Image description

ব্যবসায়িক লেনদেনের ৭০ লাখ টাকা নিয়ে বিরোধ ছিল ঢাকার ধামরাইয়ের শরিফুল ইসলাম ও আরফান মিয়ার মধ্যে। এই বিরোধের মধ্যেই আরফান মিয়াকে আওয়ামী লীগের নেতা ও ৫ আগস্টের ছাত্র হত্যা মামলার আসামি দাবি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করেন শরিফুল ইসলামসহ তিন জন। অভিযোগের সঙ্গে ‘সম্পাদনা’ করে দেওয়া আওয়ামী লীগের কমিটির তালিকাতেও আরফানের নাম বসানো হয়।

তবে পুলিশ তদন্ত করে অভিযোগের কোনও সত্যতা পায়নি। তদন্তে তার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ততা, ছাত্র হত্যায় জড়িত থাকা কিংবা গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকার কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এরপরও কয়েক মাস পর একটি রাজনৈতিক মামলায় তাকে গ্রেফতার করানো হয়। আরফানের অভিযোগ, ব্যবসায়িক বিরোধের জেরে তাকে পরিকল্পিতভাবে ফাঁসিয়ে গ্রেফতার করানো হয়েছে।

পুলিশ বলছে, বিষয়টি বিস্তারিত জেনে পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভুক্তভোগী আরফান মিয়া ধামরাই পৌরসভার মলয়ঘাট এলাকার চান মিয়ার ছেলে। শরিফুল ইসলাম একই এলাকার হাবিবুর রহমান হবির ছেলে। তিনি ধামরাই পৌর ছাত্রদল সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ও ঢাকা জেলা ছাত্রদলের সাবেক সদস্য।

সম্প্রতি আরফান মিয়ার বিরুদ্ধে করা অভিযোগ, অভিযোগের তদন্ত প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেছেন এই প্রতিবেদক। সেখানে উঠে আসে, ব্যবসায়িক বিরোধ থেকে হয়রানি করতে কৌশলে ‘আওয়ামী লীগ নেতা’ বানিয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো ও এর জেরে অপরাধ ছাড়াই প্রায় দুই মাসের বেশি সময় ধরে ব্যবসায়ী আরফান মিয়াকে কারাগারে রাখার বিস্তারিত ঘটনা।

চেকের টাকা নিয়ে বিরোধ

আরফান মিয়া ও শরিফুল ইসলামের মধ্যে দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সম্পর্ক। ব্যবসায়িক লেনদেনের সূত্রে শরিফুল ইসলামের কাছে আরফান মিয়ার পাওনা ছিল ৭০ লাখ টাকা। টাকা পরিশোধের জন্য শরিফুল ইসলাম কমার্স ব্যাংকের ৪০ লাখ ও ৩০ লাখ টাকার দুটি চেক দেন। চেক দুটি ব্যাংকে জমা দেওয়ার পর ডিজঅনার হয়। এর মধ্যে ৪০ লাখ টাকার চেক ডিজঅনারের ঘটনায় ২০১৯ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ঢাকার একটি আদালতে মামলা করেন আরফান মিয়া। ওই মামলায় ২০২৫ সালের ২ জুন রায় হয়। রায়ে টাকা পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে ২১ আগস্ট ২০ লাখ টাকা পরিশোধ করেন শরিফুল ইসলাম।

রায় ঘোষণার পরদিন ৩ জুন শরিফুল ইসলাম, কাজী রাজীব হাসান (৪০) ও মারুফ হোসেন (৩৭) ধামরাই বাজারে আরফান মিয়ার দোকানে যান। তারা তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ, মারধর ও হত্যার হুমকি দেন বলে অভিযোগ করেন আরফান। তাকে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করার হুমকিও দেওয়া হয়। এ ঘটনায় ৩ জুন ধামরাই থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন আরফান মিয়া।

মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ

এর আগে ২৩ মার্চ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগে আরফান মিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন শরিফুল ইসলাম, কাজী রাজীব হাসান ও মারুফ হোসেন। আবেদনে বলা হয়, আরফান মিয়া ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ধামরাই পৌর আওয়ামী লীগের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সহসভাপতি ছিলেন। তিনি ৫ আগস্টের ছাত্র হত্যায় সরাসরি জড়িত এবং ওই হত্যা মামলার অন্যতম আসামি বলেও দাবি করা হয়।

আবেদনে আরও বলা হয়, আরফানের নামে ওয়ারেন্ট থাকা সত্ত্বেও পুলিশ তাকে গ্রেফতার করছে না। তিনি এলাকায় প্রভাব খাটিয়ে হুমকি ও লিয়াজোঁ করে প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করছেন বলেও অভিযোগ করা হয়। তার কারণে স্থানীয় লোকজন ভীত এবং তিনি সাংবাদিকদেরও হুমকি দেন বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়।

আবেদনের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য, উপজেলা চেয়ারম্যান ও পৌর মেয়রের সঙ্গে আরফান মিয়ার কয়েকটি ছবি যুক্ত করা হয়। এ ছাড়া ধামরাই উপজেলা আওয়ামী লীগের একটি কমিটির তালিকায় তাকে সহসভাপতি হিসেবে দেখানো হয়।

তদন্তে মেলেনি অভিযোগের সত্যতা

অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ২০ এপ্রিল পুলিশ মহাপরিদর্শককে বিষয়টি তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। তদন্ত করে ঢাকা জেলার সাভার সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শাহীনুর কবির ঢাকা জেলার পুলিশ সুপারের কাছে প্রতিবেদন দেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, সরেজমিনে অনুসন্ধান, কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং আবেদনের সঙ্গে দেওয়া কাগজপত্র পর্যালোচনা করে ৫ আগস্টের ছাত্র হত্যায় আরফান মিয়ার জড়িত থাকার কোনও সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

তার সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ছবি থাকলেও কোনও পদ-পদবীতে তার নাম পাওয়া যায়নি। তার বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সংক্রান্ত কোনও রাজনৈতিক মামলাও পাওয়া যায়নি। ধামরাই থানার রেকর্ডপত্র পর্যালোচনা করেও তার বিরুদ্ধে কোনও গ্রেফতারি পরোয়ানা পাওয়া যায়নি। স্থানীয়ভাবে অনুসন্ধান করেও তার বিরুদ্ধে কোনও বিরূপ তথ্য পাওয়া যায়নি। আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে তার সম্পৃক্ততারও কোনও সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি। প্রতিবেদনে মতামত হিসেবে বলা হয়, শরিফুল ইসলাম গংয়ের করা অভিযোগের কোনও সত্যতা পাওয়া যায়নি।

সাক্ষ্যও গেলো আরফানের পক্ষে

তদন্ত প্রতিবেদনের সঙ্গে কয়েকজনের জবানবন্দিও যুক্ত করা হয়। এর মধ্যে আরফান মিয়ার বসবাসের এলাকার পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শরিফ খানের বক্তব্য ছিল।

শরিফ খান বলেন, ‘আরফান মিয়া আমার পূর্বপরিচিত। তিনি আওয়ামী লীগের কোনও পদে ছিলেন না এবং ছাত্র হত্যায়ও জড়িত নন। তার নামে ওই সংক্রান্ত কোনও মামলাও নেই।’

শরিফ খানের ভাষ্য, আরফান মিয়া বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। পূর্বশত্রুতার জেরে প্রতিহিংসাবশত তাকে ৫ আগস্টের একটি রাজনৈতিক মামলায় অজ্ঞাত আসামি হিসেবে ফাঁসানোর উদ্দেশ্যে আওয়ামী লীগের পদ-পদবী উল্লেখ করে তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করা হয়েছে। 

এ ছাড়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ধামরাই থানার উপপরিদর্শক (এসআই) জিয়া তার প্রতিবেদনে বলেন, তিনি আরফান মিয়াকে চেনেন না এবং তাকে কখনও গ্রেফতার করতে যাননি।

তদন্তের পর অন্য অভিযোগে গ্রেফতার

এর মধ্যে ২০২৫ সালের ২০ আগস্ট উত্তরা পশ্চিম থানায় কামরুজ্জামান রিপনের করা একটি মামলায় আরফান মিয়াকে ৩৬৯ নম্বর আসামি করা হয়। এরপর ১৭ নভেম্বর উত্তরা পশ্চিম থানার ওই মামলার কথা বলে আরফানকে ধামরাই থানায় ডেকে নেয় পুলিশ। থানায় গেলে তাকে মামলার বিষয়ে জানানো হয়।আরফান মিয়া পুলিশকে গ্রেফতারি পরোয়ানা দেখাতে বললে পরোয়ানা দেখানো হয়নি বলে তার দাবি।

তার অভিযোগ, তাকে আটক করে ছেড়ে দেওয়ার জন্য পুলিশ ৫ লাখ টাকা দাবি করে। টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় তাকে ধামরাই থানার একটি নাশকতা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। যদিও ধামরাই থানার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ওই অর্থ দাবির অভিযোগ অস্বীকার করেন। ওই মামলায় দুই মাস ১০ দিন কারাগারে থাকার পর জামিনে মুক্তি পান তিনি।

বাদীরাও বললেন, গ্রেফতার ঠিক হয়নি

জামিনে মুক্তির পর উত্তরা পশ্চিম থানার মামলার বাদী কামরুজ্জামান রিপনের ও ধামরাই থানার মামলার বাদী সাইফুর রহমান সজলের কাছ থেকে নোটারি করা হলফনামা নেন আরফান মিয়া। হলফনামায় বাদীরা উল্লেখ করেন, আরফান মিয়াকে গ্রেফতার করা ঠিক হয়নি এবং তাকে জামিন দিলে তাদের আপত্তি নেই।

পুলিশের আরেক প্রতিবেদনেও আওয়ামী লীগের সম্পৃক্ততার প্রমাণ নেই

২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর ধামরাই থানার এএসআই মো. মনিরুজ্জামানের দেওয়া একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, আরফান মিয়া একজন ব্যবসায়ী। আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

অর্থাৎ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দেওয়া অভিযোগের পর পুলিশি অনুসন্ধানে একাধিক প্রতিবেদনে আরফান মিয়াকে আওয়ামী লীগের নেতা বা ছাত্র হত্যায় জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানার তথ্যও পাওয়া যায়নি।

যে কমিটির তালিকা দেওয়া হয়েছিল, সেটিও জাল

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দেওয়া আবেদনের সঙ্গে ধামরাই উপজেলা আওয়ামী লীগের একটি কমিটির তালিকা দেওয়া হয়েছিল। ওই তালিকায় সহসভাপতি হিসেবে ৮ নম্বরে আরফান মিয়ার নাম ছিল।

তবে আওয়ামী লীগের মূল কমিটির তালিকা যাচাই করে দেখা যায়, ওই তালিকাটি জাল। মূল তালিকায় সহসভাপতি মাহতাব উদ্দিনের নাম ছিল। তার নাম মুছে সেখানে আরফান মিয়ার নাম বসানো হয়েছে। ফলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আরফানকে আওয়ামী লীগের নেতা হিসেবে উপস্থাপনের অন্যতম নথিটিই জাল বলে উঠে আসে।

চেকের টাকা না দেওয়ার কৌশল

আরফান মিয়ার অভিযোগ, ব্যবসায়িক বিরোধের জেরেই তার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ আনা হয়েছে। চেকের মামলায় টাকা পরিশোধ না করার কৌশল হিসেবে তাকে আওয়ামী লীগের নেতা ও জুলাইয়ের মামলার আসামি বানিয়ে গ্রেফতার করানো হয়েছে।

আরফান মিয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের রাজনীতি বা ছাত্র হত্যায় জড়িত থাকার কোনও প্রমাণ তদন্তে পাওয়া যায়নি। থানার রেকর্ডেও কোনও ওয়ারেন্ট ছিল না। এরপরও আমাকে একটি মামলায় গ্রেফতার করা হলো। মূলত চেকের মামলার টাকা না দেওয়ার কৌশল হিসেবেই আমাকে হয়রানি ও গ্রেফতার করা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যে কমিটির তালিকা দেওয়া হয়েছিল, সেটিও জাল। পুলিশের তদন্তে অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ার পরও আমাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এতে বোঝা যায়, আমাকে ফাঁসানোর জন্য পরিকল্পিতভাবে এসব করা হয়েছে।’

শরিফুলের বিরুদ্ধে আরও কয়েকটি অভিযোগ, হয়রানি আরও অনেকের

চলতি বছরের ২১ এপ্রিল ধর্ষণ-চুরি ও হত্যা চেষ্টার মামলায় (মামলা নং ১০৮/২০২৫) গ্রেফতার হন শরিফুল ইসলাম। মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, শরিফুল এক নারীকে ধর্ষণের চেষ্টায় ব্যর্থ হলে মারধর করেন। একপর্যায়ে ওই নারীর তলপেটে লাথি দেন। ভুক্তভোগী ওই নারী তখন অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। এ সময় তার প্রচুর রক্তক্ষরণ হয় এবং পেটে থাকা বাচ্চাটি মারা যায়। এ ছাড়া ২০২৫ সালের নভেম্বরে শরিফুলের বিরুদ্ধে ধামরাই পৌরসভার মলয়ঘাট এলাকায় সরকারি জলাশয় দখল ও বালু দিয়ে ভরাটের অভিযোগ ওঠে।

অভিযোগ রয়েছে, ভিপি কেস নং- ৩৮/৮১, এসএ খতিয়ান নং- ৩৪১, এসএ দাগ নং- ৫২১,আর এস খতিয়ান ৪১ ,আর ,এস দাগ৪০৮ সাং ডি/১৩৪, অনুযায়ী ধামরাই মলয়ঘাট মৌজার আওতাধীন প্রায় ১৮ শতক সরকারি জমির মধ্যে প্রায় ৯ শতক জমি অবৈধভাবে দখল করে বহুতল ভবন নির্মাণ করেছেন শরিফুল। এ ছাড়া সরকারের অনুমতি ছাড়াই ২০১২ সালে বায়নানামার মাধ্যমে লিজকৃত সরকারি সম্পত্তি অন্যের কাছে হস্তান্তরের অভিযোগ আছে। এ ছাড়াও বাংলা ১৪২০ সাল থেকে ১৪৩৩ সাল পর্যন্ত উক্ত জমির লিজ নবায়ন করা হয়নি।

সরকারি নথি অনুসারে, ০৬ মে ২০১৩ তারিখে সোরহাব হোসেন ও শরিফুল ইসলাম গংদের একটি একতলা সেমিপাকা ঘর নির্মাণের সীমিত অনুমতি প্রদান করা হয়েছিল। এ ছাড়াও তার বিরুদ্ধে ধামরাই পৌরসভা শ্রমিক দলের সিনিয়র সহসভাপতি সাইফুল ইসলাম টিটো ও তার পরিবারকেও ‘ভুয়া মামলা’ দিয়ে হয়রানির অভিযোগ আছে।

এই প্রতিবেদকের কাছে আরও অন্তত দুজন ভুক্তভোগী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিভিন্ন দফতরে ভুয়া চিঠি দিয়ে হয়রানির অভিযোগ জানান। এর মধ্যে একজন দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ আমলে তাকে যুবদল উল্লেখ করে পুলিশের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তাকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি আমলে তাকে যুবলীগ উল্লেখ করে পুলিশের কাছে চিঠি দিয়ে তদন্ত ও গ্রেফতারের দাবি করা হয়েছে।

গত ১৩ আগস্ট মো. সাফায়েত খান ওপেল নামে আরেক ব্যক্তি শরিফুল ইসলামের বিরুদ্ধে ধামরাই থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। এতে তিনি উল্লেখ করেন, অভিযুক্ত ভুক্তভোগীর নামে আওয়ামী লীগের ভুয়া কমিটির প্যাড তৈরি করে তাকে হেনস্তার চেষ্টা করছেন।

বিচার চান আরফান, পরিবারের সদস্য ও অপর ভুক্তভোগীও

সরেজমিনে আরফান মিয়ার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, একটি পাকা ভবনের একটি ফ্ল্যাটে পরিবারের সঙ্গে থাকেন তিনি। ঘরে শিশুসন্তান। আরফান যখন গ্রেফতার হন তার স্ত্রী সাত মাসের অন্তঃসত্তা। কাঁদতে কাঁদতে তার স্ত্রী রাবেয়া আক্তার ঝর্ণা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি এই শারীরিক অবস্থা নিয়েই থানা, আদালতে দৌড়াদৌড়ি করেছি। পুলিশকে অনুনয় করেছি। বলেছি, তার বিরুদ্ধে মামলা নাই। তাকে জেলে দিয়েন না। শরিফুল তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে। কিন্তু কেউ কথা শোনেনি। আমার এই সময়ে আমার স্বামীকে আমার পাশে থাকতে দেয়নি। আমি বিচার চাই। যারা যারা জড়িত সবার বিচার চাই।’

আরফান মিয়া বলেন, ‘আমার সঙ্গে তার ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল। সে আমাকে সেখানে ঠেকাতে মামলা দিয়ে হয়রানি করেছে। আমি এই হয়রানির বিচার দাবি করছি।’

এ ব্যাপারে ধামরাই পৌরসভা শ্রমিক দলের সিনিয়র সহসভাপতি সাইফুল ইসলাম টিটো বলেন, ‘গত নির্বাচনের আগে বাসায় রাত আনুমানিক ১১টার দিকে শুয়ে আছি। তখন পুলিশ এসে দরজা ধাক্কাচ্ছে। তো জিজ্ঞেস করলাম, কী অপরাধ? বলে না। বাদী কে? নাম বলে না। পরে বিভিন্ন জায়গায় ফোন করলাম। আমার নামে মামলা নাই, আমার বাড়ি পুলিশ কেন? পরে আমাকে থানায় নিয়ে গেলো। পরে পুলিশ বললো, মামলার বাদি শরিফুল। কি কারণ? আমি নিজেও জানি না। মূলত, অন্য একটা ঘটনায় বিরোধ থেকে সে পুলিশকে ব্যবহার করে। মিথ্যা মামলার কারণে আমি অনেক হয়রানির শিকার হয়েছি। আমি এর বিচার চাই।’

এসব বিষয়ে যা বললেন শরিফুল

এসব বিষয়ে কথা হয় অভিযোগকারী শরিফুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমাকে আরফান নানাভাবে হয়রানি করে আসছিল। সেসবের বিরুদ্ধে নানা জায়গায় অভিযোগ দিয়েও বিচার না পেয়ে তখন আমি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শরণাপন্ন হই। সেখানে একটা অভিযোগ করি, আসলে ওর ব্যাকগ্রাউন্ডটা যাচাই-বাছাই করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হোক। ও তো একের পর এক আমাকে হয়রানি করে আসতেছে। এলোপাতাড়ি মামলা দিয়েছে, কোনও ডকুমেন্টস নাই, কিছু নাই। অথচ এই দিনেও যদি আমরা যারা বিএনপি করি, তাদেরই মাইর দেয়, হুমকি দেয় আওয়ামী লীগে, আবার বিএনপি নেতাদের সঙ্গে ঘোরে। এগুলো তো বড় সমস্যা।’

তিনি বলেন, ‘এই অভিযোগটা দেওয়ার পরে যথাযথ নিয়ম অনুযায়ী সেটা সাভার সার্কেল অফিসে যায়। ওই অফিস থেকে আমাকে ফোন দেওয়া হলো- একটা তারিখ দিলো, বললো, ওই তারিখে আপনি আমাদের কার্যালয়ে এসে দেখা করেন। আমি জীবনে প্রথম ওখানে যাই। সাভার মডেল থানার ভেতরেই, আরও ভেতরে যাইতে সার্কেল স্যারের রুমে। সেখানে গেলাম। পরে সে আমার বক্তব্য কিছু নিলো না, বললো, “আপনার অভিযোগের প্রেক্ষাপটে লিখিত বক্তব্য দিয়ে যান।” এরপর কম্পিউটারম্যানের কাছে পাঠিয়ে দেন। তো আমি লিখিত বক্তব্য দিলাম। আমি যা বললাম, তারা ওগুলোই টাইপ করলো। আমার কাছে যা যা ডকুমেন্ট ছিল, সে আওয়ামী লীগ করতো, এখনও যে আমাকে হয়রানি করতেছে- সব দিয়ে আসলাম। পরবর্তীতে তারা কী নিলো আর কী নিলো না, তা আমি জানি না।’

যা বলছে পুলিশ

এসব বিষয়ে ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. জাহাঙ্গীর আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই বিষয়টি জেনেছি। এ বিষয়ে ধামরাই থানার ওসির সঙ্গে কথা হয়েছে। তার কাছ থেকে জেনে বিস্তারিত জানানো হবে। আর যদি ওই ব্যবসায়ী কোনও সহায়তা চান, সেই অনুযায়ী তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’