Image description

বাংলাদেশের অন্যতম উন্নয়ন সহযোগী দেশ চীন। এই সুযোগে নানা উন্নয়ন প্রকল্প, বাণিজ্য ও পর্যটন ভিসায় দেশটির নাগরিকরা সহজেই বাংলাদেশে আসতে পারছে। তবে তাদের একটি অংশ জড়িয়ে পড়ছে বহুমাত্রিক অপরাধে। অনলাইন জুয়া ও নানা প্রতারণার মতো অপরাধের পাশাপাশি বিয়ের প্রলোভনে পাচার, খুন ও ধর্ষণের মতো ভয়ংকর অপরাধেও জড়াচ্ছে চীনের নাগরিকদের কেউ কেউ। বিশেষ করে রাজধানীর উত্তরার মতো অভিজাত এলাকায় ‘ঘাঁটি’ গেড়ে বসেছে বিদেশি এই অপরাধী চক্র। গত কয়েক দিন ধরে উত্তরা এলাকায় স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে এবং স্থানীয় পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্রে মিলেছে এসব তথ্য।

মামলার নথি ঘেঁটে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে চলতি বছরের ১০ আগস্ট পর্যন্ত দুই বছরে রাজধানীতে নানা অপরাধে জড়িয়ে চীনের অন্তত ৫৩ নাগরিক গ্রেপ্তার হয়েছে। তাদের মধ্যে চলতি বছরই গ্রেপ্তার হয় ২৪ জন। ২০টি মামলার আসামি হিসেবে দেশটির আরও কয়েকজন নাগরিককে খুঁজছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তাদের মধ্যে রোমহর্ষক খুনের মামলার আসামিও রয়েছে।

অবশ্য বিভিন্ন সময় নানা অপরাধে চীনের নাগরিকরা গ্রেপ্তার হলেও তারা সহজেই কারাগার থেকে বের হয়ে যাচ্ছে বলে তথ্য মিলেছে। কারাগার সূত্রে জানা গেছে, গত ৩০ জুন পর্যন্ত দেশের কারাগারগুলোতে বিদেশি বন্দির সংখ্যা ছিল ৩৯৩ জন। তাদের মধ্যে চীনের নাগরিক ছিল মাত্র একজন।

পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজধানীর উত্তরার বিভিন্ন এলাকায় চীনের অন্তত ১০ হাজার নাগরিকের বসবাস। তাদের কারও কারও অপরাধের জাল ওই এলাকা ছাড়াও রাজধানীর অন্যান্য এলাকা ছাপিয়ে গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদেশি কোনো নাগরিক দেশে প্রবেশের পর তার ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখা জরুরি। এমনকি তিনি যে কাজের অনুমোদন নিয়ে এসেছেন, সেই কাজটি করছেন কি না তাও তদারকি করা প্রয়োজন। এই তদারকি যথযথভাবে না হওয়ায় বিদেশি নাগরিকরা নানা ধরনের অপরাধে জড়ানোর সুযোগ পাচ্ছে।

একের পর এক অপরাধ কার্যক্রমে চীনের নাগরিকদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) মোহাম্মদ ওসমান গণি কালবেলাকে বলেন, বিদেশি নাগরিকদের কেউ অপরাধের সঙ্গে জড়িত হলে তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘বিদেশি নাগরিকরা যে কাজের অনুমতি নিয়ে আসছেন, সেটি তদারক করা প্রয়োজন। আমরা এ বিষয়ে কাজ করছি। কেউ অবৈধভাবে কোনো কাজ বা অন্যায় করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

উত্তরা এলাকার বাসিন্দা ও মাঠ পর্যায়ে দায়িত্বরত পুলিশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চীনের নাগরিকদের মধ্যে যারা নানা প্রতারণায় যুক্ত, তাদের কাছ থেকে বাসা ভাড়া পাওয়া যায় বেশি। এ জন্য এক শ্রেণির বাড়ির মালিক এই ধরনের বিদেশিদের বাসা ভাড়া দিতে আগ্রহী হন এবং তাদের অবস্থানের বিষয়টি পুলিশের কাছে গোপন রাখেন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের উত্তরা বিভাগের এক কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, তারা বিভিন্ন সময় বিদেশি নাগরিকদের তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে দেখেছেন, অনেক বাড়িতে বিদেশি নাগরিকরা ভাড়া থাকলেও ভাড়ার চুক্তি হয় তাদের এ দেশীয় সহযোগীদের নামে। এজন্য ভাড়াটে তথ্য ফরমেও বিদেশিদের অবস্থানের কথা উল্লেখ থাকে না। এ ছাড়া বিদেশি হওয়ায় পুলিশও তাদের নিয়ে খুব একটা ঘাঁটাঘাঁটি করে না।

মাঠ পর্যায়ে কাজ করা পুলিশ সূত্র বলছে, পুলিশের ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে ‘বিদেশি নাগরিকদের কেউ যাতে হয়রানির শিকার না হন’, সে বিষয়ে মাঠ পর্যায়ের পুলিশের কাছে মৌখিক নির্দেশনা রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমন নির্দেশনার কারণে মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা বিদেশি নাগরিকদের ‘সমীহের’ চোখে দেখেন এবং চীনসহ নানা দেশের নাগরিকদের অপরাধগুলো আগাম প্রতিরোধও করতে পারেন না। যখন কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়, তখনই তা সামনে আসে।

উত্তরায় চীনের নাগরিকদের বেশি অপরাধপ্রবণ হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার মির্জা তারেক আহমেদ বেগ কালবেলাকে বলেন, মানব পাচার ও অনলাইন জুয়ায় জড়িত থাকার ঘটনায় প্রতিনিয়তিই মামলা হচ্ছে। দেশি-বিদেশি বলে কেউ অপরাধ করে পার পাওয়ার সুযোগ নেই। অপরাধ করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না।

তিনি বলেন, ‘আমাদের তালিকা অনুযায়ী উত্তরা এলাকায় চীনের ১০ হাজার নাগরিক বসবাস করে। সবাই তো অপরাধ করে না। তাই আমাদের নির্দেশনা হলো, তাদের সঙ্গে যেন খারাপ ব্যবহার না করা হয়।’

স্বদেশি হত্যার ভয়ংকর মিশন: সময়টি ২০২৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি দুপুর। ওই দিন উত্তরা ১৪ নম্বর সেক্টরের ১৬ নম্বর রোডের একটি বাসা থেকে ওয়াং বো নামের চীনের এক নাগরিকের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মরদেহে হত্যার আলামত মেলায় ওই ঘটনায় একই দেশের নাগরিক ও নিহতের সহকর্মী লিউ রুই বাদী হয়ে উত্তরা পশ্চিম থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। ওয়াং বো নির্মাণসামগ্রী ব্যবসায়ী ছিলেন।

তদন্তে নেমে পুলিশ ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ ও তথ্যপ্রযুক্তির বিশ্লেষণ করে চমকে যায়। সেই হত্যাকাণ্ড যেন হলিউডের হরর সিনেমাকেও হার মানায়! তদন্তে উঠে আসে, পর্যটকের ছদ্মবেশে চীন থেকে ঢাকায় এসে ওয়াং বোকে নির্মমভাবে হত্যা করে ফের গোপনে দেশ ছাড়ে ঘাতকরা। হত্যায় সরাসরি অংশ নেয় চীনের বাংবু অঞ্চল থেকে আসা ফান পেং ও জান্নান থেকে আসা লিউ ফ্যানলং নামে চীনের দুই নাগরিক। ঘটনার পরপরই দেশ ত্যাগ করায় তাদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। অবশ্য হত্যার সময় গাড়ি দিয়ে ঘটনাস্থলে আসা ও হত্যা শেষে নিরাপদে পালিয়ে যেতে সহযোগিতার অভিযোগে হৃদয় নামের এক বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। হৃদয়ের বক্তব্য ও পাসপোর্টের তথ্য বিশ্লেষণ করে তদন্তকারীরা জানতে পারেন, ওয়াং বো নিহত হওয়ার মাসখানেক আগে বাবার শেষকৃত্যে অংশ নিতে চীনের বাংবু রাজ্যের আনহুয়েতে যান তিনি। নিজ দেশে ২৭ দিন অবস্থানের পর ১৮ ফ্রেব্রুয়ারি ফেরেন বাংলাদেশে।

তদন্তে বেরিয়ে আসে, চীনে পুরোনো দ্বন্দ্বের জেরে ওয়াং বোকে হত্যার মিশনে নামে দেশটির দুই নাগরিক। পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা বাংলাদেশে এসে উত্তরা ১০ নম্বর সেক্টরের একটি হোটেলে অবস্থান নিয়ে ওয়াং বোর গতিবিধি নজরদারি করতে থাকে। একপর্যায়ে ঘটনার দিন ওয়াং বোর বাসায় যায় সেই দুজন। মাত্র দুই থেকে তিন মিনিট বাসায় অবস্থানের পর দৌড়ে নিচে নামে এবং অপেক্ষমাণ গাড়িতে উঠে তারা চলে যায়। সেই গাড়িটি সরসারি বিমানবন্দরে চলে যায়।

ওই ঘটনায় দায়ের মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা পশ্চিম থানার উপপরিদর্শক দীন ইসলাম বলেন, মামলাটি তদন্ত শেষে আদালতে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে।

কথিত বিয়ে ও ধর্ষণ: চলতি বছরের ১৭ মার্চ উত্তরার তুরাগ থানার ৩ নম্বর সেক্টরের দলিয়াপাড়া এলাকার একটি বাসায় অভিযান চালায় র্যাব ও পুলিশ। গ্রেপ্তার করা হয় এক বাংলাদেশিসহ চীনের দুই নাগরিককে। ওই সময় বাসা থেকে জিম্মি অবস্থায় উদ্ধার করা হয় ১৯ বছর বয়সী এক তরুণীকে। তাকে পাচারের জন্য বাসাটিতে জিম্মি করে রাখা হয়েছিল।

তদন্তসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গ্রেপ্তার চীনের দুই নাগরিকের এ দেশীয় সহযোগী সুইটি আক্তার নামের এক নারী। ওই নারী ও তার স্বামীর নেতৃত্বে চক্রটি বিভিন্ন জেলা থেকে তরুণীদের বিদেশে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে উত্তরায় এনে বিভিন্ন বাসায় আটকে রাখে। এরপর ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে তাদের কথিত বিয়ের মাধ্যমে চীনের নাগরিকদের হাতে তুলে দেওয়া হতো। একজন বিয়ে করলেও জিম্মি রেখে একাধিক পুরুষ মিলে ভুক্তভোগীকে ধর্ষণ করত।

গোপনে ছবি তুলে ম্যারেজ মিডিয়া সাইটে আপলোড করে বিয়ের নামে পাচারের ফাঁদ: উত্তরার দক্ষিণখান, আশকোনা ও তুরাগ এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চীনের এক শ্রেণির নাগরিক মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে এলাকার নানা দৃশ্যের ছবি তোলে। এই ফাঁকে তরুণী দেখলে গোপনে তাদেরও ছবি তোলা হয়। এরপর নানা কৌশলে তাদের ফেসবুক লিঙ্ক ও যোগাযোগের নম্বরও নেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে নিম্ন আয়ের পরিবারের তরুণীদের নানা সহায়তার কথাও বলা হয়। এক পর্যায়ে সেই ছবি নিজ দেশের বিয়ের সাইটে আপলোড করে বিক্রি করা হয়।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র বলছে, উত্তরার অপেক্ষাকৃত নিম্ন আয়ের মেয়েদের ফেসবুকে চীনের নাগরিকদের পক্ষ থেকে বন্ধুত্ব করার অনুরোধ আসে। একপর্যায়ে সম্পর্ক গড়ে চীনে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এজন্য দেশেই রয়েছে তাদের সহযোগী চক্র। চীনাদের এই বিয়ের সাইটের ফাঁদে পড়ে দেশটিতে বিয়ের আগ্রহী নাগরিকরাও প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।

সূত্রগুলো বলছে, চীনে বিয়ের নামে নারী পাচারের সঙ্গে দেশের একাধিক কথিত ম্যারেজ মিডিয়াও জড়িত। উত্তরার বিভিন্ন এলাকায় অনলাইনে গড়ে ওঠা এই ম্যারেজ মিডিয়াগুলো মূলত অপেক্ষাকৃত দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের তথ্য সংগ্রহ করে চীনা মিডিয়াগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে। চীনা ম্যারেজ মিডিয়া থেকে তথ্য নিয়ে চীনা পুরুষরা ঢাকায় এসে বাংলাদেশের ম্যারেজ মিডিয়ার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট মেয়েদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের বিয়ের চেষ্টা চালায়। তা ছাড়া এসব ম্যারেজ মিডিয়া পাহাড়ি অঞ্চলের মেয়েদেরও তথ্য সংগ্রহ করে চীনা পাত্রদের কাছে বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার মির্জা তারেক আহমেদ বেগ কালবেলাকে বলেন, উত্তরা এলাকায় আগে যেসব বিদেশি ঘুরে ঘুরে ভিডিও করত, তাদের সেই কাজ বন্ধ করা হয়েছে।

শুধু ঢাকার উত্তরাতেই নয়, বিয়ের নামে এই মানব পাচার চক্র দেশের বিভিন্ন এলাকায়ও ছড়িয়ে পড়েছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে নেত্রকোনার কেন্দুয়া থেকে বিয়ের নামে তিন কিশোরীকে পাচারের সময় চীনের এক নাগরিক ও তার এ দেশীয় সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পরে তিন কিশোরীকে উদ্ধার করা হয়।

ছয় মাস আগে বাগেরহাট থেকে ঢাকায় এসে বিয়ের নামে চীনে পাচার হয়েছিলেন ১৯ বছর বয়সী এক তরুণী। কয়েকদিন আগে মানব পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ার’-এর মাধ্যমে ওই তরুণী দেশে ফেরার সুযোগ পান।

তিনি জানান, তিনি গৃহকর্মীর কাজে ঢাকায় এলেও প্রতারকের খপ্পরে পড়ে চীনের এক নাগরিককে বিয়ে করেন। বিয়ের পর তাকে চীনে নিয়ে যাওয়া হয়। এর পরই তার ওপর শুরু হয় যৌন নির্যাতন। কথায় কথায় চলত শারীরিক নির্যাতনও।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) মানব পাচার ইউনিটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমান কালবেলাকে জানান, তিনি বর্তমানে চীনে নারী পাচারকেন্দ্রিক বেশ কয়েকটি মামলা তারা তদন্ত করছেন। তদন্তে দেখা যাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে বৈধ ও আনুষ্ঠানিকভাবে চীনের নাগরিকদের বিয়ে করা হচ্ছে। কমিউনিটি সেন্টারে অনুষ্ঠান পর্যন্ত হচ্ছে। বিয়ে করে নিজ দেশে নেওয়ার পর পাচারের বিষয়টি সামনে আসছে।

তিনি বলেন, চীনে পাচার হওয়া বেশ কয়েকজন নারীকে ফিরিয়েও আনা হয়েছে। বিষয়টি চীনে বাংলাদেশ দূতাবাস ছাড়াও ঢাকায় চীনা দূতাবাসকেও অবহিত করা হয়েছে। কারণ বিদেশি নাগরিকরা মামলার আসামি হলে তা সংশ্লিষ্ট দূতাবাসকেও অবহিত করা হয়ে থাকে।

বিয়ের নামে বাংলাদেশ থেকে নারী পাচারের বিষয়টি যে উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে, তা সম্প্রতি ঢাকায় চীনের দূতাবাসের এক বার্তায় স্পষ্ট হয়েছে। গত মাসে দূতাবাসের এক বার্তায় ঢাকায় বসবাসরত চীনের নাগরিকদের উদ্দেশ্যে অবৈধ ঘটকালি বা অননুমোদিত এজেন্সির মাধ্যমে কনে বা স্ত্রী খোঁজার বিষয়ে সতর্কতা জারি করে বলা হয়, চীনের কোনো নাগরিক যদি মধ্যস্থতাকারী বা এজেন্সির মাধ্যমে বাংলাদেশে বিয়ে করতে আসেন, তবে তিনি মানব পাচারের দায়ে গ্রেপ্তার ও কঠোর আইনি শাস্তির মুখোমুখি হতে পারেন।

চীনের নাগরিকদের প্রতারণার নানা ধরন: সম্প্রতি রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানা এলাকা থেকে চেন লিং ফেং, জেং কং, জেং চাংকিয়াং, ওয়েন জিয়ান কিউ ও হুয়াং ঝেং জিয়াং নামে চীনের পাঁচ নাগরিককে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ। ডিবির তথ্য অনুযায়ী, এই বিদেশিরা বিভিন্ন সাইটে ডিপোজিট করার জন্য বিজ্ঞাপন প্রচারের মাধ্যমে মানুষকে আকৃষ্ট করে বিশ্বাস স্থাপন করেন। এ জন্য তারা মোবাইল ফোনের আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে আসছিলেন। ফাঁদে পড়ে অল্প সময়ে লাভবান হওয়ার আশায় ওই সাইটগুলোতে অনেকেই টাকা বিনিয়োগ করেন। পরে প্রতারক চক্রটি টাকা হাতিয়ে সাইট বন্ধ করে দেয়।

শুধু অনলাইন প্রতারণাই নয়; চীনের নাগরিকদের প্রতারক চক্রটি ঢাকায় আইফোনের নকল কারখানা থেকে শুরু করে মাদক তৈরির ল্যাব পর্যন্ত স্থাপন করে অপকর্ম করে আসছিল।

জুয়ার আড়ালে শত শত কোটি টাকা পাচার: চলতি বছরের ১৪ মে রাজধানীর উত্তরা ও তুরাগে একাধিক বাসায় অভিযান চালিয়ে চীনের ছয় নাগরিক ও তিন সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। এই চক্রটি ডিজিটাল গেটওয়ের মাধ্যমে দ্রুত ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তর করে কোটি কোটি টাকা দেশের বাইরে পাচার করে আসছিল বলে ডিবির ভাষ্য।

গত ২ আগস্ট রাজধানীর ভাটারা এলাকার একটি বাসায় বসে অনলাইন জুয়া, প্রতারণা ও অবৈধ ভিওআইপি নেটওয়ার্ক চালানোর অভিযোগে চীনের তিন নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে ছয় হাজারের বেশি সিমকার্ড, মোবাইল ফোন, ২০টি গেটওয়ে মেশিন উদ্ধার করা হয়। চক্রটি প্রতি মাসে ২০০ থেকে ২৫০ কোটি টাকা পাচার করে আসছিল বলে ডিবির তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

ওই ঘটনায় দায়ের মামলাটি তদন্ত করছেন গোয়েন্দা পুলিশের সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের পরিদর্শক নুরুল ইসলাম। তিনি কালবেলাকে বলেন, চক্রটি বেশ কিছুদিন ধরেই সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করে কোটি কোটি টাকা পাচার করে আসছিল। মূলহোতা তৃতীয় একটি দেশে বসে এই কারবার নিয়ন্ত্রণ করত। এখানে কাজ করা কর্মীরা আসা-যাওয়ার মধ্যে ছিল।

বিদেশি নাগরিকদের অপরাধ চক্রের জাল বিস্তারের বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক কালবেলাকে বলেন, বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে চীনের নাগরিকরা দেশে নানা ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে এবং কিছু ক্ষেত্রে অপরাধ কার্যক্রমে নেতৃত্ব পর্যন্ত দিচ্ছে। বিশেষ করে সাইবার অপরাধ থেকে শুরু করে কথিত প্রেম ও বিয়ের নামে মানব পাচারের মতো অপরাধের অভিযোগ সবচেয়ে বেশি দেশটির কিছু নাগরিকের বিরুদ্ধে।

তিনি বলেন, বিদেশি নাগরিকদের অপরাধ থামাতে নজরদারি বাড়াতে হবে। ভিসা অনুযায়ী তারা কাজ করছে কি না, তাও দেখতে হবে মাঝেমধ্যে।