Image description
চুরি-ছিনতাই-মাদক, উচ্ছেদেও ফেরে ঘণ্টায় । কিশোর-কিশোরীরা দলবেঁধে থাকছে ছাপরিতে * প্রকাশ্যে চলে মাদক সেবন-বিক্রি ও অপকর্ম । অভিযান ছাড়াও নগরবাসীর সচেতনতা জরুরি । সবুজায়ন ও জনসেবামূলক কাজে ব্যবহারের তাগিদ।

রাজধানীর গুলিস্তানে স্টেডিয়ামের সামনের ব্যস্ত সড়কে চলছে শত শত গাড়ি। হঠাৎ এক কিশোর একটি প্রাইভেটকারের সাইডের অংশ খুলে নিয়ে দিল ভোঁদৌড়। চালক নামতেই মুহূর্তে উধাও সে। পল্টন মোড়ে শিকড় পরিবহণের বাসে জানালার পাশে বসে ফোনে কথা বলছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী আবু আব্দুল্লাহ। ১৮-২০ বছরের এক তরুণ জানালা দিয়ে ছোঁ মেরে মোবাইলটি নিয়ে কয়েক সেকেন্ডেই দৈনিক বাংলার দিকে চলে যায়। গাড়ি থেকে নেমে পিছু নেওয়ার আগেই অদৃশ্য হয়ে যায় ওই চোর। এসব ঘটনায় পথচারী বা উপস্থিত কারও কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি।

অপরাধের এমন সব দৃশ্য নিয়মিতই চোখে পড়ে গুলিস্তান বা পল্টনে। ভাসমান কিশোর-তরুণরা প্রকাশ্যে এভাবে চুরি বা ছিনতাই করলেও তাদের প্রতিরোধে তৎপরতা দেখা যায় না। এসব অপরাধীর বড় অংশই মেট্রোরেলের নিচে ছাপরি দিয়ে আস্তানা গেড়েছে। এতে সব সময় রাস্তায় আতঙ্ক নিয়ে চলাচল করছেন পথচারীসহ সাধারণ নগরবাসী। মেট্রোর নিচের এসব অস্থায়ী ছাপরি যেন হয়ে উঠেছে অপরাধের সাম্রাজ্য! এখানের এসব কিশোর-তরুণ চুরি, ছিনতাই, খুন, মাদক বিক্রি, ধর্ষণ থেকে শুরু করে কখনো কখনো টাকার বিনিময়েও অপরাধে ভাড়ায় খাটছে। মাঝে মধ্যে অভিযান চালিয়ে তাদের উচ্ছেদ করা হলেও কয়েক ঘণ্টা পর আবারও ফিরে আসছে আস্তানায়। রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই স্থাপনার নিরাপত্তা ও সৌন্দর্য রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকসহ নগরবিদরা।

এ এলাকায় চলাচলকারীরা বলছেন, রাজধানীর যানজট নিরসন ও আধুনিক গণপরিবহণ ব্যবস্থার প্রতীক হিসাবে মেট্রোরেল যাতায়াতে গতি আনলেও এর রক্ষণাবেক্ষণে কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা রয়েছে। উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেলের নিচের বিশাল এলাকা এখন অবৈধ স্থাপনার পাশাপাশি অপরাধীদের আস্তানায় পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন স্টেশনের নিচের ফুটপাত ও সড়কের বিশাল অংশ দখল করে চায়ের দোকান, ভ্রাম্যমাণ খাবারের স্টল, রিকশা মেরামতের গ্যারেজসহ অস্থায়ী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বসানো হয়েছে। আবার স্টেশনের বাইরের বিশাল অংশের পিলারের নিচে প্লাস্টিক, টিন ও কাপড় দিয়ে অস্থায়ী বসতি গেড়ে সাম্রাজ্য তৈরি করেছে ভাসমান অপরাধীরা।

সরেজমিন মতিঝিল থেকে উত্তরা পর্যন্ত বিশাল অংশজুড়ে মেট্রোর নিচে অবৈধ স্থাপনা ও ছাপরি ঘর দেখা গেছে। শুধু টিএসসি মোড় থেকে মতিঝিল পর্যন্ত অন্তত অর্ধশত এমন ছাপরি তৈরি করা হয়েছে। এগুলোতে থাকছে কিশোর-কিশোরীরা। গত কয়েকদিনের সরেজমিন এসব ছাপরি ঘরে ইয়াবা, গাঁজা ও ড্যান্ডিসহ (আঠা) বিভিন্ন মাদক সেবন করতে দেখা গেছে। রিকশাচালকরাও মাঝরাস্তায় গাড়ি থামিয়ে খুপরি ঘর থেকে মাদক কিনছেন ও সেবন করছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মেট্রোর নিচের ছাপরিতেও প্রকাশ্যেই কিশোর-কিশোরীদের মাদক সেবন করতে দেখা গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের প্রতিনিধি ও শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সময় তাদের সরিয়ে দিলেও কয়েক ঘণ্টা পর আবার ফিরে আসছে। কোথাও এসব ছাপরিতে শিশুদেরও দেখা গেছে।

দোয়েল চত্বরের সামনে ছাপরিতে থাকা ভাসমান কয়েকজনের সঙ্গে কথা হলে তারা নিজেদের স্বামী-স্ত্রী বলে পরিচয় দেন এবং দিনে হকারি করেন বলে জানান। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, এলাকায় চুরি ও ছিনতাইয়ের পর সেখানে আশ্রয় নেয় তারা। কয়েকদিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ থেকে শিক্ষার্থীদের ব্যাগ ও ফোন চুরিতে তাদের কয়েকজনকে আটক করা হয়।

মতিঝিলেও মেট্রোর নিচের বেশির ভাগ অংশে আস্তানা গেড়েছে ভাসমান অপরাধীরা। এক একটি ছাপরিতে ৮-১০ জন থাকছে। তারা সেখানে নেশাও করছে, আবার চুরি-ছিনতাইও করছে। ক্ষুধা লাগলে হোটেল বা মানুষের জটলার মধ্যে গিয়ে খাবার চাওয়ার ভান করে পকেট থেকে মানিব্যাগ বা মোবাইলসহ গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হাতিয়ে নিচ্ছে। কয়েকদিন আগে মতিঝিলে এক ব্যাংক কর্মকর্তার কাছে খাবার চাইতে গিয়ে তার পকেট থেকে মানিব্যাগ চুরি করে দুই যুবক। পরে তাদের গণপিটুনি দেওয়া হয়।

নগর পরিকল্পনাবিদ ও সচেতন নাগরিকরা বলেন, চুরি ও ছিনতাইয়ের পর দ্রুত এসব আস্তানায় আশ্রয় নেওয়ায় ধরা পড়া থেকে রক্ষা পাচ্ছে অপরাধীরা। শুধু তাই নয়, মেট্রোরেলের পিলারগুলোও এখন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলসহ অবৈধ পোস্টার, ব্যানার ও বিজ্ঞাপনের দখলে। এতে একদিকে যেমন মেট্রোরেলের সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে সরকারি সম্পদেরও ক্ষতি হচ্ছে। তারা আরও বলেন, মেট্রোরেলের নিচের জায়গাগুলোর কার্যকর ব্যবস্থাপনা না থাকায় সেখানে ধীরে ধীরে অপরাধপ্রবণ পরিবেশ তৈরি হয়েছে। অনেক জায়গায় ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়ায় পথচারীদের চলাচলও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এসব এলাকা দ্রুত পরিষ্কার ও দখলমুক্ত করা না হলে নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।

সংবাদমাধ্যমের তথ্যে দেখা গেছে, সম্প্রতি শাহবাগ মেট্রো স্টেশনের নিচে ১০ বছর বয়সি এক পথশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। বারডেম হাসপাতালের সামনে মেট্রোরেলের নিচে একটি অস্থায়ী ছাপরি ঘরে ওই শিশুকে নিয়ে ধর্ষণের অভিযোগে রায়হান নামে এক যুবককে আটক করে পুলিশ।

পুলিশের ভাষ্য, মেট্রোরেলের নিচের কিছু এলাকায় ভাসমান মানুষের অনিয়ন্ত্রিত অবস্থান, অপর্যাপ্ত নজরদারি এবং অস্থায়ী বসতি গড়ে ওঠার সুযোগে অপরাধীরা সক্রিয় হয়ে উঠছে। নিয়মিত অভিযান চালানো হলেও উচ্ছেদের পর আবারও একই স্থানে অবৈধ দখল ও বসতি গড়ে তুলছে।

নগরবাসীর দাবি, স্টেশন ছাড়াও মেট্রোলাইনের নিচের পুরো এলাকা সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা টহল, সিসিটিভি নজরদারি, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা এবং অবৈধ স্থাপনা ও ছাপরি ঘর উচ্ছেদে নিয়মিত অভিযান চালানো হোক।

মেট্রোরেল এলাকার নিরাপত্তায় নিয়োজিত এমআরটি পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) সিদ্দিকী তানজিলুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, ডিএমপির পাশাপাশি এমআরটি পুলিশও ভাসমানদের উচ্ছেদে প্রতিমাসে অভিযান চালাচ্ছে। এমআরটির ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে এ অভিযানে অপরাধীদের বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তিও দেওয়া হয়।

ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (অপরাধ) মো. ফারুক হোসেন যুগান্তরকে বলেন, মেট্রোর নিচে থাকা ভাসমান অপরাধীদের কারও কোনো জাতীয় পরিচয়পত্র নেই। একবার অপরাধ করে চোখের আড়ালে চলে গেলে তাদের শনাক্ত করা বা খুঁজে পাওয়া কঠিন। ভাসমান অপরাধীরা কোনো অপকর্ম করলে তদন্তেও জটিলতা দেখা দেয়। তাদের কেউ না চেনায় আটক করা বা খোয়া যাওয়া মাল উদ্ধার করা খুবই দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে নিয়মিত অভিযানের বাইরে নগরবাসীর সচেতনতাও জরুরি।

বিশিষ্ট নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান যুগান্তরকে বলেন, মেট্রোরেলের নিচের ফাঁকা স্থানগুলো দীর্ঘদিন অব্যবহৃত রাখার পরিবর্তে পরিকল্পিতভাবে সবুজায়ন, পথচারীবান্ধব উন্মুক্ত স্থান বা জনসেবামূলক কাজে ব্যবহার করা গেলে অবৈধ দখল ও অপরাধ-দুটিই কমে আসবে। এক্ষেত্রে সরকারের সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।