Image description
তিন দিনের সফর শেষে এপিজির উদ্বেগ

বাংলাদেশের আর্থিক খাতের পুরোনো অনিয়ম, দুর্নীতি, ব্যাংক ও পুঁজিবাজারে ব্যাপক লুটপাট এবং অর্থ পাচারের ঘটনায় এশিয়া প্যাসিফিক গ্রুপ অব মান্ডি লন্ডারিং (এপিজি)-এর প্রতিনিধিদল উদ্বেগ জানিয়েছে। ২০২৭-২৮ সালের মিউচুয়াল ইভালুয়েশনের আগে তিন দিনের সফরে এসে এপিজি প্রতিনিধি দলের আশঙ্কা-অর্থ পাচারে ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় পড়তে পারে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে পুরোনো ঝুঁকি বাংলাদেশের মূল্যায়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে বর্তমান সরকারের আর্থিক খাত সংস্কার ও পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে তা অব্যাহত রাখার সুপারিশ করেছে আন্তর্জাতিক সংস্থাটি। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ১১ থেকে ১৩ আগস্ট ঢাকায় প্রিলিমিনারি মিউচুয়াল ইভালুয়েশন প্ল্যানিং (পি-এমইপি) কর্মসূচিতে এপিজির প্রতিনিধিদল অংশ নেয়। অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে বাংলাদেশের সক্ষমতা যাচাই করে তারা। অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), বিএসইসি, দুদক, সিআইডি, এনবিআর, আরজেএসসি, বিমা ও ক্ষুদ্রঋণ নিয়ন্ত্রক সংস্থাসহ আইন প্রয়োগকারী ও সীমান্ত-শুল্ক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তারা ধারাবাহিক বৈঠক করেন। পাশাপাশি ব্যাংক, বিমা, পুঁজিবাজারের মধ্যস্থতাকারী, এনজিও ও অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও আলোচনা করা হয়।

জানা গেছে, এপিজির মিউচুয়াল ইভালুয়েশন সরাসরি কোনো দেশকে ‘গ্রে লিস্টে’ তোলে না। তবে মূল্যায়নে দুর্বলতা ধরা পড়লে পরবর্তী পর্যায়ে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বাংলাদেশের ঝুঁকি বাড়তে পারে এবং ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্সের (এফএটিএফ) ‘জুরিসডিকশনস আন্ডার ইনক্রিজড মনিটরিং’ বা বহুল পরিচিত গ্রে লিস্টে যাওয়ার চাপ তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশের জন্য এ আশঙ্কা একেবারে নতুন নয়। ২০০৯ সালের মূল্যায়নের পর বাংলাদেশ উচ্চ ঝুঁকির তালিকায় গিয়েছিল। পরে বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ওই তালিকা থেকে বেরিয়ে আসে। ২০১৬ সালের মূল্যায়নে বাংলাদেশকে কমপ্লায়েন্ট দেশ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। আগামী মূল্যায়নে সেই অবস্থান ধরে রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, পাচার করা অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়া জটিল ও সময়সাপেক্ষ। অতীতে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় ব্যাংক থেকে অর্থ পাচার হয়েছে এবং খেলাপি ঋণ বেড়েছে। অর্থ পাচার বন্ধে শুধু ব্যক্তি পর্যায়ে ব্যবস্থা নিলে হবে না, প্রতিষ্ঠানগত দুর্বলতাও দূর করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়-বিগত ফ্যাসিস্ট শাসনামলে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার ও ব্যাংকিং খাতে ঘটে যাওয়া অনিয়ম, দুর্নীতি, নজিরবিহীন লুটপাট ও বিদেশে অর্থ পাচারের বিষয়ে এপিজির প্রতিনিধিদল উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং বিষয়গুলো আগামী মিউচুয়াল ইভালুয়েশনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অর্থ বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, আগের সময়ে কী ঘটেছে-সেটি ব্যাখ্যা করার পাশাপাশি বর্তমান ব্যবস্থায় ওই ধরনের অপরাধ ঠেকাতে কী পরিবর্তন এসেছে সেটার বাস্তব প্রমাণ দিতে হবে। বিশেষ করে ব্যাংক ঋণ, বেনিফিশিয়ারি ওনারশিপ, শেল কোম্পানি, বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্থ পাচার, সম্পদের প্রকৃত মালিকানা এবং বিদেশে পাচার করা অর্থ শনাক্ত ও উদ্ধারে সক্ষমতার প্রমাণ দিতে হবে। 

এ প্রসঙ্গে সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, বিদেশে পাচার করা সম্পদ বা অর্থ উদ্ধারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আলোচনার সক্ষমতায় দুর্বলতা রয়েছে। এক্ষেত্রে দরকষাকষি এবং আলোচনা সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধবিষয়ক আইনকানুনগুলো আরও যুগোপযোগী হতে হবে।

ডিজিটাল লেনদেনেও নজর : এপিজির আলোচনায় নতুন ঝুঁকি হিসাবে গুরুত্ব পেয়েছে ডিজিটাল আর্থিক লেনদেন। মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস, ই-ওয়ালেট, অনলাইন পেমেন্ট ও অন্য সব ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার দ্রুত বাড়ায় অর্থ পাচারের প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি নতুন পথ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এ কারণে পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মে সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্তকরণ, তথ্য বিশ্লেষণ, রিয়েল-টাইম নজরদারি এবং ঝুঁকিভিত্তিক ব্যবস্থাপনা জোরদারের প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে।

একই সঙ্গে বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে তথ্য বিনিময় ও সমন্বয় বাড়ানোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে। ক্রিপ্টো ও ভার্চুয়াল লেনদেনের মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তরের সুযোগ বাড়ায় এ খাতের ঝুঁকি মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলাও গুরুপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে প্রকৃত মালিকানা বা বেনিফিশিয়ারি ওনারশিপ শনাক্ত করার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। 

কোনো কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের আড়ালে প্রকৃত অর্থের মালিক ক্রেতা দ্রুত শনাক্ত করতে না পারলে অর্থ পাচারের তদন্ত কার্যকর করা কঠিন। এছাড়া বাংলাদেশের অর্থ পাচারের বড় একটি ঝুঁকি বাণিজ্যভিত্তিক অর্থ পাচার। আমদানি-রপ্তানিতে পণ্যের মূল্য বেশি বা কম দেখিয়ে অর্থ বিদেশে সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এ ক্ষেত্রে ওভার-ইনভয়েসিং ও আন্ডার-ইনভয়েসিং গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।