সারা দেশে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে ল্যাবে তৈরি ১৩টি নতুন সিনথেটিক মাদক। ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইন ও ফেনসিডিলের মতো প্রচলিত বলয় ভেঙে এখন বাজারে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে শক্তিশালী ও মরণঘাতী এসব সিনথেটিক মাদক। ২০১৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত এসব মাদকের অনুপ্রবেশ ঘটেছে নানা পথে। এগুলো হচ্ছে- খাত, আইস (ক্রিস্টাল মেথ), এমডিএমএ, এলএসডি, টাপেন্টাডল, ট্রামাডল, ডিএমটি, ম্যাজিক মাশরুম, ডিওবি, কুশ, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন জমাট হোরাইন, ব্ল্যাক কোকেন ও এমডিএমবি। এসব নতুন মাদক ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে ডাকযোগে আকাশপথে পার্সেল হিসেবে আসে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুরো বিশ্বে সিনথেটিক মাদক আসক্তির সংখ্যা বাড়ছে। মাদক মাফিয়ারা প্রতিনিয়ত নতুন নতুন মাদক তৈরি করছে ল্যাবে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) এক পরিসংখ্যান বলছে, ল্যাবে তৈরি সিনথেটিক মাদক দ্রুত আসক্তি তৈরি করে। বাংলাদেশে সিনথেটিক নেশায় আসক্তের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিনথেটিক মাদক গ্রহণে মানুষের মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষ বা সেল ধ্বংস করে দেয়। মানুষের স্বাভাবিক স্মৃতিশক্তি এবং চিন্তার ক্ষমতা হ্রাস পায়। তীব্র মানসিক বিভ্রান্তি, অবাস্তব জিনিস দেখা এবং অহেতুক সন্দেহ বাড়ায়। তীব্র হতাশা এবং আত্মহত্যার প্রবণতা সৃষ্টি করে। দীর্ঘ মেয়াদে লিভার সিরোসিস এবং কিডনি সম্পূর্ণ বিকল হয়ে পড়ে। অত্যন্ত শক্তিশালী রাসায়নিক উপাদানে সিনথেটিক মাদক গ্রহণে শরীরের প্রধান অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো হঠাৎ অকেজো হয়ে যেতে পারে, যা অকাল মৃত্যুর কারণ হয়। ডিএনসি সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ল্যাবে তৈরি নতুন নতুন সিনথেটিক মাদক শিডিউলভুক্ত না হওয়ায় পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা কিছুটা জটিল।
শিডিউলভুক্ত মাদকের চেয়ে সিনথেটিক মাদক কেনাবেচা এবং বহন করা অনেকটা সহজ। প্রাকৃতিক মাদকের চেয়ে সিনথেটিক মাদক দ্রুত আসক্তি তৈরি করে। তাই দেশে সিনথেটিক মাদকের চাহিদা দিনদিন বেড়েই চলছে। নতুন সিনথেটিক মাদক তরুণ সমাজের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। ডিএনসি বলছে, সিনথেটিক মাদক পরিবহন অনেকটা সহজ এবং আর্থিকভাবে দ্রুত লাভবান হওয়া যায়। অল্প পরিমাণ মাদক দিয়েই বৃহৎ বাজার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে নতুন এসব মাদকের বিস্তারে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
পাশাপাশি ডার্ক ওয়েব, এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে সিনথেটিক মাদকের বাজার নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মাদক কারবারিদের টার্গেট দেশের উঠতি বয়সি ছেলেমেয়েদের মাঝে সিনথেটিক মাদক ছড়িয়ে দেওয়া। এসব মাদকের চালান ধরতে প্রচলিত অভিযানের পাশাপাশি তথ্য সংগ্রহ, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নেওয়া হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিস, অনলাইনে লেনদেন ও সন্দেহভাজন নেটওয়ার্ক পর্যবেক্ষণ করে এসব মাদক ধরা হচ্ছে। ঢাকা আহছানিয়া মিশনের স্বাস্থ্য সেক্টরে সিনিয়র সাইকোলজিস্ট রাখী গাঙ্গুলী বলেন, সিনথেটিক মাদক মস্তিষ্ক ও শরীরে গভীর ক্ষতি করতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারে মানসিক বিকার, স্মৃতিভ্রংশ, শারীরিক অবক্ষয় ও প্রাণঘাতী জটিলতা দেখা দিতে পারে। আসক্তি চিকিৎসাযোগ্য; প্রয়োজন সমন্বিত চিকিৎসা, মনোসামাজিক থেরাপি ও দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন। ডিএনসির অতিরিক্ত মহাপরিচালক মোহাম্মদ গোলাম আজম বলেন, শুধু ইয়াবা বা গাঁজা নয়, নতুন সিনথেটিক মাদক তরুণ সমাজের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। শহর থেকে গ্রামাঞ্চলে আমরা সর্বত্র কঠোর গোয়েন্দা নজরদারি চালাচ্ছি। নিয়মিত অভিযানের পাশাপাশি অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা নিচ্ছি। আমরা যখনই সিনথেটিক মাদক ধরছি, তখনই কারবারিরা সেটি ভিন্ন নামে প্রচার করে ছড়িয়ে দিচ্ছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আমরা নতুন কোনো মাদক পেলেই সেটি ল্যাবরেটরিতে পাঠিয়ে দিচ্ছি। সিনথেটিক মাদক প্রমাণিত হলেই সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
গত বছরের ডিসেম্বরে দেশে প্রথমবারের মতো মালয়েশিয়া থেকে আসা নতুন মাদক এমডিএমবি এর চালান জব্দ করা হয়। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে প্রথমবারের মতো ধরা পড়ে ব্ল্যাক কোকেন নামে নতুন মাদক। ২০২১ সালের নভেম্বরে খুলনায় উদ্ধার করা হয় ভয়াবহ ডিওবি (ডাইমিথোক্সিবোমো এমফিটামিন) মাদক। যা কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে পোল্যান্ড থেকে এসেছিল। এটিও দেশে প্রথম শনাক্ত হয়। চোরাকারবারিরা ডার্কওবেয়ে বিটকয়েন ব্যবহার করে এ মাদক কিনেছিল। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাজধানীর জিগাতলায় প্রথমবারের মতো আইস উদ্ধার করা হয়। একই বছরের জুলাইয়ে মহাখালী ডিওএইচএসের একটি বাসা থেকে প্রথমবারের মতো এলএসডি উদ্ধার হয়।
খাত : খাত হলো পূর্ব আফ্রিকা ও আরব অঞ্চলের একটি ভেষজ উদ্ভিদ। এর কাঁচা পাতা ও ডাল চিবিয়ে রস পান করা হয়। আইস (ক্রিস্টাল মেথ) : আইস বা ক্রিস্টাল মেথ অত্যন্ত শক্তিশালী, ব্যয়বহুল এবং ভয়ংকর রাসায়নিক মাদক। এটি দেখতে অনেকটা কাচের টুকরা বা স্বচ্ছ ক্রিস্টালের মতো। এটি মানুষের মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রকে দ্রুত উত্তেজিত করে। হৃদস্পন্দন, রক্তচাপ, তীব্র অনিদ্রা, ক্ষুধা মন্দা, দ্রুত ওজন হ্রাস, মানসিক ভারসাম্যহীনতা বা হ্যালুসিনেশন তৈরি হয়। মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী পাহাড়ি অঞ্চলে অবৈধ ল্যাবরেটরিতে এটি তৈরি হচ্ছ।
এমডিএমএ : এমডিএমএ হলো মেথালাইন ডিঅক্সি মেথাএমফিটামিন, যা মূলত একটি কৃত্রিম বা সিনথেটিক ও অত্যন্ত শক্তিশালী ক্ষতিকারক মাদক। এটি মূলত পশ্চিম ইউরোপের অবৈধ ল্যাবরেটরিগুলোতে তৈরি করা হয়। বিশেষ করে নেদারল্যান্ডস এবং বেলজিয়ামে।
এলএসডি : এলএসডি হলো একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ল্যাবরেটরিতে তৈরি রাসায়নিক ও সাইকেডেলিক মাদক। এটি সেবনের পর মানুষের মস্তিষ্ক তার আশপাশের বাস্তবতাকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে অনুভব করে এবং সে তীব্র হ্যালুসিনেশন বা অলীক বিভ্রমে আক্রান্ত হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের গোপন ল্যাবগুলোতে এ মাদক তৈরি করা হয়।
টাপেন্টাডল ও ট্রামাডল : টাপেন্টাডল হলো একটি শক্তিশালী সিনথেটিক মাদক। হেরোইন বা ইয়াবার বিকল্প মাদক হিসেবে এটি ব্যবহৃত হয়। ট্রামাডল হলো শক্তিশালী ব্যথানাশক ওষুধ। অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে ফুসফুসের কার্যক্ষমতা কমিয়ে শরীরে খিঁচুনি ও মস্তিষ্কে ক্ষতিকর প্রভাব ফলে। এতে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি ও শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে মানুষ মারা যেতে পারে।
ডিএমটি : ডিএমটি বা ডাইমিথাইলট্রিপ্টামাইন হলো একটি অত্যন্ত শক্তিশালী হ্যালুসিনোজেনিক বা দৃষ্টিভ্রমকারী সাইকেডেলিক মাদক।
ম্যাজিক মাশরুম : এটি এক ধরনের সাইকেডেলিক বা হ্যালুসিনোজেনিক (বিভ্রম সৃষ্টিকারী) মাদক। এতে সিলোসাইবিন এবং সিলোসিন নামক সক্রিয় রাসায়নিক উপাদান থাকে। এই উপাদানগুলো মানুষের তীব্র হ্যালুসিনেশন বা অবাস্তব অনুভূতির সৃষ্টি করে। চরম উত্তেজনা, পেটে অস্বস্তি, আনন্দ বা হঠাৎ করে তীব্র ভয় ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়, হৃদস্পন্দন ও শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া এবং অতিরিক্ত ঘাম হয়। এটি দক্ষিণ আমেরিকা, সেন্ট্রাল আমেরিকা (মেক্সিকো) এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কিছু উপ-উষ্ণমণ্ডলীয় বনাঞ্চলে পাওয়া যায়। এ ছাড়া ডিওবি, কুশ, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন জমাট হোরাইন, ব্ল্যাক কোকেন, এমডিএমএ অত্যন্ত বিপজ্জনক মাদক। এসব মাদক ভারত, আফগানিস্তান, মিয়ানমার, মেক্সিকো, কলম্বিয়া, পেরু এবং বলিভিয়াসহ বিশ্বের কয়েকটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের গোপন গবেষণাগারে তৈরি হয়।