২০১৩ সালের পর পোশাক খাতে বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর অংশ হিসেবে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই কারখানা গড়ে তোলায় বাংলাদেশ এখন বিশ্বে নেতৃত্ব দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউএস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিলের (ইউএসজিবিসি) স্বীকৃতি অনুযায়ী, বিশ্বের শীর্ষ ১০০ পরিবেশবান্ধব কারখানার অর্ধেকের বেশি বাংলাদেশে। কিন্তু বিপুল বিনিয়োগে গড়ে ওঠা এসব ‘সবুজ কারখানা’ শিল্পের ভাবমূর্তি বদলালেও পোশাকের দাম বা রপ্তানি আয় বাড়াতে পারেনি। বরং পোশাক রপ্তানি কমছে। সর্বশেষ জুলাই মাসে এ খাতের রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১ দশমিক ৯২ শতাংশ কমেছে।
ব্যবসায়ীদের মতে, সাধারণ কারখানার তুলনায় আন্তর্জাতিক মানের পরিবেশবান্ধব কারখানা নির্মাণে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি ব্যয় হয়। পানি পুনর্ব্যবহার, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বিশেষ ভেন্টিলেশন ব্যবস্থায় উদ্যোক্তাদের বড় অঙ্কের অতিরিক্ত বিনিয়োগ করতে হয়। প্রত্যাশা ছিল, এসব টেকসই ব্যবস্থার কারণে বিদেশি ব্র্যান্ডগুলো পোশাকের ন্যায্য বা বাড়তি দাম দেবে। কিন্তু বাস্তবে ‘সবুজ’ কারখানার পোশাকের জন্য ক্রেতারা অতিরিক্ত মূল্য বা প্রিমিয়াম দিচ্ছেন না। বাংলাদেশের তুলনায় কম সংখ্যক সবুজ কারখানা নিয়েও ভিয়েতনাম উচ্চমূল্যের পোশাক রপ্তানিতে এগিয়ে রয়েছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাইয়ে দেশের রপ্তানি আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় শূন্য দশমিক ৯০ শতাংশ কমে ৪ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। আগের বছরের জুলাইয়ে আয় হয়েছিল ৪ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার। প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকের আয় কমায় সার্বিক রপ্তানিতেও এর প্রভাব পড়েছে। জুলাইয়ে পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৩ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৫ সালের একই মাসের ৩ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ১ দশমিক ৯২ শতাংশ কম। পণ্যভিত্তিক হিসাবে নিটের চেয়ে ওভেন পোশাকের রপ্তানি কমেছে বেশি।
জুলাইয়ে ওভেন পোশাক রপ্তানি কমেছে ৩ দশমিক ১৬ শতাংশ, আর নিট পোশাক কমেছে শূন্য দশমিক ৯০ শতাংশ। ইউএসজিবিসির স্বীকৃতি অনুযায়ী, দেশে সবুজ সনদপ্রাপ্ত তৈরি পোশাক কারখানার সংখ্যা এখন ২৯০টি। এর মধ্যে ১২৫টি প্লাটিনাম, ১৪৫টি গোল্ড এবং বাকিগুলো সিলভার ও সার্টিফায়েড পর্যায়ের। বিশ্বের সর্বোচ্চ নম্বরপ্রাপ্ত শীর্ষ ১০০ সবুজ কারখানার মধ্যে বাংলাদেশের কারখানা রয়েছে ৫৩টি। অথচ সবুজ সনদপ্রাপ্ত কারখানার সংখ্যায় অনেক পিছিয়ে থেকেও রপ্তানিতে ভিয়েতনাম বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, বৈশ্বিক চাহিদা ও ইউরোপের নতুন কমপ্লায়েন্স নীতির কারণে ভবিষ্যতে ব্যবসায় টিকে থাকতে সবুজায়ন ও টেকসই কার্যক্রম বাড়ানোর বিকল্প নেই। তবে পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ নিলেই হবে না; বায়ারদের কাছে তা যথাযথভাবে উপস্থাপন ও মার্কেটিং করতে না পারলে এর বাণিজ্যিক সুফল পাওয়া যাবে না।
তিনি বলেন, লিড কারখানার সংখ্যা বৃদ্ধি এবং দেশের রপ্তানি আয় কমার মধ্যে সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। একটি লিড সার্টিফিকেশন পেতে পুরো প্রক্রিয়ায় কমপক্ষে দুই থেকে তিন বছর সময় লাগে। ফলে বর্তমানে যেসব লিড কারখানা দেখা যাচ্ছে, সেগুলোর কার্যক্রম শুরু হয়েছিল প্রায় তিন বছর আগে। তখন বৈশ্বিক অর্থনীতির পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। বর্তমান বাস্তবতায় উদ্যোক্তারা নতুন করে সার্টিফিকেশন নেওয়ার আগে কিছুটা চিন্তা করতে পারেন। তবে লিড সার্টিফিকেশনের সঙ্গে রপ্তানির প্রকৃত প্রভাব বুঝতে আরও কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে।