Image description
চক্রের দখলে নদী : ত্রাসের রাজত্বে রক্তাক্ত বালুমহাল

নদীর বুক চিরে অবৈধ ড্রেজারের তাণ্ডব ও রাতে ভারী ট্রাকের বিকট শব্দ। বিপরীতে স্থানীয় মানুষের বুকফাটা আর্তনাদ। এমন চিত্র সারা দেশের বালুমহালে। শুধু তাই নয়, সহিংস নানা ঘটনায় বালুমহালগুলো পরিণত হয়েছে এক একটি ত্রাসের রাজত্বে। ক্ষমতার পালাবদলে কেবল সাইনবোর্ড আর মুখের ভাষা বদলায়, কিন্তু বদলায় না অপরাধ। শুধু ব্যক্তির বদল। অপরাধীরা থেকে যায় অধরা। এর নেপথ্য কারণ অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ত্রিভুজ সিন্ডিকেটের ভয়ংকর তৎপরতা।

সংঘবদ্ধ এই অপরাধের পেছনে আশ্রয়দাতা হিসাবে সামনে রয়েছে বিএনপি, পেছনে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী চক্র। অন্যদিকে রক্ষাকবচ হিসাবে অদৃশ্য সুরক্ষার চাদর বিছিয়ে রেখেছে প্রশাসন। জড়িত একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী। এখানেই শেষ নয়। এসব অপরাধ আড়াল করতে আছে একশ্রেণির সুবিধাভোগী সাংবাদিকও। সব মিলিয়ে এ চক্রের অপতৎপরতায় বেসামাল সব ক’টি বালুমহাল। আইনকানুনের তোয়াক্কা না করে চলছে ইজারাদারদের বেপরোয়া দৌরাত্ম্য। ফলে নদীভাঙনের কবলে পড়ে বিলীন হচ্ছে শত শত একর ফসলি জমি ও বসতভিটা। এর প্রভাবে ভেঙে পড়েছে পরিবেশ-প্রতিবেশের ভারসাম্য। সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন ও যুগান্তরের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর নানা তথ্য।

এদিকে ইজারার শর্ত ভঙ্গ করলে জামানত বাজেয়াপ্ত ও ইজারা বাতিলে স্পষ্ট আইনি বিধান থাকলেও বাস্তবে প্রয়োগ নেই। আবার কোনো ঘটনায় জেলা প্রশাসক (ডিসি) এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) প্রত্যাহার করা হয়। অনেক সময় আসল অপরাধীকে আড়াল করতে এভাবে লোক দেখানো ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যারা দাপটের সঙ্গে বালু লুট করেছেন, তারা এখন আত্মগোপনে থেকে নতুন রাজনৈতিক শক্তির প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে গোপন আঁতাতে সফল হয়েছেন। এই দুই পক্ষের যোগসাজশ এবং পেশিশক্তির জোরে দেশের অধিকাংশ বালুমহাল এখন গুটিকয়েক সন্ত্রাসীর পৈতৃক সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বালুমহালকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া সন্ত্রাসী ঘটনাগুলো যেন কোনো থ্রিলার সিনেমাকেও হার মানায়। মানিকগঞ্জের শিবালয়ে যমুনা নদীর দুর্গম চরাঞ্চলে প্রকাশ্য দিবালোকে স্পিডবোটে এসে বালুমহালের ম্যানেজারকে গুলি ও কুপিয়ে হত্যার ঘটনা প্রমাণ করে পরিস্থিতি কতটা ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে অবৈধ বালু উত্তোলনে বাধা দেওয়ায় স্পিডবোট থেকে সাধারণ গ্রামবাসীর ওপর বৃষ্টির মতো গুলি ছোড়ার ঘটনা আরও ভয়াবহ।

জানা গেছে, পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা থেকে শুরু করে সুরমা, যাদুকাটাসহ অনেক নদীর বুকে চলছে শত শত অবৈধ ড্রেজারের তাণ্ডব। ধ্বংসযজ্ঞ চলছে স্থানীয় প্রশাসনের নাকের ডগায়। মাঝে মধ্যে দিনের বেলায় লোকদেখানো অভিযান পরিচালনা করা হলেও রাতে দ্বিগুণ উৎসাহে শুরু হয় বালু চুরি। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা ভয়ংকর ত্রিভুজ সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারলে বালুসন্ত্রাস আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্ট অনেকের।

আরও জানা গেছে, ২০২৫ সালের ১৪ এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত এক বছর মেয়াদে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর থানাধীন যাদুকাটা নদীতে যাদুকাটা-১ (৮৯.৫৬ একর) বালুমহালটি ইজারা পান তাহিরপুর উপজেলা বিএনপি নেতা (দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি) নাছির মিয়া। একই সময়ের জন্য যাদুকাটা-২ (৩৯৮.০৪ একর) বালুমহালের ইজারা পান সাবেক ছাত্রলীগ নেতা শাহ রুবেল আহমেদ। কিন্তু মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও আইনের ফাঁক গলে ইজারাদাররা এখনো বালু উত্তোলন করছেন। সিন্ডিকেট সদস্যরা এখান থেকে দিনে কোটি টাকার বেশি চাঁদা আদায় করছে।

এক্ষেত্রে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে শতাধিক ক্যাডার। চাঁদা আদায়ে ক্যাডার বাহিনীর সক্রিয় সদস্যরা হলেন-রাণু মেম্বার, মোশাহিদ হোসেন, পাথর মুত্তালিব, ফিরোজ আলী, মোশালম, মান্না শাহ, আতাউর, রুবেল মিয়া, রাকাব উদ্দিন, হাকিকুল, আক্কাছ, লোকমান, মোবাশ্বির, আবুল হোসেন, রতি মিয়া, ইসলাম উদ্দিন, সেলিম চৌধুরী, ইদু মিয়া, আবু ইসলাম, ইকরাম, সুমন, গোলাম রব্বানী, বোরহান, হাসান, হাবিবুর, আব্দুল কাইয়ুম, মনসুর, সাজ্জাদ (বরখাস্তকৃত পুলিশ সদস্য) ও কয়েকটি গণমাধ্যমের কয়েকজন বিতর্কিত কর্মীসহ অনেকেই।

সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ আমলে যাদুকাটা নদীর বালু সিন্ডিকেটের মূল নিয়ন্ত্রণ ছিল সুনামগঞ্জ জেলা পরিষদের সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের অর্থ সম্পাদক মুজিবুর রহমান এবং জেলা আওয়ামী লীগ নেতা রতন মিয়ার হাতে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ ও বিএনপির স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠী নিজেদের মধ্যে সমঝোতা করে বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ শুরু করেন। বিএনপির একজন সংসদ-সদস্যের ছত্রছায়ায় নাছির মিয়া ও বিদেশে পলাতক আওয়ামী লীগ নেতা নূরুল হুদা মুকুটের প্রতিনিধি শাহ রুবেল এই সিন্ডিকেট সক্রিয় রেখেছেন। রুবেলের সঙ্গে আওয়ামী অংশে আছেন আলমগীর ও মোবারক হাজিসহ অনেকেই। আর নাছিরের সঙ্গে বিএনপি অংশে আছেন জুনাব আলী, আনিসুল হক, মুস্তাক আহমদ, শাখাওয়াত প্রমুখ।

বালু লুটে আরও যাদের নাম বেরিয়ে এসেছে তারা হলেন-চাঁন মিয়া মাস্টার ওরফে চান্দু, আবু সাঈদ, সামসু আলম, আকাশ, মনর, আব্দুল্লাহ, সুবেল, আব্দু হান্নান, এমামুল, মাসুক সর্দার, রায়হান উদ্দিন রিপন, জামাল, বিল্লাল, রহিছ ওরফে টেরা রহিছ, মান্নান, মালেক, ফারুক, খাজা মাইনুদ্দীন, জাহাঙ্গীর, আলম সাব্বির, তমিজ উদ্দিন, শফিকুল ইসলাম, সাইতু, ইসমাইল, খোকন, সবুজ প্রমুখ।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সিলেটের স্থানীয় সাংবাদিক সোহেল তালুকদার জানান, অবৈধ বালু উত্তোলন নির্বিঘ্নে চালু রাখতে প্রতিমাসে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের অসাধু কর্মকর্তাদের কোটি কোটি টাকা ঘুস বা মাসোহারা হিসাবে দেওয়া হয়। মাসোহারা দিতে হয় নৌপুলিশ, থানা পুলিশ, ক্যাম্প পুলিশ, পরিবেশ অধিদপ্তর, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং সাংবাদিকদের। কতিপয় সাংবাদিক ও স্থানীয় মিডিয়া প্রতিনিধিদের ৩টি স্তরে মাসোহারা দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, যাদুকাটা নদীর বালুমহাল থেকে তাহিরপুরের স্থানীয় অসাধু সাংবাদিকরা প্রতিমাসে দুই হাজার থেকে পাঁচ হাজার, জেলা পর্যায়ের প্রতিনিধিরা পাঁচ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা এবং সিলেটে ব্যুরো অফিসের দায়িত্ব পালনকারী কয়েকজন সাংবাদিক মাসে ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত মাসোহারা পান। এদের মধ্যে তাহিরপুরের একজন প্রভাবশালী সাংবাদিক দিনে চাঁদা নেন ১০ হাজার টাকা। এছাড়া পরিবারের এক সদস্যকে দিয়ে রাতের বেলা নয়টি ড্রেজার চালিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করেন।

এ খাত থেকে দৈনিক আয় করেন পাঁচ লাখ টাকা। এর বাইরে তিনি চোরাচালান সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিকে ঢাকায় অবস্থানরত কয়েকজন সাংবাদিকের মাসোহারা ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। তিনি বলেন, অবিশ্বাস্য হলেও এসব তথ্য সত্য। অলিখিত এই প্র্যাকটিস চলে আসছে দুই-তিন দশক ধরে। ফলে বালুমহাল থেকে রাজনীতিবিদ, পুলিশ সদস্য, স্থানীয় প্রশাসন ও গণমাধ্যমকর্মীদের অবৈধ সুবিধা নেওয়া যতদিন বন্ধ হবে না, ততদিন এই বালু সন্ত্রাস চলতে থাকবে। বরং আরও বাড়বে।

সূত্র জানায়, সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ-সদস্য (এমপি) কামরুজ্জামান কামরুল সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দেওয়া এক ডিও লেটারে (আধাসরকারি পত্র) বালু সন্ত্রাস বন্ধে হস্তক্ষেপ কামনা করেন। এতে তিনি উল্লেখ করেন, স্থানীয় প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে অসাধু চক্র দিনের পর দিন যাদুকাটা নদীর তীর কেটে অবাধে বালি বিক্রি করে আসছে।

এর ফলে হুমকির মুখে পড়েছে নদীতে নির্মাণাধীন সেতু, এশিয়ার বৃহত্তম শিমুল বাগান এবং লাউড়ের গড়, ঘাগটিয়া, ঘরঘাটি ও বিন্নাকুলি বাজারসহ আশপাশের বেশ কয়েকটি গ্রাম ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এ বিষয়ে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে পুলিশ ফোর্স কেবল দায়সারা দায়িত্ব পালন করে। দু-একদিন দু-চার মিনিটের জন্য পুলিশ উপস্থিত হলেও বাস্তবে কোনো কাজেই আসছে না। পুলিশের এই ঢিলেঢালা ভূমিকার সুযোগে দুষ্কৃতকারীরা রাতের অন্ধকারে প্রতিনিয়ত নদীর তীর কেটে অবৈধভাবে বালি ও পাথর উত্তোলন চালিয়ে যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য : জানতে চাইলে পুলিশের মুখপাত্র (এআইজি, মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাৎ হোসাইন যুগান্তরকে বলেন, সারা দেশের বালুমহালে নিয়মিত অভিযান চলছে। পুলিশের সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে এ বিষয়ে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা বিশ্লেষণ করে দেখা হচ্ছে। জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) তাপস শীল যুগান্তরকে বলেন, ‘আমরা চাই না, মেয়াদ শেষ হওয়া ইজারাদাররা বালু তুলুক। এ কারণে হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে আপিল দায়ের করা হয়েছে। যে কোনোদিন আপিলের শুনানি অনুষ্ঠিত হতে পারে। শুনানি শেষ হলে নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী দরপত্র (টেন্ডার) আহ্বান করা হবে।’ সাবলিজ এবং অবৈধ চাঁদা আদায়ের তথ্য তার জানা নেই বলে তিনি যুগান্তরকে জানান।

স্থানীয় বিএনপি নেতা ও যাদুকটা-১ বালুমহালের ইজারাদার নাছির মিয়া বলেন, দেশের অন্যান্য বালুমহাল থেকে যেভাবে বালু উত্তোলন করা হয়, যাদুকাটা নদী থেকেও একইভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। তিনি বলেন, সরকারি নথিতে এপ্রিলের ১৩ তারিখ মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা বলা হলেও আমরা গত ফেব্রুয়ারিতে সময় বাড়ানোর (এক্সটেনশন) আবেদন করেছি। সে অনুযায়ী আরও প্রায় দেড় মাস মেয়াদ রয়েছে।

যাদুকাটা-২ এর ইজারাদার শাহ রুবেল আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, নির্ধারিত সময়ে আমরা ইজারা বুঝে পাইনি। নির্ধারিত সময়ের প্রায় পাঁচ মাস পর, অর্থাৎ সেপ্টেম্বরে আমাদের নদীর দখল হস্তান্তর করা হয়। ফলে নিয়মানুযায়ী আগামী সেপ্টেম্বরের ৩০ তারিখ পর্যন্ত আমাদের ইজারার মেয়াদ বহাল রয়েছে।