Image description

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে দুই দেশের কর্মকর্তাদের প্রস্তুতির মধ্যেই শেখ হাসিনা দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলন করায় সবকিছু ওলটপালট হয়ে যায়। তবে এখনো উভয় পক্ষ সফরের গ্রাউন্ডওয়ার্ক করছে। এ ক্ষেত্রে হাসিনার ব্যাপারে এক ধরনের দরকষাকষি লক্ষণীয়। বাংলাদেশের জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে মিল রেখে আগাম বোঝাপড়া চাইছে ঢাকা। তবে দিল্লি মনে করে, দুই প্রধানমন্ত্রী একত্রে বসে বিষয়টা নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। সম্প্রতি ভারতের বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রচার করা হয়েছে যে আগস্টের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু ঢাকার কর্মকর্তারা বলছেন, এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন এবং ওসমান হাদি হত্যার আসামিদের ফেরত পাঠানোর ইস্যুতে সমঝোতা হলে দ্রুত সফরসূচি চূড়ান্ত হবে। এ বিষয়ে একটা আগাম ইঙ্গিত চায় বাংলাদেশ।

জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবু আবদুল্লাহ মো. ছালেহ (ছালেহ শিবলী) বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘এ ব্যাপারে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ঢাকা এখন শেখ হাসিনা এবং অন্য পলাতক অপরাধীদের প্রত্যর্পণের বিষয়ে ভারতের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে’। এদিকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ইকোনমিক টাইমসের এক আলোচনায় শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোসংক্রান্ত বাংলাদেশের দাবি নিয়ে প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, ‘সম্পর্ক পারস্পরিক স্বার্থের ওপর নির্ভর করে। সব প্রতিবেশীর সঙ্গেই সম্পর্ক পারস্পরিক স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে এগিয়ে নেওয়া হবে।’

জানতে চাইলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো ফরিদ হোসেন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক চায় বটে, কিন্তু শেখ হাসিনার সরকারের মতো নয়। তারেক রহমান সমমর্যাদা ও পারস্পরিক স্বার্থ সমুন্নত রেখে এ সম্পর্ক এগিয়ে নিতে চান’। তিনি আরও বলেন, ‘অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের জনগণের প্রত্যাশা-শেখ হাসিনার বিষয়ে ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে এক ধরনের সমঝোতা করে একটা গ্রাউন্ডওয়ার্ক করে সফরে যাওয়া উচিত। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বোধহয় সেটাই নিশ্চিত হতে চাইছেন। কারণ দুই পক্ষের মধ্যে এক ধরনের সমঝোতা ছাড়া হঠাৎ বৈঠকে বসে সমস্যার সমাধান আশা করা যায় না। তা ছাড়া বাংলাদেশের জনগণের প্রত্যাশার বিষয়টি এ সমঝোতায় অবশ্যই মনে রাখা উচিত।’

বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনারের অনেকেরই মত হচ্ছে, দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে একান্ত বৈঠকের পর যাবতীয় সমস্যার সমাধান হওয়া উচিত। বৈঠক না হলে সমস্যার সমাধান হওয়া অসম্ভব। এটা কূটনৈতিক বা অন্য কোনোভাবে করা যায় না। দুই প্রধানমন্ত্রী একটি টেবিলে বসলে অনেক সমস্যার সমাধান হতে পারে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যেসব বিষয়ে উদ্বেগে আছেন, সে বিষয়গুলো তিনি যদি সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে জানান, তাহলে সে ক্ষেত্রে তখনো একটা সমাধানসূত্র বের করা যেতে পারে। তার পরেও যদি কোনো উদ্বেগ থেকে থাকে তখন বাংলাদেশ নিজস্বভাবে যেকোনো সার্বভৌম সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এটা বলছেন পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী এবং বীণা সিক্রি। পঙ্কজ শরণ মনে করেন, দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে বৈঠক হওয়া অত্যন্ত জরুরি এবং এটা না হলে যে ধরনের অনাস্থা রয়েছে সেটা কাটবে না।

অন্যদিকে তাড়াহুড়া করে নয়, জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে আলোচনায় অগ্রগতি হলে উপযুক্ত সময়ে ভারত সফর করা হবে বলে জানিয়েছেন নবনিযুক্ত পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ইতিবাচক ও কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখতে চায় সরকার। তবে কোনো দেশের সঙ্গেই বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে আপস করে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়ে গতকাল সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে শহীদদের শ্রদ্ধা জানানোর পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনা দেড় হাজার মানুষ হত্যার সঙ্গে জড়িত সন্ত্রাসী হিসেবে ভারতে পালিয়ে গেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে কয়েকটি মামলায় বিচারিক প্রক্রিয়ার ফলও এসেছে। আরও অনেক মামলা বিচারাধীন।’ তিনি বলেন, ‘ভারতের সঙ্গে আমাদের প্রত্যর্পণ চুক্তি আছে। সুতরাং এগুলো নতুন কোনো শর্ত বা নতুন কোনো ধরনের সম্পৃক্ততার বিষয় নয়; এগুলো চলমান বিষয়।’

প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের সফরের আগে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও আলোচনা দরকার উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘দুই দেশের সরকারপ্রধানের বৈঠকের আগে কিছু প্রস্তুতি ও ভিত্তি তৈরি করতে হবে। আমরা সেটিই করছি।’ ভারতের পক্ষ থেকে ইতিবাচক মনোভাব ও সদিচ্ছার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে উল্লেখ করে হুমায়ুন কবির বলেন, ‘সেখান থেকেও ইতিবাচক মনোভাব ও সদিচ্ছার ইঙ্গিত আসছে।’ তিনি বলেন, ‘আলোচনা এবং আমাদের জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে সময় উপযুক্ত হলেই আমরা অবশ্যই ভারত সফরে যাব।’