নাম কেএএম মাজেদুর রহমান। যিনি ৫ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছেন মালদ্বীপের একটি ব্যাংকে। তাও আবার চেয়ারম্যান পদে। এর আগে বাংলাদেশে ছিলেন প্রিমিয়ার ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। ফলে তার জীবন তো বর্ণাঢ্য বটে। কিন্তু না। খুবই ধূর্ত প্রকৃতির মাজেদুর প্রিমিয়ার ব্যাংকের প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা লুটপাটে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার সিন্ডিকেটে থাকা ২০ জনের বিরুদ্ধে আদালত ইতোমধ্যে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধানে অর্থ লুটপাটের তথ্য-উপাত্ত মিলেছে। তবে আশঙ্কা করা হচ্ছে পরবর্তী ধাপে আরও বাড়তে পারে।
এদিকে বিদেশে ব্যাংকের শীর্ষ পদে বসে বেশ ফুরফুরে মেজাজেই কাটছিল তার সময়। কিন্তু বিধিবাম। মাজেদুর দেশে এসে পান দুসংবাদ। অতঃপর তিনি নানা অজুহাতে দেশ ছাড়তে মরিয়া। তবে দুদকের পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত ও কঠোর অবস্থানের কারণে আদালত তাকে বিদেশ যাওয়ার অনুমতি দেননি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আর্থিক খাতে লুটপাটে জড়িত থেকে পার পেয়ে যাওয়ার কৌশল ভালোই রপ্ত করেছিলেন সুচতুর মাজেদুর রহমান। দেশে দুর্নীতির পাঠ চুকিয়ে এবার বিদেশে গিয়ে আরাম-আয়েশে দিন কাটাবেন, এমনটাই হয়তো ভেবেছিলেন তিনি। কিন্তু সেই হিসাব মেলেনি। দুদকের অনুসন্ধানে একের পর এক অনিয়মের তথ্য ও রেকর্ডপত্র সামনে আসায় বিদেশের নিরাপদ আশ্রয়ও এখন অনিশ্চিত তার জন্য। আদালতের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে বারবার বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত সফল হননি তিনি।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, ব্যাংক খাতে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাটে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত দৃশ্যমান আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। তা না হলে একজনের পর একজন অর্থ আত্মসাৎ করে বিদেশে গিয়ে বহাল তবিয়তে থাকার সুযোগ পাবেন। মাজেদুর রহমানের ক্ষেত্রেও এখন অনুসন্ধান দ্রুত শেষ করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
দুদক সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে মালদ্বীপ ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। দুদকের অনুসন্ধানে তার বিরুদ্ধে প্রিমিয়ার ব্যাংকের কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের সঙ্গে সম্পৃক্ততার তথ্য উঠে এসেছে। শুধু তাই নয়, তৎকালীন প্রিমিয়ার ব্যাংকের চেয়ারম্যান এইচবিএম ইকবালের বিভিন্ন অর্থ আত্মসাতের সঙ্গেও তার সম্পৃক্ততার তথ্যপ্রমাণ পেয়েছে অনুসন্ধান দল।
দুদক সূত্র জানায়, এইচবিএম ইকবাল, তার পরিবারের সদস্য ও সহযোগীদের সঙ্গে মাজেদুর রহমানের সম্পৃক্ততার বিষয়টি অনুসন্ধানে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রিমিয়ার ব্যাংকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসাবে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন ধরনের আর্থিক অনিয়মের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। তৎকালীন ব্যাংকের বোর্ডও এসব অনিয়মের বিভিন্ন পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট ছিল।
সূত্র জানায়, ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদাধিকারবলে নির্বাহী পর্ষদের সদস্য সচিব ছিলেন মাজেদুর। ফলে ব্যাংকের চেক, বিল ও ভাউচার অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় তার ভূমিকা ছিল। অনুসন্ধানকারী দল প্রতিটি আর্থিক অনিয়ম ও লেনদেন আলাদাভাবে যাচাই করছে। এটি দীর্ঘমেয়াদি অনুসন্ধান ও তদন্ত কার্যক্রম। রেকর্ডপত্রে যাদের নাম, বোর্ডে যাদের উপস্থিতি এবং যাদের অনুমোদন পাওয়া যাবে, পর্যায়ক্রমে তাদের প্রত্যেকের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হবে।
দুদক সূত্র আরও জানায়, মাজেদুর রহমানের সম্পৃক্ততার বিষয়টি উল্লেখ করে আদালতে প্রতিবেদনও দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে এর আগে কমিশনের চেয়ারম্যানের কাছে একাধিকবার প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে তথ্য চাওয়া হলে মাজেদুর রহমানের সম্পৃক্ততা ও তার বিরুদ্ধে নেওয়া আইনগত পদক্ষেপের বিস্তারিত জানিয়ে প্রতিবেদন পাঠানো হয়।
দুদক সূত্রের দাবি, প্রিমিয়ার ব্যাংকসংশ্লিষ্ট ইতোমধ্যে প্রায় ১৬টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে মাজেদুর রহমানের বিরুদ্ধেও একাধিক মামলা হয়েছে। কমিশন কার্যকর থাকলে অনুসন্ধান থেকে মামলার সংখ্যা আরও বাড়ত।
২৮ হাজার কোটি টাকা লুটের অনুসন্ধান : প্রিমিয়ার ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান এইচবিএম ইকবাল ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা অনুসন্ধানের অংশ হিসাবেই মাজেদুরের নাম এসেছে। দুদকের নথিতে অভিযোগ করা হয়েছে, ইকবাল ও তার পরিবারের সদস্যরা প্রিমিয়ার ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় ইকবাল সেন্টারসহ বিভিন্ন শাখার অফিস ভাড়া বাবদ ১ হাজার ৪৩৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। প্রিমিয়ার ব্যাংক থেকে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে লুটপাট ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ বিতরণ দেখিয়ে ৪ হাজার ৮১৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ এবং বিভিন্ন স্টেশনারি খাতে ব্যয় দেখিয়ে ১ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এর তথ্যপ্রমাণও পেয়েছে দুদক।
এছাড়া বিভিন্ন ব্যক্তির নামে এফডিআর খুলে অবৈধভাবে অতিরিক্ত মুনাফা দেওয়ার মাধ্যমে শতকোটি টাকা আত্মসাৎ, প্রিমিয়ার ব্যাংক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে অর্থ লুটপাট এবং বিপিএল ও টেলিভিশনে ভুয়া প্রচার দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগও অনুসন্ধানে এসেছে।
বিদেশ যেতে মরিয়া : ২০২৫ সালের নভেম্বরে মাজেদুর রহমানসহ ২০ জনের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেন আদালত। এরপর থেকেই বিদেশে যাওয়ার জন্য বিভিন্ন অজুহাতে আদালতের অনুমতি চেয়ে আসছেন মাজেদুর। দুদকের আশঙ্কা, তাকে বিদেশে যেতে দেওয়া হলে চলমান অনুসন্ধান ও পরবর্তী তদন্ত বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এ কারণেই নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার পক্ষে আদালতে অবস্থান নিয়েছে সংস্থাটি।
মাজেদুর রহমানের বিরুদ্ধে প্রিমিয়ার ব্যাংকের স্পষ্ট দুটি অনিয়মের নথিতে দেখা গেছে, ২০১৩ সালের ১০ এপ্রিল প্রিমিয়ার ব্যাংকের নির্বাহী পর্ষদের ৯০১ নম্বর সভায় ‘কালার ওয়েব’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে ৮৫ হাজার বার্ষিক প্রতিবেদন তৈরির জন্য ৬ কোটি ২২ লাখ ২০ হাজার টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়। ওই সভার সদস্য সচিব ছিলেন তৎকালীন এমডি মাজেদুর রহমান। কিন্তু অনুসন্ধানে পাওয়া রেকর্ড ও সংশ্লিষ্ট ভেন্ডর প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য অনুযায়ী, ৮৫ হাজারের জায়গায় তৈরি করা হয় মাত্র ২৫ হাজার বার্ষিক প্রতিবেদন। এজন্য প্রতিষ্ঠানটিকে দেওয়া হয় মাত্র ৬৫ লাখ টাকা।
দুদকের হিসাবে, কার্যাদেশের ৬ কোটি ২২ লাখ ২০ হাজার টাকা থেকে ৬৫ লাখ টাকা বাদ দিলে দাঁড়ায় ৫ কোটি ৫৭ লাখ ২০ হাজার টাকা। এই অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
এরপর একই ভেন্ডর প্রতিষ্ঠানকে ২ লাখ ৬৫ হাজার ক্যালেন্ডার তৈরির জন্য ২০১২ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ৩ কোটি ৭৩ লাখ ৮৫ হাজার টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়। তখনও নির্বাহী পর্ষদের সভার সদস্য সচিব ছিলেন মাজেদুর রহমান। কিন্তু সরবরাহ করা হয় মাত্র ৯০ হাজার ক্যালেন্ডার। এজন্য ভেন্ডরকে পরিশোধ করা হয় ৬২ লাখ ৬০ হাজার টাকা। বাকি ৩ কোটি ১১ লাখ ২৫ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। দুই কার্যাদেশে মোট ৮ কোটি ৬৮ লাখ ৪৫ হাজার টাকা আত্মসাতের তথ্য পেয়েছে দুদক।
বিএফআইইউর তালিকায় ৭ নম্বরে মাজেদুল : ২০২৫ সালের ১৬ জুলাই বিএফআইইউ প্রিমিয়ার ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান এইচবিএম ইকবাল, তার পরিবার ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আত্মসাৎ, তছরুপ, ঋণ জালিয়াতি ও অন্যান্য অনিয়ম নিয়ে একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদন দেয়। দুদকের নথি অনুযায়ী, ওই প্রতিবেদনে ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তালিকায় ৭ নম্বরে রয়েছে কেএএম মাজেদুর রহমানের নাম। তাকে অন্যতম অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বনানীর ইকবাল সেন্টার সিলগালা : এদিকে রাজধানীর বনানীতে সাবেক চেয়ারম্যান এইচবিএম ইকবালের মালিকানাধীন ‘ইকবাল সেন্টার’ সিলগালা করেছে দুদক। এ ভবনেই ২৬ বছর ধরে প্রধান কার্যালয় হিসাবে ব্যবহার করেছে ব্যাংকটি। রোববার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ওই ভবনে অভিযান চালায় দুদক। পরে তল্লাশি শেষে তার চেম্বারসহ সেন্টার সিলগালা করে দেওয়া হয়।
দুদক সূত্র জানায়, তল্লাশিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ নগদ অর্থ বা মূল্যবান সামগ্রী পাওয়া না গেলেও বিপুল পরিমাণ নথি ও রেকর্ডপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব নথি অনুসন্ধান ও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তল্লাশি ও জব্দের বিষয়ে কমিশনে বিস্তারিত প্রতিবেদন দেওয়া হবে। নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর এ বিষয়ে আরও প্রতিবেদন দেওয়া হতে পারে।
দুদক সূত্র জানায়, প্রিমিয়ার ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান এইচবিএম ইকবাল, তার পরিবার ও সহযোগীদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানটি বড় পরিসরে চলছে। একাধিক আর্থিক অনিয়মের পৃথক পৃথক দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যেসব অনিয়মে যার সম্পৃক্ততা ও অনুমোদনের প্রমাণ পাওয়া যাবে, অনুসন্ধানের পর্যায়ক্রমে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বক্তব্য : কেএএম মাজেদুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, ‘অফিশিয়ালি আমাদের এ বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি। পত্রপত্রিকায় যতটুকু দেখেছি ততটুকুই জানি। ক্যালেন্ডার ও টিভি বিজ্ঞাপনের বিষয়ে যে অভিযোগ করা হচ্ছে, সেগুলোর সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। ভেন্ডর যদি আলাদাভাবে কোনো অনিয়ম করে থাকে, সেটা তার বিষয়।
তিনি বলেন, ‘আমাকে বোর্ডের সদস্য সচিব বলা হচ্ছে, সেটাও ভুল। ব্যাংকে সদস্য সচিব বলে কোনো পদ নেই। কোম্পানি সেক্রেটারি শুধু রেকর্ড সংরক্ষণ করেন। আর এমডি পদাধিকার বলে বোর্ডের সদস্য হলেও তার ভোট দেওয়ার অধিকার নেই। আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করা হচ্ছে, সেগুলোর কোনো প্রমাণ থাকলে তা দেখানো উচিত। দুদকের যে রিপোর্টের কথা বলা হচ্ছে, সেটি আসলে থার্ড পার্টির অডিট রিপোর্ট। দুদক এখনো কোনো তদন্ত করেনি।’