Image description

সুপারনিউমারারি পুলিশ সুপার (এসপি) পদে পদোন্নতি পাওয়া ২৮ ও ২৯তম বিসিএস-এর ৯২ কর্মকর্তা এখনো নিয়মিত পদায়ন পাননি। দীর্ঘদিন তারা চরম হতাশায় রয়েছেন। তাদের বাদ দিয়ে জুনিয়র ব্যাচের (৩০তম) কর্মকর্তাদের পদোন্নতিতে তোড়জোড় শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে তাদের পদোন্নতির প্রস্তাব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে সুপারনিউমারারি এসপিদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে। তারা আশঙ্কা করছেন, জুনিয়রদের আগে পদায়ন দেওয়া হলে বাহিনীর চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়বে এবং নজিরবিহীনভাবে সিনিয়রদের (জ্যেষ্ঠ) জুনিয়রের অধীনে কাজ করতে হবে।

যদিও বিষয়টি নিয়ে লুকোচুরি করছে পুলিশ সদর দপ্তর। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানোর বিষয়টি ‘গুজব’ বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন সদর দপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। নাম প্রকাশ না করে সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলেন, এ ধরনের প্রশ্ন করাটাও অনুচিত। এটি শুধু মিথ্যা নয়, চরম মিথ্যা ও ভুয়া।

পদোন্নতির প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পুলিশের মুখপাত্র এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন যুগান্তরকে বলেন, এটি সঠিক নয়। তবে সিনিয়রদের টপকে ৩০তম ব্যাচের পদোন্নতির প্রস্তাব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে যুগান্তর। প্রস্তাবটি আমলে না নেওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে আগে ২৮ ও ২৯তম ব্যাচকে সমন্বয় করার পরই পরবর্তী পদোন্নতির বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২৮তম বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের ২৫ জন কর্মকর্তা ২০২২ সালে পুলিশ সুপার (এসপি) পদে পদোন্নতি পান। পরে ২০২৩ সালের নভেম্বরে একই ব্যাচের আরও ১০৩ জনসহ অন্যান্য ব্যাচ মিলিয়ে ১৫০ জন কর্মকর্তাকে সুপারনিউমারারি পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এরপর বিভিন্ন সময়ে শূন্য পদের বিপরীতে ৮০ জন কর্মকর্তার নিয়মিত পদায়ন হলেও এখনো ২৮তম বিসিএস-এর প্রায় ৬০ জন কর্মকর্তা সুপারনিউমারারি পুলিশ সুপার হিসাবে রয়ে গেছেন। তারা নিয়মিত পদায়নের অপেক্ষায় দিন গুনছেন। সব মিলিয়ে ২৮তম ও ২৯তম বিসিএস-এর প্রায় ৯২ জন পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এখনো নিয়মিত পদায়ন পাননি। এ অবস্থায় জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের পদায়ন ঝুলিয়ে রেখে জুনিয়র ব্যাচের কর্মকর্তাদের পদায়নের জন্য বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির (ডিপিসি) কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানোর খবর প্রকাশ হতেই জ্যেষ্ঠ ব্যাচের কর্মকর্তাদের মধ্যে চরম হতাশা ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা করণীয় নির্ধারণে ইতোমধ্যে নিজেদের মধ্যে বৈঠকও করেছেন।

বিসিএস (পুলিশ) ২৯তম ব্যাচের একজন সুপারনিউমারারি এসপি যুগান্তরকে বলেন, প্রায় তিন বছর সুপারনিউমারারি এসপি পদে আছি। আমাদের বাদ দিয়ে জুনিয়রদের পদোন্নতি দেওয়ার সুযোগ নেই। আমরা স্বাভাবিক পদায়নের অপেক্ষায় দিন গুনছি। এরপরও যদি আমাদের বাদ রেখে জুনিয়রদের পদোন্নতি দিয়ে তাদের রেগুলার এসপি করা হয়, তাহলে চাকরির স্বাভাবিক গতি নষ্ট হয়ে যাবে।

কমান্ড কাঠামো ভেঙে পড়ার আশঙ্কা : ২৮তম বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের কর্মকর্তারা ডিসেম্বরে চাকরিকালের ১৭ বছরে পদার্পণ করবেন। দীর্ঘ চাকরিকাল, ব্যাচভিত্তিক জ্যেষ্ঠতা এবং ইতোমধ্যে পদোন্নতি পাওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে শূন্য পদের বিপরীতে পদায়নের ক্ষেত্রে তাদের অগ্রাধিকার পাওয়া শতভাগ যৌক্তিক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের আশঙ্কা, ২৮ ও ২৯তম ব্যাচকে টপকে ৩০তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের পদায়ন করা হলে একটি নজিরবিহীন ও অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। সেক্ষেত্রে ৩০তম ব্যাচের একজন কর্মকর্তা পদায়ন পেয়ে পূর্ণাঙ্গ এসপি হিসাবে দায়িত্ব পালন করবেন, আর তার অধীনেই ২৮তম ও ২৯তম ব্যাচের সুপারনিউমারারি পদোন্নতি পাওয়া জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা অপেক্ষাকৃত নিম্নপদ ‘অতিরিক্ত পুলিশ সুপার’ হিসাবে কাজ করতে বাধ্য হবেন। এটি বাহিনীর শৃঙ্খলা ও কমান্ড কাঠামোর সম্পূর্ণ পরিপন্থি।

২৮তম ব্যাচের একজন কর্মকর্তা বলেন, এটি গোটা বাহিনীর চেইন অব কমান্ড ও জ্যেষ্ঠতা কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত। জ্যেষ্ঠ ব্যাচের যোগ্য কর্মকর্তাদের পদায়ন নিশ্চিত করার পরেই কেবল পরবর্তী ব্যাচকে বিবেচনা করা উচিত। তা না হলে বাহিনীতে অসন্তোষ ও সাংগঠনিক বিশৃঙ্খলা এড়ানো সম্ভব হবে না।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরের অবস্থান : স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, এপ্রিলে এ শূন্য পদের বিপরীতে ২৮তম বিসিএস-এর ২৭ জন সুপারনিউমারারি পুলিশ সুপারের পদায়ন প্রস্তাব পুলিশ সদর দপ্তর থেকে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। তবে ওই প্রস্তাবে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে কয়েকজন কর্মকর্তার নাম অন্তর্ভুক্ত থাকায় মন্ত্রণালয় ব্যাখ্যা চেয়ে পুলিশ সদর দপ্তরে চিঠি পাঠায়। কিন্তু আজও সেই চিঠির কোনো জবাব দেয়নি পুলিশ সদর দপ্তর।

অভিযোগ উঠেছে, মন্ত্রণালয়ের চিঠির জবাব না দিয়ে এবং নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই বর্তমানে পুলিশ সদর দপ্তরের সংশ্লিষ্ট বিভাগ ২৮ ও ২৯তম ব্যাচের ৯২ জন কর্মকর্তাকে বঞ্চিত করে ৩০তম বিসিএস-এর কর্মকর্তাদের নিয়মিত পদায়নের নতুন প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ পুলিশ একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ ও সংবেদনশীল বাহিনী। এখানে পদোন্নতি, পদায়ন ও কমান্ড কাঠামোর ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা অপরিহার্য। জ্যেষ্ঠ ব্যাচের জটিলতা নিরসন না করে জুনিয়রদের আগে পদায়ন করা হলে তা বাহিনীতে দীর্ঘমেয়াদি অসন্তোষ ও প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি করবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, পুলিশ সদর দপ্তর থেকে ৩০তম ব্যাচের পদোন্নতির প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। তবে শূন্য পদগুলোয় ২৮ ও ২৯তম ব্যাচের সুপারনিউমারারিদের আগে সমন্বয় করতে হবে। তারপর বিবেচনা করতে হবে পদোন্নতির বিষয়টি। সে ক্ষেত্রে প্রথমে সিনিয়রিটি বিবেচনা করলে আগে ২৮, পরে ২৯ এবং এরপর ৩০তম ব্যাচ আসবে। এক প্রশ্নের জবাবে ওই কর্মকর্তা বলেন, শূন্য পদের বিপরীতে পদোন্নতি হওয়া উচিত।

পুলিশের সাবেক আইজি আব্দুল কাইয়ুম যুগান্তরকে বলেন, পুলিশ একটি অত্যন্ত সুশৃঙ্খল বাহিনী। তাই এই বাহিনীর কাঠামোগত শৃঙ্খলা এবং নিয়মনীতি মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। পদোন্নতি ও পদায়নের ক্ষেত্রে বিদ্যমান সরকারি বিধিমালা ও নিয়মকানুন সঠিকভাবে অনুসরণ করা উচিত।

তিনি আরও বলেন, জ্যেষ্ঠতা যেমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তেমনই কর্মকর্তাদের যোগ্যতাও বিবেচনা করা প্রয়োজন। তবে কেবল অযোগ্য ব্যক্তিকে বাদ দেওয়ার বিষয়টি আলাদা; কিন্তু কোনো যুক্তিসংগত বা সঠিক কারণ ছাড়া জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত করা উচিত নয়। সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে নিয়ম অনুযায়ী যোগ্য কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।