Image description

‘আমি তোমাদের জন্ম সনদে স্বাক্ষর করেছি। তোমরা আমা‌র মৃত্যু সনদে স্বাক্ষর করবে। আমি তোমাদের প্রথম পোশাকটি বেছে নিয়েছিলাম। তোমরা আমার শেষ পোশাকটি বেছে নেবে। আমি তোমাদের প্রথম শ্বাস নিতে দেখেছি। তোমরা আমার শেষ নিঃশ্বাস নিতে দেখবে। মনে রেখো, তোমরা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় উপহার।'’

কলকাতায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত কুষ্টিয়ার সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত গত ৩১ জুলাই নিজের ফেসবুক ওয়ালে তার দুই সন্তানের ছবিসহ এমনটি লিখেছিলেন। এর ঠিক গত ১৯ দিন পর ফেসবুকে লেখা কথাগুলোই যেন সত্যি হয়ে গেলো তার।

 

খবরের পেছনে ছুটে চলা সাংবাদিক দেবাশীষ নিজেই হয়ে গেলেন খবরের প্রধান শিরোনাম। মৃত দেবাশীষ দত্ত আজকের পত্রিকা ও বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল নাইনের কুষ্টিয়া প্রতিনিধি ছিলেন। এ ছাড়া তিনি কুষ্টিয়া থেকে প্রকাশিত আজকের আলো পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন। একই ঘটনায় তার স্ত্রী আফসানা শারমীন (২৭), ছেলে শর্ণশীষ দত্ত (৩) ও শ্বশুর আকরাম হোসেন (৬০) মারা গেছেন। চিকিৎসার জন্য ১৫ দিন আগে তারা ভারতের কর্নাটকের বেঙ্গালুরুতে গিয়েছিলেন। গত বুধবার তাদের দেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু দেশে ফিরছেন লাশ হয়ে। মঙ্গলবার দিবাগত মধ্যরাতে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি আবাসিক হোটেলে আগুনে পুড়ে মারা যান দেবাশীষ দত্তসহ তার পুরো পরিবার।

মঙ্গলবার রাতে কলকাতায় নিউ মার্কেটের কাছে মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে শিশুসহ নয় জনের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে কুষ্টিয়ার ওই চার জন ছিলেন।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত ৩ আগস্ট স্ত্রীকে নিয়ে কলকাতা যান দেবাশীষ। সেখান থেকে চিকিৎসার জন্য বেঙ্গালুরু যান তারা। পরে চিকিৎসা শেষে কলকাতায় ফেরেন। বুধবার সকালে তাদের দেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই রাতের আগুনে সব শেষ হয়ে যায়।

দেবাশীষের ভায়রা ফিরোজ হোসেন জানান, তিনি ও তার শ্বশুর আকরাম আলী চিকিৎসার জন্য বেঙ্গালুরু গিয়েছিলেন। চিকিৎসা শেষে তিনি গত সোমবার বিমানযোগে দেশে ফেরেন। তবে তার শ্বশুরসহ দেবাশীষের পরিবার কলকাতায় থেকে যায়। বুধবার তাদের দেশে ফেরার কথা ছিল।

কুষ্টিয়া শহরের আড়ুয়াপাড়ার একটি ভাড়া বাসায় পরিবার নিয়ে থাকতেন দেবাশীষ। সেখানে তার মা-বাবা ও বড় মেয়ে দিবানীত দত্ত রয়েছে। ভারতে যাওয়ার সময় মেয়েকে দাদা-দাদির কাছে রেখে গিয়েছিলেন। এ কারণে প্রাণে বেঁচে গেছে শিশুটি।

বুধবার (১৯ আগস্ট) দুপুরে শহরের আড়ুয়াপাড়ার বাসায় গিয়ে দেখা যায়, স্বজনদের আহাজারিতে পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছে। দেবাশীষের মা স্বপ্না দত্ত বিলাপ করছিলেন। স্বজনরা তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। বাবা-মা ও ভাইকে হারিয়ে নির্বাক হয়ে বসে ছিল দিবানীত। তার চোখে তখনও পানি।

দেবাশীষের বাবা দিলীপ কুমার দত্ত বলেন, ‘সকালে বারবার ফোন করেও ছেলের কোনও সাড়া পাচ্ছিলাম না। পরে দেবাশীষের ভায়রা ফিরোজ হোসেনের ফোনে একজন বাংলাদেশি দূতাবাস কর্মকর্তা কথা বলেন এবং তাদের মৃত্যুর খবর জানান। এর আগে টেলিভিশনে দেখেছি কলকাতার হোটেলে আগুনে আট জন মারা গেছে। এর মধ্যে আমার সন্তানরা থাকবে, কখনও ভাবতে পারিনি।’

দেবাশীষ দত্ত কুষ্টিয়ার সাংবাদিক অঙ্গনের অতিপরিচিত মুখ। কলেজ জীবন থেকেই তার সাংবাদিকতার হাতেখড়ি। কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ থেকে অর্থনীতিতে মাস্টার্স করার পর পেশা হিসেবে সাংবাদিকতা বেছে নিয়েছিলেন।