও নেই। বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও ভালো শিক্ষক পাচ্ছে না। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক দিয়ে পাঠদান চালাচ্ছে। কারণ শিক্ষক তৈরি করার যে কাঠামো তা গড়তে পারেনি। আর স্থায়ী ক্যাম্পাস, সনদ, প্রশাসনিক শীর্ষ পদ পূরণ করানোর জন্য ইউজিসিকে শক্ত অবস্থানে থাকতে হবে। সোজা কথা আইনে আছে, ১২ বছরের মধ্যে স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে হবে। স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার শর্তও আইনে খুব কম। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে ২০১০ সালের যে আইন রয়েছে তা অনেকেই মানছে না।
তিনি বলেন, ইউজিসিসহ তদারকি প্রতিষ্ঠানগুলো শক্ত অবস্থানে না থাকার কারণে এসব সংকট তৈরি হচ্ছে। আবার আইন না মানার যে সংস্কৃতি বাংলাদেশে আছে, তা এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষতি করছে। তবে এসবের সমাধান ছাড়া শিক্ষার মান নিশ্চিত করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ম্যানেজমেন্ট বিভাগের পরিচালক মোছা. জেসমিন পারভীন কালবেলাকে বলেন, যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োজিত ভিসি, প্রোভিসি, ট্রেজারার কেউই নেই যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন কোনো প্রোগ্রাম আমরা অনুমোদন দিচ্ছি না। তাদের সমাবর্তনে আমরা কনসার্ন না দেওয়ার পাশাপাশি আমাদের কোনো প্রণোদনা, বৃত্তির অংশীজন তারা হতে পারে না। আবার বড় কোনো অনুষ্ঠানে তারা দাওয়াত পায় না। আর স্থায়ী সনদের প্রধান শর্ত হচ্ছে স্থায়ী ক্যাম্পাস থাকা। স্থায়ী ক্যাম্পাসের জন্য অনেক বিশ্ববিদ্যালয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ৫০টির অধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাসে আছে, ৩০টির বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী সনদ আছে। বাকিগুলো যেন স্থায়ী সনদ পায় সেজন্য বিভিন্ন ধাপে রাখা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ইউজিসিতে নতুন কমিশন এসেছে। এসব সমস্যা সমাধানে আমরা নতুনভাবে কাজ শুরু করেছি। আমরা তাদের (বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে) সহযোগিতা করতে চাচ্ছি। একই সঙ্গে আমাদের নির্দেশনা তারা কীভাবে পালন করবে সেই উদ্যোগ নিচ্ছি।
সার্বিক বিষয়ে ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ কালবেলাকে বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শীর্ষপদগুলো ফাঁকা রেখে কার্যক্রম চালানোর রীতি দীর্ঘদিন থেকে চলে আসছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ব্যক্তি উপাচার্য। তিনি একাডেমিক এবং প্রশাসনিক সকল দায়িত্ব পালন করেন। তাকে সহযোগিতা করেন উপউপাচার্য ও ট্রেজারার। আমাদের অবস্থান হচ্ছে সব বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য থাকা বাধ্যতামূলক। যেখানে উপাচার্য নেই সেখানে ধরে নিতে হবে একাডেমিক কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে হচ্ছে না। যথোপযুক্ত ব্যক্তিকে ওই পদে পদায়ন করা না হলে ইউজিসি যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এ ছাড়াও যেসব শর্ত আছে তা পুরোপুরি মেনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্থায়ী সনদ নিতে হবে। অন্যান্য বিধিবিধান, একাডেমিক নিয়ম কানুন এবং সংবিধিবদ্ধ যা কিছু আছে তাও সুষ্ঠুভাবে মেনে চলতে হবে।