ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ঘিরে ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ওই বছরের আগস্ট মাস পর্যন্ত পুলিশের ওপর হামলা-হত্যার দায়মুক্তি (ইনডেমিনিটি) রয়েছে। তবে এর পরের সময়গুলোতেও পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নানা সময়ে হামলার শিকার হয়েছেন পুলিশ সদস্যরা। এসব ঘটনায় মামলা হলেও অভিযুক্তদের আইনের আওতায় আনার ক্ষেত্রে যেন অঘোষিত ইনডেমিনিটি চলছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে গিয়ে হামলার শিকার পুলিশ সদস্যরা বিচার না পাওয়ায় কাজে মনোবল হারাচ্ছেন। এর প্রভাব পড়ছে পুরো বাহিনীর মাঠ পর্যায়ের সদস্যদের ওপর। পুলিশ সূত্রে এই তথ্য মিলেছে।
পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২৫ সালে সারা দেশে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় ৫১৪টি ‘পুলিশ অ্যাসল্ট’ মামলা হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে সারা দেশে এই মামলার সংখ্যা ৩১৭টি। তবে এসব মামলায় পুলিশের ওপর হামলাকারীদের কাউকেই বিচারের মুখোমুখি করা যায়নি। কয়েকটি ঘটনায় কিছু অভিযুক্ত গ্রেপ্তার এবং আদালত পর্যন্ত চার্জশিট গেলেও বেশিরভাগ মামলার তদন্তও কার্যত থেমে আছে।
হামলার শিকার বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্যের সঙ্গে কথা বললে তারা আক্ষেপ করে বলেন, সাধারণ মানুষকে ঝুঁকিমুক্ত করতে গিয়ে তারা ঝুঁকিতে পড়েন, হামলার শিকার হন। কিন্তু সেই হামলাকারীদের দ্রুত সময়ে তারা আইনের আওতায় নিতে পারেন না। এতে তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয় এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনে মনোবল ধরে রাখতে পারেন না।
পুলিশ অ্যাসল্টের ঘটনায় দায়ের মামলাগুলো দ্রুত কেন নিষ্পত্তি করা যায় না, তা জানতে থানায় দায়িত্ব পালন করা বিভিন্ন স্তরের পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে কথা হয় কালবেলার। তারা বলেন, অন্যান্য অপরাধ সংঘটনের ঘটনায় মামলাগুলো বিশেষ সেল করে নিষ্পত্তি করার উদ্যোগ থাকে এবং দ্রুত তদন্তের তাগিদ থাকে। তবে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনাগুলো নিষ্পত্তিতে সেই ধরনের গুরুত্ব পায় না। তারা বলছেন, একটি মামলা হলে দেখা যায়, শুরুর দিকে এক-দুজন আসামি ধরা হয়। কোনো কারণে তদন্ত কর্মকর্তা বদল হলে সেই মামলা আর আলোর মুখ দেখে না। পুলিশ অ্যাসল্টের মামলা নিষ্পত্তিতে কারও তাগিদও থাকে না, যদিও ঘটনার শিকার পুলিশ সদস্যদের দীর্ঘমেয়াদেই হামলার ক্ষত বয়ে বেড়াতে হয়।
তবে জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করার কথা জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মোহাম্মদ ওসমান গনি। তিনি কালবেলাকে বলেন, ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে প্রেক্ষাপট অনেক বদলে গিয়েছিল। এরপর শুধু ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) এলাকাতেই নয়, সারা দেশেই পুলিশের ওপর হামলার অনেকগুলো ঘটনা ঘটেছে। ডিএমপিতে যেসব ঘটনা ঘটেছে সেগুলোর বিষয়ে মামলা হয়েছে, আসামি গ্রেপ্তার হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা বেশ কিছু মামলার চার্জশিট দিয়েছি এবং দিচ্ছি। যারা জড়িত তাদের অবশ্যই বিচারের মুখোমুখি করা হবে। আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়।’
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (মাভাবিপ্রবি) ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ আশরাফুল আলম কালবেলাকে বলেন, পুলিশের ওপর হামলা বা আক্রমণের ঘটনা থেকে বের হতে হলে প্রত্যেকটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার হওয়া জরুরি। এই ধরনের ঘটনায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে পুলিশ সদস্যরা অন্যের নিরাপত্তার সময়ে বা অপরাধ দমনে নিজেকে নিরাপদ ভাবেন।
পুলিশের ওপর হামলার কয়েকটি ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ছিনতাইকারী ধরতে গিয়ে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আহত হচ্ছেন পুলিশ সদস্য, কোথাও মাদক মামলার আসামি গ্রেপ্তারে বাধা দেওয়া হচ্ছে, হামলা হচ্ছে। আবার কোথাও পুলিশের কাছ থেকে হ্যান্ডকাফ পরা আসামিও ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের ওপর এমন হামলার ঘটনা ঘটলেও রাজধানীসহ মেট্রোপলিটন এলাকাগুলোর চিত্র আলাদা করে উদ্বেগ তৈরি করছে। মেট্রোপলিটন পুলিশের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে ফোর্স, গাড়ি থেকে শুরু করে সব ইকুইপমেন্ট বেশি থাকলেও এসব এলাকায় হামলার ঘটনা তুলনামূলক বেশি হচ্ছে।
পুলিশের অপরাধ পরিসংখ্যান বলছে, সারা দেশের তুলনায় ঢাকা মহানগর এলাকায় পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা উল্লেখযোগ্য। ২০২৫ সালে সারা দেশে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় ৫১৪টি ‘পুলিশ অ্যাসল্ট’ মামলা হয়। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরেই হয়েছে ৮৮টি। অর্থাৎ এ ধরনের মোট মামলার ১৭ দশমিক ১ শতাংশ হামলার ঘটনা ঘটেছে রাজধানীতে।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের মার্চে সারা দেশে ৭৩টি ‘পুলিশ অ্যাসল্ট’ মামলা হলেও ঢাকা মহানগরে হয়েছে ২৩টি। অর্থাৎ ওই মাসে মোট মামলার ৩১ দশমিক ৫ শতাংশই রাজধানীতে। ওই বছরের জানুয়ারিতে সারা দেশে ২৮টি মামলার মধ্যে ঢাকায় হয়েছে ১০টি। ফেব্রুয়ারিতে সারা দেশে ৩০টির মধ্যে ঢাকায় সাতটি, এপ্রিলে ৪৫টির মধ্যে সাতটি এবং মে মাসে ৪৬টির মধ্যে ৯টি মামলা হয়েছে ঢাকায়। ওই বছরের জুনে সারা দেশে ৪৩টি মামলার মধ্যে ঢাকা মহানগরে হয়েছে ছয়টি। জুলাইয়ে ৩৮টির মধ্যে চারটি, আগস্টে ৪৬টির মধ্যে পাঁচটি, সেপ্টেম্বরে ৩৯টির মধ্যে চারটি এবং অক্টোবরে ৬০টির মধ্যে ৯টি মামলা হয়েছে। নভেম্বর ও ডিসেম্বর—দুই মাসেই ঢাকায় দুটি করে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় মামলা হয়েছে।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় দায়ের ৩১৭টি মামলার মধ্যে ঢাকা মহানগরে ৪২টি ঘটনায় মামলা হয়। এ বছরের জানুয়ারিতে মোট ৩৭ মামলার মধ্যে ঢাকায় পাঁচটি, ফেব্রুয়ারিতে ৩৪টির মধ্যে আটটি, মার্চে ৫৬টির মধ্যে সাতটি এবং এপ্রিলে ৬৩টির মধ্যে তিনটি মামলা হয়েছে ঢাকায়। মে মাসে সারা দেশে মোট ৪৬টির মধ্যে ঢাকায় নয়টি, জুনে ৪৩ টির মধ্যে ছয়টি এবং জুলাইয়ে ৩৮টির মধ্যে চারটি মামলা হয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের মুখপাত্র অতিরিক্ত উপ পুলিশ কমিশনার নিয়াজ মেহেদী বলেন, হামলাগুলো পুলিশের ওপর সরাসরি হচ্ছে না। আসামি ধরতে গেলে বা কোনো অভিযানে গেলে হামলার শিকার হচ্ছে। তবে এসব ঘটনায় আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিচ্ছি।
তিনি বলেন, ঢাকায় অনেক মানুষের বসবাস, অপরাধের পরিমাণও এখানে বেশি। এজন্য সারা দেশে পুলিশের ওপর হামলার তুলনায় ঢাকার সংখ্যাটা একটু বেশি হতে পারে।
রাজধানী ঢাকা বা মেট্রোপলিটন শহরগুলোতে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা বেশি হওয়ার বিষয়ে মাভাবিপ্রবি অধ্যাপক মোহাম্মদ আশরাফুল আলম কালবেলাকে বলেন, ঢাকা শহর কিংবা দেশের মহানগরগুলো তুলনামূলক ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। মেট্রোপলিটন এলাকায় ভাসমান মানুষের সংখ্যা বেশি। তারা অপরাধ করে দ্রুত এলাকা ছেড়ে দেয়। একইভাবে পুলিশের ওপর হামলা বা পুলিশের কাজে বাধা দেওয়ার পর তারা এলাকা ছেড়ে চলে যায়। অনেকেই তাদের আসল পরিচয়ও জানে না। এজন্য এসব এলাকায় ঘটনা ঘটছে বেশি।
সাম্প্রতিক কয়েকটি মামলা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, হামলার পর তাৎক্ষণিকভাবে কয়েকজনকে আটক বা গ্রেপ্তার করা হলেও প্রত্যক্ষ হামলাকারীদের সবাই কিংবা ঘটনার নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের অনেক ক্ষেত্রেই আইনের আওতায় আনা যাচ্ছে না। কোথাও আসামি শনাক্তের কাজ চলছে, কোথাও মূল অভিযুক্ত পলাতক। আবার কোনো মামলায় তদন্ত কর্মকর্তা বদলি হওয়ায় তদন্তই থেমে গেছে।
গত ১৬ জুন রাজধানীর মোহাম্মদপুরের শেখেরটেক এলাকায় একটি মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টের দোকানে ঢুকে চাপাতির মুখে ৩ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয় অপরাধী চক্র। ওইদিনই আদাবরের তুরাগ হাউজিং এলাকা একটি আস্তানায় অভিযান চালায় পুলিশ। ওই সময় ছিনতাইকারীরা আদাবর থানার ওসি জাহিদুল ইসলামকে ধারালো চাপাতি দিয়ে আঘাত করে জখম করে। ঘটনাস্থল থেকে চারজনকে আটক করা হলেও গত আড়াই মাসে আর কেউ গ্রেপ্তার হয়নি। মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা বদলি হলেও নতুন কোনো তদন্ত কর্মকর্তাও নিয়োগ হয়নি।
এ ঘটনার পর গত ২৩ জুলাই রাতে মোহাম্মদপুরের কাদেরাবাদ হাউজিং এলাকায় পুলিশের বিশেষ শাখায় কর্মরত এসআই ওসমান গনির ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় দায়ের মামলাতেও একই ধরনের চিত্র পাওয়া গেছে। মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা এসআই ফেরদাউস জামান বলেন, মামলাটি তদন্তাধীন। ঘটনায় জড়িত চারজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও মূল আসামি মো. সাঈদসহ আরেকজন পলাতক রয়েছে।
গত ২৬ জুলাই রাজধানীর জুরাইনের সড়ক দখলমুক্ত করতে হকার উচ্ছেদ অভিযানে গিয়ে হামলার মুখে পড়ে কদমতলী থানা পুলিশের একটি দল। ওই ঘটনায় দুজনকে আটক করে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হলেও পরে আর কোনো মামলা হয়নি!
গত ১৮ আগস্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়া পুলিশ লাইন্সে মাদকবিরোধী সচেতনতায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। তবে স্থানীয়রা হামলা চালিয়ে সে অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেয়। হামলা ঠেকাতে গিয়ে কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন। তবে পুলিশের স্থাপনায় এমন হামলার ঘটনায় কোনো মামলা পর্যন্ত হয়নি এর আগে গত ২৯ জুন একই জেলার সরাইল উপজেলার কালিকচ্ছ বাজার এলাকায় দুই গ্রামবাসীর সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে ওসি মনজুর কাদের ভূঁইয়াসহ অন্তত ২৫ জন পুলিশ সদস্য আহত হন। ওসির চোখে গুরুতর আঘাত লাগে। ওই ঘটনায় দায়ের মামলায় কয়েকজনকে আটক করা হলেও হামলাকারীদের বেশিরভাগই ধরাছোঁয়ার বাইরে।
সরাইল থানার ওসি মনজুর কাদের ভূঁইয়া কালবেলাকে বলেন, মামলাটি এখনো তদন্তাধীন। সেদিন হামলায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের শনাক্তের কাজ চলছে।
পিরোজপুরের কাউখালীতে গত ২০ আগস্ট পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনার দায়ের মামলাতেও একই অবস্থা। পাবনার সুজানগরের মথুরাপুর গ্রামে সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে পুলিশের ওপর হামলা হয়। মাইকে ঘোষণা দিয়ে কয়েকশ মানুষ পুলিশের ওপর হামলা চালায়। পুলিশের দুটি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। সুজানগর থানার ওসি মো. মোজাফফর হোসেন জানান, ঘটনায় মামলা হলেও সব আসামিকে এখনো আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি।
কক্সবাজারের কুতুবদিয়ায় গত ১৯ জুলাই ওয়ারেন্টভুক্ত এক আসামিকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়ার সময় একটি গ্রুপ লাঠিসোটা নিয়ে পুলিশের ওপর হামলা চালায়। হামলাকারীরা হাতকড়াসহ আসামিকে ছিনিয়ে নেয়। কুতুবদিয়া থানার ওসি মাহবুবুল হক জানান, ওই ঘটনায় মামলা হলেও এখনো সব আসামি গ্রেপ্তার হয়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক কালবেলাকে বলেন, পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পুলিশের হামলার ঘটনায় শুধু দৃশ্যমান হামলাকারীকে গ্রেপ্তার করলেই হবে না, হামলার পরিকল্পনা, উসকানি ও অর্থায়নের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদেরও শনাক্ত করতে হবে। তাহলে নতুন করে কেউ হামলার সাহস পাবে না। এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও ভালো থাকবে।
তিনি আরও বলেন, পুলিশের নিজের সদস্যদের ওপর হামলার মামলার তদন্তে ধীরগতি দেখা দিলে সেটি সাধারণ মানুষের কাছেও ভুল বার্তা দিতে পারে। পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় দায়ের মামলাগুলোর দ্রুত তদন্ত, নির্ভুলভাবে আসামি শনাক্ত এবং অভিযোগপত্র দাখিলের মাধ্যমে বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া গেলে পুলিশের ওপর হামলার প্রবণতা কমবে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনোবলও ভালো থাকবে।