চলতি বছরের ২০ জুন। টাঙ্গাইলের মধুপুরে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বাবুল হাদিমার (৩৫) বাড়ির পরিত্যক্ত সেপটিক ট্যাংকে একটি ছাগল পড়ে যায়। গৃহপালিত প্রাণীটি উদ্ধারে সেই ট্যাংকে নামেন বাবুল হাদিমা। দীর্ঘ সময়েও মা বের হয়ে না আসায় ১০ বছরের নেইমার ম্রংও ট্যাংকে নামেন। তারও সাড়াশব্দ না পেয়ে দুজনকে উদ্ধারে একে একে ট্যাংকে নামেন প্রতিবেশী রতন নকরেক (২৫) ও গ্যাব্রিয়েল নকরেক (৪৫)। কিন্তু চারজনের কেউই বেঁচে ফিরতে পারেননি। শুধু মধুপুরের এই চারজনই নন, প্রায়ই দেশের নানা প্রান্তে সেপটিক ট্যাংকে মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। এমন অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে-এমন কী আছে সেপটিক ট্যাংকের ভেতর, যা মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়।
রসায়নবিদরা বলছেন, সেপটিক ট্যাংক মূলত মানুষের বর্জ্য ও পয়ঃবস্তু জমা রাখার একটি বদ্ধ ব্যবস্থা। দীর্ঘদিন ধরে এসব বর্জ্য পচে সেখানে তৈরি হয় নানা ধরনের গ্যাস। ট্যাংকে জমে থাকা হাইড্রোজেন সালফাইড ও মিথেনের মতো প্রাণঘাতী গ্যাস মুহূর্তেই মানুষের স্নায়ু অকেজো করে দেয়। এজন্য আধুনিক প্রযুক্তি ও সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়া এসব ট্যাংকে নামা মানেই নিশ্চিত মৃত্যু। এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে এখনই আইন করে ম্যানুয়াল পদ্ধতির বদলে মেশিনের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন।
ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের পরিচালক (মিরপুর) ও কমিউনিটি মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. খোরশেদ আলী মিয়া যুগান্তরকে বলেন, স্বাভাবিক বাতাসে প্রায় ২১ শতাংশ অক্সিজেন থাকে। কিন্তু বদ্ধ ট্যাংকের ভেতর বিভিন্ন গ্যাস জমে অক্সিজেনের পরিমাণ বিপজ্জনকভাবে কমে যেতে পারে। অক্সিজেনের মাত্রা কমে গেলে মানুষের মস্তিষ্ক ও শরীর দ্রুত কাজ করা বন্ধ করে দেয়। প্রথমে মাথা ঝিমঝিম করা, তারপর বিভ্রান্তি, ভারসাম্য হারানো এবং শেষ পর্যন্ত অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে। এ ছাড়া সেপটিক ট্যাংকে মিথেন গ্যাসের উপস্থিতি বেশি থাকে। নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়া কেউ সেখানে নামলে বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়। হৃদযন্ত্র, ফুসফুসসহ একাধিক অঙ্গের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়ে নীরব মৃত্যু হতে পারে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মাহমুদুল হাসান যুগান্তরকে বলেন, সেপটিক ট্যাংকে বিষাক্ত গ্যাস ও অক্সিজেনের ঘাটতির কারণে প্রতিবছরই দুর্ঘটনা ঘটছে। অভিজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত ব্যক্তি ছাড়া সেপটিক ট্যাংকে নামা উচিত নয়। অক্সিজেন সিলিন্ডারসহ প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার করে প্রশিক্ষিত ব্যক্তিদেরই উদ্ধারকাজে নিয়োজিত করতে হবে। কারও নামার প্রয়োজন হলে প্রথমে একটা কুপি বাতি, মোমবাতি বা হারিকেন জ্বেলে নিচে নামাতে হবে। সেটি জ্বলন্ত অবস্থায় থাকলে অক্সিজেনের সরবরাহ আছে। আর বন্ধ হয়ে গেলে বুঝতে হবে অক্সিজেন নেই এবং বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতি রয়েছে। এটা পুরাতন পদ্ধতি হলেও প্রাথমিকভাবে দুর্ঘটনা কাটানো সম্ভব হতে পারে। এ ধরনের ঘটনায় দ্রুত ফায়ার সার্ভিসের ১০২ নম্বরে ফোন করে সহায়তা নিতে হবে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশিক্ষণ, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) লেফটেন্যান্ট কর্নেল এমএ আজাদ আনোয়ার বলেন, সেপটিক ট্যাংক, কূপসহ বিভিন্ন বদ্ধ ও ভূগর্ভস্থ স্থানে জৈব পদার্থ থেকে মিথেন, কার্বন মনোক্সাইডসহ বিভিন্ন বিষাক্ত গ্যাস জমে থাকতে পারে। এসব গ্যাস অনেক সময় গন্ধ বা অন্য কোনোভাবে বোঝা যায় না। ফলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা না নিয়ে কেউ এসব স্থানে নামলে মুহূর্তেই দুর্ঘটনার শিকার হতে পারেন।
এই কর্মকর্তা বলেন, দুর্ঘটনার পর স্বজন বা অন্যরা আবেগের বশে আক্রান্ত ব্যক্তিকে উদ্ধারের জন্য দ্রুত সেপটিক ট্যাংক বা কূপে নেমে পড়েন। এসব বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পক্ষ থেকে বিভিন্ন বিভাগে মহড়া, প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন করা হয়।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাক ড. মোহাম্মদ বিলাল হোসাইন বলেন, জনসচেতনতা তৈরির পাশাপাশি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিরাপদ সেপটিক ট্যাংক ব্যবস্থাপনার বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। প্রশিক্ষিত ও সুরক্ষা সরঞ্জামসমৃদ্ধ কর্মীর মাধ্যমে ট্যাংক পরিষ্কারের ব্যবস্থা করা, গ্যাস ও অক্সিজেনের মাত্রা পরীক্ষা করা এবং প্রয়োজনীয় বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা ছাড়া কাউকে ট্যাংকের ভেতরে প্রবেশ না করার বিষয়ে কঠোরভাবে সচেতন করতে হবে।